প্রতিবেদন

২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় সংসদ সদস্যদের অভিমত : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত

বিশেষ প্রতিবেদক : ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় সংসদ সদস্যরা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তারা বলেন, গত সাড়ে ৯ বছরে শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তারা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে উন্নীত হবে।
জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ১৮ জুন অধিবেশনের শুরুতে মন্ত্রীদের জন্য প্রশ্ন-জিজ্ঞাসা-উত্তর টেবিলে উপস্থাপন শেষে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়। উল্লেখ্য, গত ৭ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন।
সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে মন্ত্রী-এমপিরা দুর্নীতির বরপুত্র ও আদালত কর্তৃক দ-িত তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে দিতে যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এবং এক্ষেত্রে সরকারের আরো জোরালো ভূমিকা আশা করেন। পাশাপাশি তারেক রহমানের পাচারকৃত অবৈধ অর্থ বাজেয়াপ্ত করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন। সংসদ আলোচনায় তারা বলেন, জিয়া পরিবারের দুর্নীতির তথ্যচিত্র ইতোমধ্যে দেশে-বিদেশে প্রমাণিত।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট আলোচনার দ্বিতীয় দিনে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, হুইপ শহীদুজ্জামান সরকার, বন ও পরিবেশ উপমন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, সরকারি দলের টিপু মুন্সি, বেগম উম্মে রাজিয়া কাজল, মো. মোসলেম উদ্দিন, মৃনাল কান্তি দাস, আনোয়ারুল আবদীন খান ও হোসনে আরা বেগম অংশ নেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটকে যুগোপযোগী উল্লেখ করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সার্বিক চিত্র পাওয়া যায়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিরোধী দল কিছু অসত্য বক্তব্য রেখেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীর সময়োপযোগী পদেেপর কারণেই দেশের সকল ব্যাংক এখনো সচল আছে। ব্যাংকগুলো যথাযথভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
আয় করের আওতা বাড়িয়ে কমপে ২ কোটি মানুষকে করের আওতায় আনার সুপারিশ করে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ভ্যাট আদায়ে ডিজিটালাইজ ব্যবস্থা চালু করলে আরো ৪ গুণ বেশি পরিমাণ ভ্যাট আদায় সম্ভব হবে। তিনি আয়কর বাহাদুর পুরস্কারের পরিবর্তে ভ্যাট বাহাদুর পুরস্কার ঘোষণারও প্রস্তাব করেন।
সরকার সবার জন্য আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করছে উল্লেখ করে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, বিদেশে অর্থপাচার রোধে ফ্যাট ক্রয়ের েেত্র অর্থের উৎস অনুসন্ধান বন্ধ করতে হবে এবং ফ্যাট ক্রয়ের টাকার ওপর ১০ শতাংশ ট্যাক্স দিয়ে এই টাকা সাদা করার সুযোগ দিতে হবে। তিনি ফ্যাট রেজিস্ট্রেশন কর বিদ্যমান ১৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণের দাবি জানান।
সবার জন্য আবাসন নিশ্চিত করতে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বাজেটে গৃহঋণ বাবদ ৫০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের দাবি জানান। এ তহবিল থেকে ১ অঙ্কের সরল সুদে ঋণ দেয়া হবে এবং ২৫ বছর মেয়াদে তা আদায় করার প্রস্তাব করেন। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার শহরকে যানজটমুক্ত করতে ওই তিন শহর থেকে ধীরগতির সকল গাড়ি উঠিয়ে দেয়ার প্রস্তাব করেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন মতা ছিল ৫ হাজার ২৪৫ মেগাওয়াট। বর্তমানে দেশ ১৮ হাজার ৩৫৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমতা অর্জন করেছে। ২০০৯ সালে ক্যাপটিভ পাওয়ার ছাড়া সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট; আর বর্তমানে ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে। বর্তমানে ২৩ হাজার ৯৩ মেগাওয়াট মতাসম্পন্ন ১২৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি স্বারিত হয়েছে। ৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট মতার নতুন ৬৮টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হয়েছে। ১৫ হাজার ২০৫ মেগাওয়াট মতার প্রায় ৫৯টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। ৪ হাজার ৪৪০ মেগাওয়াট মতার নতুন ২৩টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ভারত থেকে প্রায় ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। আগামী মাসে ভারত থেকে আরো ৫শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পায়রা, মাতারবাড়ি, মহেশখালী ও রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের ৮টি