রাজনীতি

খালেদা জিয়া কেন্দ্রিক বিএনপিতে নানামুখী কোন্দল চরমে : হতাশায় দলের তৃণমূল নেতাকর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক : দুর্নীতি মামলায় জেলে আছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এখন দলের দায়িত্ব নিয়েছেন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান। তারেক রহমান নিজেও দুটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ও বহু মামলায় অভিযুক্ত আসামি। তবে এ মুহূর্তে খালেদা জিয়াকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে বিএনপির পুরো রাজনীতি। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপি আন্দোলন করবে, না নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য দলটি আন্দোলন করবে সে সিদ্ধান্ত নিতেই তারা বহু মতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার পর এবং এরশাদের সময়েও সংকটে পড়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও একটা বড় সংকট তাদের গেছে। কিন্তু তাদের জন্য এবারকার পরিস্থিতিটা আরো জটিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি দল হিসেবে আছে এটা ঠিক, কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দলের মধ্যে সংহতি কতটা আছে। কারণ এই দলের অনেক নেতা অতীতে দল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন আবার দলে ফিরে এসেছেন, আবার চলেও যেতে পারেন। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে বিএনপি নেতাদের তৎপরতা বাড়তে থাকবে। সুতরাং এই সময়টা বিএনপির জন্য খুবই নাজুক। কিন্তু বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করছেন, তাদের নেতা জেলে যাওয়ায় দলীয় নেতাকর্মীরা আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ। তিনি বলেন, মামলা বিএনপিকে বেশি তি করতে পারবে না। কারাগারেও খালেদা জিয়াকে বেশিদিন রাখতে পারবে না। দল অটুট আছে, অটুট থাকবে। মামলা একটা বড় হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছে আওয়ামী লীগের সরকার। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস আমাদের কর্মীবাহিনী, জনগণ এগুলো উপো করে, মোকাবিলা করে আমাদের যে রাজনৈতিক ল্য সে ল্েয তারা পৌঁছতে পারবে।
অনেকেই মনে করেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির চূড়ান্ত রাজনৈতিক ল্য নির্বাচনে জয়ী হয়ে দলকে মতায় নিয়ে আসা। প্রায় ১১ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় মতার বাইরে রয়েছে বিএনপি। কারাগারে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরো একাধিক মামলা আছে রায়ের অপোয়। তারেক রহমানেরও দেশে ফেরার পরিস্থিতি নেই। সেক্ষেত্রে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানবিহীন আগামী নির্বাচন হবে বিএনপির জন্য বাঁচা-মরার খেলার মতো।
রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, বিএনপি একটি এক ব্যক্তি কেন্দ্রিক দল। বিএনপির মতো দলে সেকেন্ড ম্যান বলে কিছু নেই। তারেক রহমানকে দলটি সেকেন্ড ম্যান বলছে। কিন্তু তিনি রাজনীতিতে দৃশ্যমান নন। এটা আরেক ধরনের সংকট এবং এই সংকটটা আরো বড় মনে হচ্ছে যেহেতু নির্বাচনটা কাছে। সুতরাং নির্বাচনে এবার যদি বিএনপি খুব প্রস্তুতি নিয়ে মোকাবিলা করতে না পারে তাহলে তাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়তে হতে পারে। চলতি ডিসেম্বরেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। গত নির্বাচন বয়কট করা দল বিএনপি এবার যখন নির্বাচন করতে চাইছে তখন দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া কারাগারে। কেউ কেউ মনে করেন, যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে। এটা সামাল দেয়ার জন্য যে ব্যক্তিত্ব, ক্যারিশমা এবং নেতৃত্ব দরকার সেটা দলের মধ্যে খালেদা জিয়া ছাড়া আর কারো নেই। দলে যদি নেতৃত্ব না থাকে, দলের পাঁচজন নেতা যদি পাঁচ রকমের কথা বলেন, যেটা ইতোমধ্যে আলামত হিসেবে দেখা গেছেÑ সেই দল আগামী নির্বাচনে কী রকম ফলাফল করবে তা খোদ বিএনপি নেতাকর্মীদেরই চিন্তার কারণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে আদালতের রায়ের ওপর। এ অবস্থায় বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে বা খালেদা-তারেকের অবর্তমানে বিএনপির নেতৃত্ব প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন, নেতৃত্বের কোনো সংকট বিএনপিতে নেই। নতুন কিছু ভাবার কিছু নেই। আমরা এগুলো নিয়ে এতটুকু চিন্তিত নই, শঙ্কিত নই। এটা পার্ট অব পলিটিক্স। যতই ষড়যন্ত্র করা হোক খালেদা-তারেককে রাজনীতি থেকে সরানো যাবে না। এটা সম্ভব না।
তবে বাস্তবতা এবং বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি একটি পরিবার কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল। পরিবার কেন্দ্রিক রাজনীতির সমস্যাটা হচ্ছে এখানে যদি পরিবার থেকে ওই ধরনের আরেকজন ক্যারিশম্যাটিক লিডার বেরিয়ে না আসেন তখন ওই রাজনৈতিক দলটি আর টেকে না বেশিদিন। অতীতে মুসলিম লীগের একই পরিণতি হয়েছে। বিএনপিও সে পরিণতির দিকেই হাঁটছে! খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অবর্তমানে বিএনপির নেতৃত্ব দেয়ার মতো জিয়া পরিবার ও জিয়া পরিবারের বাইরের কাউকেই মনোনীত করা হয়নি। বিএনপির অনেক নেতাই আশা করছেন, খালেদা-তারেকের অবর্তমানে বিএনপির নেতৃত্ব যাবে তার-ই হাতে।
বিএনপিতে এখন কেন্দ্রীয় সব নেতাই খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের স্থলাভিষিক্ত হতে চাচ্ছেন। বিএনপি নেতাদের মোহে পরিণত হয়েছে বিএনপি চেয়ারম্যানের পদ। দলের ভিতরে-বাইরে অনেকেই মনে করেন, এই মোহের বাইরে নন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, সাদেক হোসেন খোকা ও নজরুল ইসলামসহ দলের অনেক শীর্ষ নেতৃত্বই।
বিএনপির এসব নেতা চাচ্ছেন খালেদা জিয়া জেলেই থাকুক। এ জন্য তারা খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সর্বাত্মক আন্দোলনে যেতে চাচ্ছেন না। তারা বারবারই বলছেন, আইনগতভাবেই খালেদা জিয়া জামিন পেয়ে জনগণের মাঝে আসবেন। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে আইনগতভাবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া যদি জামিনে মুক্তি না পান, তাহলেও বিএনপির এই পক্ষটি চাচ্ছে নির্বাচনে অংশ নিতে। খালেদা জিয়াকে জেলে এবং তারেক রহমানকে লন্ডন রেখে নির্বাচনে অংশ নিয়ে এমপি হয়ে শেখ হাসিনার নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার আনন্দে তারা এখনই বিভোর।
এই বিষয়টিই হতাশায় নিমজ্জিত করেছে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের। সুবিধাবাদী রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিতে গিয়ে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব এখন জেলে এবং ফেরারি জীবনে। বিএনপির নেতৃত্বে তারা কোনোদিন ফিরতে পারবেন কি না স্পষ্ট নয়। তারা যদি বিএনপির নেতৃত্বে ফিরতেই না পারেন, তাহলে পরিবার ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক এই দলটির পরবর্তী প্রধান কে হবেন, না সব নেতাই হয়ে যাবেন বিএনপিপ্রধানÑ সে চিন্তায় হতাশ ও দিগভ্রান্ত বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা।