প্রতিবেদন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে আতঙ্কে মাদক ব্যবসায়ীরা : জনমনে স্বস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক : সারাদেশে চলমান মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের কারণে এখন আর আগের মতো হাত বাড়ালেই মিলছে না মাদক। বলা যায় মাদকের আগ্রাসন অনেকটাই কমে আসছে। তবে পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত আছে। ঢাকায় মাদকের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে অবস্থিত উর্দুভাষী অবাঙালিদের বিহারি ক্যাম্প ও ঢাকার কয়েকটি বস্তি বিশেষ করে কাওরান বাজার ও তেজগাঁয়ের রেললাইনকেন্দ্রিক বস্তিতে এখন আর চাইলেই মাদক পাওয়া যাচ্ছে না।
বলা হয় বিহারি ক্যাম্পসহ ঢাকার বেশিরভাগ বস্তির অধিকাংশ বাসিন্দাই মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ী। এখানে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের কারণে অনেক বাসিন্দা ক্যাম্প ও বস্তি ছেড়ে দিচ্ছেন। তবে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে ছাড়া পেয়ে অনেকেই আবার ক্যাম্পে ও বস্তিতে যাতায়াত শুরু করেছেন। ক্যাম্প ও বস্তিগুলোতে মাদক প্রবেশের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। তবে অভিযানের আগে ঢুকে পড়া মাদকই অত্যন্ত গোপনে ক্যাম্প ও বস্তির ভেতরে নির্ভরযোগ্য মাদকসেবীদের কাছে বিক্রি হচ্ছে। যদিও তার পরিমাণ একেবারেই কম।
এদিকে ৭ ও ৮ জুলাই ঢাকায় পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে ৭৯ জন। গ্রেপ্তারকৃতদের অধিকাংশই মাদকসেবী। কিছু খুচরা ব্যবসায়ীও আছে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে অস্ত্র গোলাবারুদ, ইয়াবা ও ফেনসিডিল। ৭ জুলাই ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত উর্দুভাষী অবাঙালিদের বাসস্থান জেনেভা ক্যাম্প ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ক্যাম্পে দেখা গেছে, সেখানে আগের মতো আর মাদক বিক্রির জন্য হাঁকডাক নেই। হুমায়ুন রোডের মাথায় জেনেভা ক্যাম্পের দোকানে বসে মাদক ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করা হলেও মাদকসেবীরা কোনো ফল পায়নি। উল্টো সেখানকার বাসিন্দারা বলছিলেন, তাড়াতাড়ি চলে যান। ক্যাম্পের ভেতরে সারাণ পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দারা সিভিলে ঘোরাফেরা করছে। কোনোভাবে যদি বুঝতে পারে, মাদকের বেচাকেনা করতে এসেছেন, তাহলে ধরে নিয়ে যাবে। প্রায় একমাস ধরে ক্যাম্পে এমন কঠিন অবস্থা চলছে। তারপরও মাদক পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। নতুন করে মাদকের চালান ক্যাম্পে প্রবেশ করতে পারছে না। তবে আগে ঢুকে পড়া চালানের মধ্যে যেসব মাদক বিক্রি হয়নি, সেসব মাদক এখন অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য লোকের কাছে বা মাদকসেবীর কাছে খুবই গোপনে বিক্রি হচ্ছে। আগে এসব রাস্তায় দাঁড়ানো যেত না। এখন তার বালাই নেই। যারা ক্যাম্পে ও বস্তিতে মাদক ব্যবসা করত, তাদের অনেকেই গ্রেপ্তার হয়ে জেলে রয়েছে। আর যারা গ্রেপ্তার হয়নি, তারা ক্যাম্প ও বস্তি ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছে। তবে মাদকের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর সম্প্রতি জামিনে ছাড়া পাওয়াদের অনেকেই নতুন করে ক্যাম্পে ঘোরাফেরা শুরু করেছে। তবে তারা মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখছে কি না তা স্পষ্ট নয়।