মেগা প্রকল্প থেকে ৯ হাজার ৯৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী ২০২২ সালের মধ্যে প্রায় পুরনো সব বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে, যেগুলো সম্ভব সেগুলো রিপাওয়ারিং করা হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রায় ৫০১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে উল্লেখ করে নসরুল হামিদ বলেন, এখন ৫২ লাখ বাড়িতে সোলার হোম সিস্টেম চালু রয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি উন্নত দেশে পরিণত হবে। এ ল্েয ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত করতে সঞ্চালন লাইন ৮ হাজার থেকে প্রায় ১১ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে উন্নীত করা হয়েছে। ২০৪০ সালের মধ্যে ৩২ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত করতে হবে। ঢাকা শহরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সকল বিদ্যুৎ লাইন আন্ডার গ্রাউন্ডে চলে যাবে উল্লেখ করে নসরুল হামিদ বলেন, বিদ্যুৎ সমস্যা সম্পর্কে অভিযোগ জানাতে একটি সিঙ্গেল নম্বর চালু করা হচ্ছে। সেখানে কল করে সারাদেশ থেকে বিদ্যুৎ সম্পর্কে যেকোনো সমস্যার কথা জানানো যাবে।
জ্বালানি েেত্র অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে উল্লেখ করে সরকারের বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে দূরদৃষ্টির কারণে ৫টি গ্যাস ত্রে ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট দেশ পেয়েছিল। সেখান থেকে দেশের প্রায় ৩৪ শতাংশ জ্বালানি চাহিদা মেটানো হচ্ছে। গ্যাসের মজুদ ঠিক রাখতে বিদেশ থেকে এখন গ্যাস আমদানি করা হচ্ছে। আগামী মাসের মধ্যে আমদানিকৃত এই এলএনজি গ্যাস পাইপ লাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা যাবে এবং গ্যাসের সমস্যা চিরদিনের মতো অবসান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। নসরুল হামিদ বলেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে তেল সরবরাহের ঝামেলা দূর করতে ও অর্থ সাশ্রয় করতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপ লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। এই পাইপ লাইনের একটি অংশ বিমানবন্দরেও সংযুক্ত থাকবে। তেল পরিবহনে বিদ্যমান ৪ শতাংশ কর বহাল রাখার দাবি জানিয়ে জ্বালানি সাশ্রয়ের ল্েয তিনি হাইব্রিড কার ও ইলেকট্রিক কারের আমদানি কর কমিয়ে শূন্যের কোটায় নিয়ে আসার দাবি জানান। তেলের গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে বছরে ১৬ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন। বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের সদস্যরা বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বাংলাদেশকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে সহযোগিতা করবে। বিএনপি-জামায়াতের মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে জাতীয় সংসদের অনেক সদস্য বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে তারা ‘মানি না মানব না’ শব্দটি বলে আসছে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধকে তারা মানতে পারেনি। তারা এখনো দেশ ও দেশের অগ্রগতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আসছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বিএনপি-জামায়াত মিথ্যাচার করে দেশের এই অর্জনকে নস্যাৎ করতে চাচ্ছে। তারা বলেন, বিএনপি-জামায়াতের ৫ বছরের শাসনামলে দেশ পরপর ৫ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জাতির কপালে কলঙ্কের কালিমা লেপন করে। আর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতির সেই কলঙ্ক মোচনের জন্য বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ববাসী এখন বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল ও একটি মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে চিনে।
সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার কথা উল্লেখ করে বলেন, বিএনপি-জামায়াত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করে দিয়ে এদেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় পরিচালিত করতে চেয়েছে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে, এদেশের মানুষের মন থেকে জাতির পিতাকে মুছে ফেলতে পারেনি। বিএনপি-জামায়াত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাসহ দলের নেতাকর্মীদের হত্যা করে দেশ থেকে আওয়ামী লীগ নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। এতেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত গ্রেনেড হামলা করে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইলেও গ্রেনেডের বিনিময়ে আওয়ামী লীগ এর জবাব দিতে চায় না। জনগণই আমাদের গ্রেনেড, এই জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে এই গ্রেনেডের জবাব দেবে।