প্রতিবেদন

আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : দলকে সংগঠিত করুন উন্নয়নের কথা বলুন নৌকার পক্ষে ভোট চান

বিশেষ প্রতিবেদক : নির্বাচনি বছর ২০১৮ সাল। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে বইছে নির্বাচনি উত্তাপ। নির্বাচনি প্রস্তুতিতে এখন ব্যস্ত ছোট-বড় সকল রাজনৈতিক দল। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ৭ জুলাই গণভবনে আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন। ওই ভাষণে শেখ হাসিনা দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন। সভায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের স্বাগত বক্তৃতা করেন। দলের দপ্তর সম্পাদক ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ শোক প্রস্তাব পাঠ করেন। দলের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এবং উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন।
আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের আগামী সাধারণ নির্বাচনের জন্য ভোট চাইতে এখন থেকেই মানুষের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দলকে সংগঠিত করুন, উন্নয়নের কথা বলুন এবং আগামী নির্বাচনে নৌকার পক্ষে ভোট চান ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগই দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে তাদের কল্যাণের জন্য কাজ করে। মানুষ কিন্তু ভুলে যায়; এ জন্য আমাদের উন্নয়ন দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে, তাদের বোঝাতে হবে, তাদের কাছে বারবার যেতে হবে।’
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ মতায় থাকলেই দেশের মানুষের উন্নতি হয়। গ্রামের অর্থনীতি আজ উন্নত হয়েছে এবং জনগণের আয় বাড়ায় তারা সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারছে, ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল ভোগ করতে পারছেÑ এ কথাগুলো সবাইকে বলতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ ব্যতীত কোনো রাজনৈতিক দলই দেশের দরিদ্র মেহনতি জনগণের জন্য কিছু করেনি। দেশের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবাকে নিয়ে যাওয়ায় তাঁর সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা মানুষও আর ুধায় কষ্ট পাবে না, একটা মানুষও আর গৃহহীন থাকবে না, সকলেই প্রয়োজনীয় শিা এবং স্বাস্থ্যসেবা পাবে। ‘জনগণের কাছে গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভোট চাইতে হবে। যাতে তারা অতীতের মতো আবারো
আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়’Ñ বলেন প্রধানমন্ত্রী।
দল এবং সহযোগী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ মতভেদ এবং দ্বন্দ্ব এখনই মিটিয়ে ফেলার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আপনাদের মনে রাখতে হবে আগামীর নির্বাচন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন হবে। মনে রাখতে হবে, কোনো আসন নিয়ে অমনোযোগী হওয়ার সুযোগ নেই, কোনো আসন নিয়ে অমনোযোগী হওয়ার মানেই হবে সে আসনে পরাজয়, যার কারণে আমাদের সরকার গঠনের সুযোগ ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।
তাঁর সরকারের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ টেনে এনে এ সময় শেখ হাসিনা বলেন, মনে রাখবেন, আওয়ামী লীগ যদি আবার মতায় আসতে না পারে তাহলে এই বিচার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ‘তারা (বিএনপি-জামায়াত) আবার মানুষের জানমালের ওপর আক্রমণ শুরু করে দেবে, দারিদ্র্য বাড়িয়ে শিার হার কমিয়ে ফেলবে, সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের কর্মসূচি ও সকল উন্নয়ন কর্মকা- বন্ধ করে দেবে, অতীতে যেমনটি করেছিল। কাজেই আপনাদের শুধু আওয়ামী লীগকেই নয়, এর সহযোগী সংগঠনগুলোকেও শক্তিশালী করে তুলতে হবে।’ ‘মহিলা আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ প্রত্যেক সংগঠন যেন সুসংগঠিত হয় এবং নিয়ম মেনে চলেÑ সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, দেশের উন্নয়নের কথা তুলে ধরে আপনারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে জনগণের কাছে আগামী ডিসেম্বরের নির্বাচনে নৌকা মার্কায় জনগণ যেন ভোট দেয় সেই আবেদন করবেন। আর অন্যরাতো দেশের স্বাধীনতাই চায়নি, তাই দেশের কোনো উন্নয়ন তারা করবে না।