ক্যাম্প ও বস্তিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছরের ২৬ মে র‌্যাব স্মরণকালের সবচেয়ে বড় মাদকবিরোধী অভিযান চালায় জেনেভা ক্যাম্পে। টানা ছয় ঘণ্টার সেই অভিযানে অন্তত দুই শতাধিক লোককে ধরা হয়েছিল। এদের মধ্যে প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক কারবারি হিসেবে শনাক্ত হওয়া ১৫৩ জনকে গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এরপর পুলিশ আরেক দফায় ক্যাম্পে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে একশজনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর থেকে ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা একেবারেই কমে যায়। ক্যাম্পের বাসিন্দারা বলছিলেন, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে খুবই পরিচিত ব্যবসায়ী সাঈদের দুই ভাই সাজু ও রাজু এবং তার ছেলে কামরানও রয়েছে। অভিযানে সাঈদও আটক হয়েছিল। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা করার কোনো অভিযোগ না থাকায় তাকে ছেড়ে দেয় র‌্যাব। আরেক ব্যবসায়ী সালাহউদ্দিনকেও গ্রেপ্তার করেছিল র‌্যাব। তার বিরুদ্ধেও কোনো অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে র‌্যাব তাকেও ছেড়ে দেয়।
বিভিন্ন বস্তির মাদক ব্যবসায়ীরা বলছেন, র‌্যাবের অভিযানের পর মাসখানেক সময় পার হয়ে গেলেও সেই অভিযানের রেশধরে এখনও ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে অনেকেই অনেককে ফাঁসিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। যা বিভিন্ন বস্তির ভেতরে এক ধরনের বাড়তি উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। নিরীহ বস্তিবাসীদের মধ্যে এ নিয়ে রীতিমতো আতঙ্ক বিরাজ করছে। এজন্য অনেকেই বস্তি ছেড়ে দিচ্ছেন। বস্তি ছেড়ে দেয়া বস্তিবাসীরা বলছেন, অনেকেই মাদকবিরোধী অভিযানকে পুঁজি করে যার যার শত্রুকে মাদক ব্যবসায়ী আখ্যা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, যা রীতিমতো আতঙ্কের।
তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলছেন, মাদকবিরোধী অভিযানকে কেউ যাতে পুঁজি করে ব্যক্তিগত শত্রুতা হাসিল করতে না পারে এজন্য তারা সতর্ক রয়েছেন। অভিযানে কোনোক্রমেই সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন, এজন্য পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ জানান, সারাদেশে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চলমান থাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা আত্মগোপনে চলে গেছে। যারা গ্রেপ্তার হচ্ছে, তাদের অধিকাংশই মাদকসেবী। তবে কিছু খুচরা ব্যবসায়ীও রয়েছে। পলাতকদের ওপর নজরদারি অব্যাহত আছে। সাঁড়াশি অভিযানের কারণে মাদকের চালানও আর আগের মতো আসতে পারছে না। ঢাকাসহ সারাদেশে মাদকের আগ্রাসন দিন দিন কমে আসছে।
এদিকে ১১ জুলাই ঢাকায় পুলিশ ও ডিবি পুলিশের অভিযানে ৭৬ জন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের কাছে থেকে উদ্ধার হয়েছে একটি পিস্তল, গুলি, শতাধিক বোতল ফেনসিডিল, ১১ হাজার পিস ইয়াবা, প্রায় দেড় কেজি হেরোইন, প্রায় দুই কেজি গাঁজা ও প্রায় ৭০ লিটার দেশি-বিদেশি মদ। অন্যদিকে র‌্যাব রাজধানীর খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার একটি বাসা থেকে সাড়ে ২৭ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুই জনকে এবং রাজধানীর কল্যাণপুরে আম ভর্তি কার্টন থেকে শতাধিক বোতল ফেনসিডিলসহ এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে।
প্রায় প্রতিদিনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ ধরনের সাঁড়াশি অভিযানের কারণে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমে এসেছে। এখন আর হাত বাড়ালেই মাদক মিলছে না। এ নিয়ে দেশজুড়েই জনমনে স্বস্তি বিরাজ করছে। তবে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীরা আছে আতঙ্কে। অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের অভিমত মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের এ ধরনের আতঙ্কে থাকার দরকার আছে। এই দুই শ্রেণির কাছে এই আতঙ্ক বজায় থাকলেই ধীরে ধীরে দেশ থেকে মাদকের আগ্রাসন দূর হয়ে যাবে।