প্রতিবেদন

আসন্ন ৩ সিটি করপোরেশন নির্বাচন : বিজয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় মেয়র প্রার্থীর বিজয় আওয়ামী লীগকে অনেকটা উজ্জীবিত করেছে। দলের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, আসন্ন রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিজয়ের এ ধারা অব্যাহত থাকবে। বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতির কারণে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ভোটাররা। আওয়ামী লীগের উন্নয়নের রাজনীতির কারণে জনগণ তাদের সমর্থন দিচ্ছে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা। ২৬ জুন অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৪ লাখ ১০ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার পেয়েছেন ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১১ ভোট। খুলনার পর গাজীপুর সিটি করপোরেশন ভোটে বিশাল ব্যবধানে সরকারদলীয় প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনেও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠছেন মতাসীনরা। তারা মনে করেন, এ জয়ের ধারাবাহিকতায় ৩০ জুলাই অনুষ্ঠেয় সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও বিপুল ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা বিজয়ী হবেন। ওই তিন সিটির জয়ের ধারাবাহিকতায় বিজয় আসবে একাদশ সংসদ নির্বাচনেও।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, গাজীপুর সিটি নির্বাচনে জনগণ বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসের জবাব এবং আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। খুলনা দিয়ে আওয়ামী লীগের বিজয় শুরু হয়েছে, গাজীপুরেও হলো। আগামীতেও আমাদের বিজয় হবে। এগুলো সরকারের উন্নয়ন, দেশের সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির ফসল।
গাজীপুর জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান বলেন, চার কারণে গাজীপুর সিটিতে বিজয় এসেছে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে মনে করছি। এর মধ্যে অন্যতম ছিল দলের সব পর্যায়ের নেতার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। দ্বিতীয়, সরকারের ব্যাপক উন্নয়ন ও বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতি। তৃতীয়, বিএনপির প্রার্থীর তুলনায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী তরুণ ও কিন ইমেজের। চতুর্থ, এই সিটিতে প্রায় দেড় লাখ নতুন ভোটার স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটে অংশগ্রহণ করে উন্নয়ন এবং তারুণ্যের কারণে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকেই বেছে নিয়েছেন। দলীয় সূত্র মতে, খুলনা ও গাজীপুর সিটি ভোটের আগে জেলা-মহানগর নেতাদের ডেকে গণভবনে কথা বলেছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। খুলনায় দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্য হলেও গাজীপুরে কোন্দল ছিল। খুলনার নির্বাচনকে মডেল ধরে ২৬ জুন গাজীপুর অনুষ্ঠিত সিটি ভোটে বিজয়ী হতে কৌশলী হন দলটির নেতাকর্মীরা। এতে তারা সফলও হন। বিশাল ব্যবধানে জয় পায় আওয়ামী লীগ। অথচ গতবার এই সিটিতেও ১ লাখের বেশি ভোটে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরাজিত হন। গাজীপুর ভোটে জয়ের ধারাবাহিকতা তিন সিটি ও জাতীয় নির্বাচনে কাজে লাগাবে আওয়ামী লীগ। এজন্য খোদ দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই উদ্যোগী হয়েছেন। ইতোমধ্যে জেলা-মহানগর, উপজেলা-পৌর এবং থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও দলীয় উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানদের গণভবনে ডেকেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তিন পর্যায়ে বিশেষ বর্ধিত সভা করে একাদশ সংসদ নির্বাচনের বার্তা দেয়া হয়েছে তাদের। এবার ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের গণভবনে ডেকেছেন তিনি। ৭ জুন রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও চটগ্রাম জেলার সব ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এবং দলীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের নিয়ে এ সভা হয়। এ সভায় আগামী সংসদ নির্বাচনের বার্তা দেয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ঢাকার অদূরে হওয়ায় গাজীপুরের ঢেউ সারাদেশে লেগেছে। প্রায় সারাদেশের মানুষই গাজীপুরে কাজ করেছে। এরাই তৃণমূলে বার্তা নিয়ে যায়। এ নির্বাচনের জয় আগামী সংসদ নির্বাচনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় সভানেত্রী তৃণমূল নেতাদের ডেকে গণভবনে বৈঠক করছেন। নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে বিশেষ বার্তা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, বিএনপির সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের অপরাজনীতি বাংলাদেশের মানুষ অনেক আগেই প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশের জনগণ উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ বেছে নিয়েছে। তারই প্রতিফলন ঘটেছে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে।
এদিকে গত ২২ জুন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি বোর্ডের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশন, একটি সংসদীয় আসন এবং বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন প্রদানে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসন্ন নির্বাচন অবাধ ও নিরপেভাবে আয়োজন এবং ভোটারদের আস্থা অর্জনসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে দলের সকল স্তরের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।
ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, ভোটারদের আস্থা অর্জন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। আসন্ন সকল নির্বাচন বিশেষ করে সিটি করপোরেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকার বিএনপির মতো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী নয়। দলের কর্মীদের এ কথা মাথায় রাখতে হবে। আমরা মাগুরা অথবা ঢাকার উপনির্বাচন অথবা ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির মতো কোনো নির্বাচন আয়োজন করতে চাই না। ২০১৪ সালে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিতে বিএনপি আন্দোলনের নামে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, সামরিক একনায়কেরা নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে জনগণের রায়কে ছিনিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আমরা জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করেছি। স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও ছবিসহ ভোটার তালিকা চালু এবং অন্যান্য সংস্কারের মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, এ দল জাতির প্রতিটি অর্জনে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। তাই অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে আওয়ামী লীগের দায়-দায়িত্ব অনেক বেশি। দলের নেতাকর্মীদের এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
এ কথা স্পষ্ট যে, গত ১০ বছরে দেশে দৃশ্যমান অনেক উন্নয়ন হয়েছে। সরকারের ধারাবাহিকতা ছিল বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দলের নেতাকর্মীদেরকে ভোটারদের উদ্দেশে এই উন্নয়নের বর্ণনা দিয়ে ভোট চাইতে বলেছেন। শেখ হাসিনার নির্দেশনামতো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এখন সারাদেশে সরকারের উন্নয়নচিত্র তুলে ধরছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা সঠিকভাবে এই উন্নয়নচিত্র তুলে ধরছে বলেই গাজীপুর ও খুলনাতে জয় এসেছে। বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেটেও জয় আসবে। এই ৫ সিটি করপোরেশনের বিজয়ের পথ ধরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জয়ের মালা গলায় পরবে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।