খেলা

নারী ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে হলে বেতন-বৈষম্য দূর করতে হবে

ক্রীড়া প্রতিবেদক : বিশ্বকাপ ফুটবলে বাংলাদেশ নেই। কিন্তু বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ আছে। ক্রিকেটের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে তুলে ধরছেন ক্রিকেটাররা। তাই বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে ক্রিকেট খেলা এবং ক্রিকেটারদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। পুরুষ ক্রিকেটারের পাশাপাশি নারী ক্রিকেটারদেরও এক্ষেত্রে বিশাল অবদান রয়েছে। ক্রিকেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের নারীরাও বাংলাদেশকে তুলে ধরছেন বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে। সাম্প্রতিক সময়ে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের সাফল্যই যেন বেশি। কিন্তু ক্রিকেটে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের সাফল্য বেশি হলেও বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাতে পুরুষ ও নারী ক্রিকেটারদের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ বিদ্যমান।
উল্লেখ্য, সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এখন আর্থিকভাবে বেশ সমৃদ্ধ। কিন্তু ক্রিকেট বোর্ডের সব নজর যেন টাইগারদের দিকে। টাইগ্রেসদের দিকে তাদের তাকানোর সময়ও নেই। কদিন আগেই বেতন বেড়েছে সাকিব-তামিমদের। কিন্তু বাড়েনি শুধু রুমানাদের বেতন। এমনকি এই নিয়ে প্রস্তাবও ওঠেনি বোর্ড মিটিংয়ে।
বাংলাদেশ জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রা একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচপ্রতি পান ২ লাখ টাকা। আর সেখানে নারী ক্রিকেটারদের প্রতিটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার বিনিময়ে দেয়া হয় ৮ হাজার টাকা। অথাৎ পুরুষ ক্রিকেটারদের ২৫ ভাগের ১ ভাগ। ইংল্যান্ডের একজন নারী ক্রিকেটার একদিনের একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে বেতন পান প্রায় ৬০ হাজার টাকা, অস্ট্রেলিয়ার নারী ক্রিকেটাররা পান ৫৫ হাজার টাকা, সেখানে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটাররা পান ৮ হাজার টাকা। এই বৈষম্য নারী ক্রিকেটারদের পিছিয়ে দিচ্ছে ক্রমশ এবং তাদের মাঝে হতাশা তৈরি করছে।
ধরা যাক পুরুষ ক্রিকেটাররা বছরে ১৫টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন, সেখানে নারী ক্রিকেটাররা খেলেন বড়জোর ৫-৭টি। সেেেত্র একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচে খেলে আয়ের অনুপাতটা নারী ও পুরুষ ভেদে দাঁড়ায় ৫০:১। এর বাইরেও পুরুষ ক্রিকেটাররা টি-টোয়েন্টি ও টেস্ট ম্যাচও খেলেন। সেগুলো ধরলে অনুপাতটা ১০০:১ হয়ে যায়। অর্থাৎ ১০০ নারী মিলে যত আয় করেন, একজন পুরুষ একাই সেই পরিমাণ অর্থ পান।
এ তো গেল ম্যাচ ফির কথা। এবার আসা যাক মাসিক বেতনের ব্যাপারে। জাতীয় দলের একজন পুরুষ ক্রিকেটারের মাসিক বেতন ৪ লাখ টাকা। আর একজন নারী ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ মাসিক বেতন তিনটি গ্রেডে দেয়া হয় ৩০, ২০ ও ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ পুরুষ ক্রিকেটারের বেতনের ১৩ ভাগের ১ ভাগ। এবার জাতীয় ক্রিকেট লিগের ম্যাচ ফির প্রসঙ্গ। একজন পুরুষ ক্রিকেটার জাতীয় লিগের প্রতি ম্যাচে খেলে পান ৪০ হাজার টাকা। আর সেখানে নারী ক্রিকেটাররা পাচ্ছেন ৬০০ টাকা। অর্থাৎ একজন নারী ক্রিকেটারের ম্যাচ ফি এেেত্র একজন পুরুষ ক্রিকেটারের ম্যাচ ফির ৬৬ ভাগের ১ ভাগ। ছেলে আর মেয়ে ক্রিকেটারদের মধ্যে এমন বৈষম্য রেখেই গত ১৬ মে থেকে কক্সবাজারে শুরু হয়েছে জাতীয় ক্রিকেট লিগ।
আবার বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল এখনো ওয়ানডে স্ট্যাটাস পায়নি। তাই আইসিসি থেকে বিসিবি নারী ক্রিকেট বাবদ কোনো অর্থই পায় না। পুরুষ দলের স্পন্সররাই নারী দল, অনূর্ধ্ব ১৯ দল ও এ দলের স্পন্সরশিপের দায়িত্ব নিয়ে থাকে। কিন্তু এগুলো কখনোই তাদের কাছে গুরুত্ব পায় না। জাতীয় পুরুষ দলকেন্দ্রিক স্পন্সরশিপের চর্চাই চলে আসছে বিসিবিতে। বিসিবি উইমেন্স উইং চেয়ারম্যান আউয়াল ভুলু এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, স্পন্সররা কৃপণ। ছেলেদের ক্রিকেটে কোটি কোটি টাকা দিলেও মেয়েদের ক্রিকেটে তারা কোনো টাকা দিতে চায় না। তবে তিনি বলেন, ন্যূনতম স্পন্সর না পাওয়া উইমেন্স উইংয়ের ব্যর্থতা, একইভাবে দায় পড়ে বিসিবির মাকেটিং কৌশল ও বিসিবির কর্তাদের ওপর। স্পন্সরদের কাছে ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে স্পন্সর না পাওয়ার কোনো কারণ নেই।
মেয়েদের ক্রিকেটে স্পন্সরদের আগ্রহের কমতি গোটা ক্রিকেট দুনিয়ারই বাস্তবতা। সব দেশেই মেয়েদের ক্রিকেটে স্পন্সর কম, টাকা কম। বোর্ডের অন্যান্য সব খাতের আয় থেকে ভর্তুকি দিয়েই মেয়েদের ক্রিকেটকে এগিয়ে নেয় তারা। অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের মতো দেশগুলোর বোর্ড এভাবে প্রণোদনা দিয়েই মেয়েদের ক্রিকেটকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছে।
এশিয়ার অন্যতম ধনী বোর্ড বিসিবি, ভারতের পরেই যার অবস্থান। কিন্তু নারী ক্রিকেটকে সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা দিতে তারা মুন্সিয়ানা দেখাতে পারেনি। নারী ক্রিকেটেও যদি ছেলেদের মতো পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়, তাহলে নারীরাও একদিন ঠিকই ভালো করবে। আর তখন নারী ক্রিকেটও বিসিবির জন্য আর্থিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠবে। কিন্তু এজন্য বোর্ডকে অবশ্যই কিছুটা সময় দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা পুরুষ ও নারী ক্রিকেটারদের মধ্যে বৈষম্য, বঞ্চনা অব্যাহত রাখা হলে নারী ক্রিকেটের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে ফেলা হবে।