২০১৪ সালে নির্বাচন ঠেকানোর নামে খালেদা জিয়ার আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যার সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়া মানুষ হত্যা করেও সে নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি; কারণ জনগণ রুখে দাঁড়িয়েছিল। দেশের জনগণই মূল শক্তি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের শক্তিই হচ্ছে জনগণ। সেই জনগণকে নিয়েই আমরা রাজনীতি করি, তাদের কল্যাণেই আমাদের রাজনীতি। এই কথাটা সাধারণ মানুষের কাছে আপনাদের তুলে ধরতে হবে।
‘জনগণ নৌকায় ভোট দিয়েছে বলেই গ্রামের মানুষ সুখের মুখ দেখছে, দুটো পয়সা কামাইয়ের সুযোগ পাচ্ছে, ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা পাচ্ছে, হাতে হাতে মোবাইল পাচ্ছে, সুন্দর করে জীবনযাপন করার সুযোগ পাচ্ছে, বাড়ি পাচ্ছে, রাস্তা পাচ্ছে, সবকিছু পাচ্ছে’। ‘বলতে হবে আমরা আপনাদের কাছে ভোট চাই, আপনাদের কল্যাণে কাজ করতে চাই। আপনাদের ভাগ্য আমরা পরিবর্তন করতে চাই। জাতির পিতার আদর্শে দলকে গড়ে তুলে সংগঠনকে আরো শক্তিশালী করবেন, সেটাই আমি চাই’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার মহাকাশে স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎপেণ করেছে, সারাদেশে ইন্টারনেট সার্ভিস চালু করেছে। লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংয়ের প্রশিণ দেয়ায় এখন ঘরে বসেই ছেলে মেয়েরা অর্থ উপার্জন করতে পারছে।
জনগণের কল্যাণে কাজ করে যেতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ করা মানে শুধু নিজের ভাগ্য গড়া না। এটা বিএনপি-জামায়াতের কাজ। দুর্নীতি, লুটপাট ও মানুষ হত্যা করাÑ এটাই তো তাদের কাজ। নইলে কেউ এতিমের টাকা চুরি করে খেতে পারে?’ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির আরও মামলা থাকার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু তিনি হাজিরা দেন না। হাজিরা দিলেই ধরা খাবে।’ খালেদা জিয়া অসুস্থ হলেও মামলায় হাজিরা দিতে না পারার মতো অতটা গুরুতর অসুস্থ কি না এ বিষয়েও সন্দেহ পোষণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
সম্পূর্ণ মানবিক কারণে মিয়ানমারের ১১ লাখ নির্যাতিত রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় প্রদানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় সারাবিশ্বের সমর্থন আমরা পেয়েছি, সেই সমর্থন নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
জোটগতভাবে নির্বাচন করা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যেহেতু আমরা নির্বাচন নিয়ে জোট করেছিলাম, আমাদের সেই নির্বাচনি জোটকে বজায় রাখতে হবে। সাথে সাথে যাদেরকে আমরা নমিনেশন দেবো (তৃণমূলের মতামত নিয়ে এবং সার্ভের ভিত্তিতে যে নমিনেশন দেয়া হবে) যাকে নৌকা মার্কা দেব তাঁর পে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। আগামী নির্বাচনে কোনোমতে যেন নৌকা না হারে।’ ‘দীর্ঘদিন মতায় থাকলে একটা ধর্ম হয়ে যায়, সবগুলোতেতো জিতবো এই একটা সিটে না জিতলে আর কি হবে, ২০০৮ সালে এই চিন্তাধারাটা ছিলÑ এটার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়,’ সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী।
‘কারাগারের রোজ নামচা এবং বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীÑ তাঁর ডায়েরিভিত্তিক লেখা গ্রন্থ দুটি ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের ৪৭টি ফাইল নিয়ে বের করতে যাওয়া বৃহৎ প্রকাশনার (৩০-৪০ হাজার পৃষ্ঠাকে সংপ্তি করে ৯ হাজার পৃষ্ঠায় আনা) ১৪টি ভলিউমের প্রথম ভলিউম ছাপার কাজ চলছে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার শুনানি নিয়েও কয়েক খ-ের বই এবং বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথাভিত্তিক একটি গ্রন্থও শিগগিরই প্রকাশিত হবে বলে সংগঠনের নেতাকর্মীদের জানান।
উল্লেখ্য, ৭ জুলাই তৃতীয় পর্যায়ের বিশেষ বর্ধিত সভায় ঢাকা, ময়মনসিংহ, রংপুর ও খুলনা বিভাগের ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এর আগে ৩০ জুন চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। আর গত ২৩ জুন জেলা-উপজেলা, মহানগর, পৌরসভার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, দলীয় সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা চেয়ারম্যানদের নিয়ে প্রথম পর্যায়ের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়।