প্রতিবেদন

বাংলাদেশে বড় অঙ্কের বিনিয়োগে আগ্রহ দেখালেন সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক : একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চাবিকাঠি হলো বিদেশি বিনিয়োগ। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। শেখ হাসিনা উপলব্ধি করেন, বিদেশি বিনিয়োগ না আসার পেছনে অন্যতম কারণ হলো জ্বালানি সমস্যা। তাই তিনি জ্বালানি সমস্যা নিরসনকে তাঁর সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন। এরই অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পূর্ববর্তী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের রেখে যাওয়া মাত্র ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করতে যথাযথ কার্যক্রম গ্রহণ করেন। রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন, পুরনো বিদুৎকেন্দ্রগুলোকে আরো কার্যকরভাবে সচল, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং পরবর্তীতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরুর মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলতে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
দেশ বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পর বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্টের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জোর দেন স্পেশাল অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনে। এরই অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপিত হয় একাধিক এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন বা ইপিজেড। বিদেশি বিনিয়োগ আরো নিবিড়ভাবে পাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারাদেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের অবকাঠামোগত কাজ পুরোদমে চলছে। এসবের বাইরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখনই কোনো রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশ গিয়েছেন, সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন বড়সড় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল। বিদেশে রাষ্ট্রীয় সফরে শত ব্যস্ততার মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংশ্লিষ্ট দেশের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের ব্যবসায়ী নেতাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। সিঙ্গাপুর সফরে গিয়ে সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীদের উদ্দেশেও একই আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে সিঙ্গাপুরের একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে এসেছে। তারা বাংলাদেশে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে চায়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই দেশটির সঙ্গে দ্বিপীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির কৌশল গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় সিঙ্গাপুরের উদ্যোক্তারা এখন বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ আনার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। এরই অংশ হিসেবে সিঙ্গাপুরের বিজনেস ফেডারেশনের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। ১০ জুলাই বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপ বিডা এবং সিঙ্গাপুর বিজনেস ফেডারেশনের (এসবিএফ) যৌথ উদ্যোগে ঢাকার একটি হোটেলে দুদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ১১ জুলাই সফররত ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলটি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়।
জানা গেছে, গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সিঙ্গাপুর থেকে ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য ও সেবা আমদানি করা হয়েছে। বিপরীতে ওই সময়ে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৩৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য। যদিও জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আহরণে সিঙ্গাপুর দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সম হয়েছে। প্রতি বছর দেশটিতে জনশক্তি রপ্তানি বাড়ছে। এ অবস্থায় সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেবাখাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের এই বিনিয়োগ আনতেই এখন সরকারের যত চেষ্টা। ইতোমধ্যে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপ (বিডা) সিঙ্গাপুরের উদ্যোক্তাদের এফডিআই (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্ট) বাড়ানোর অনুরোধ করেছে। এ েেত্র সংস্থাটির প থেকে ওয়ানস্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করার আশ্বাস দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে বিডার চেয়ারম্যান কাজী মো. আমিনুল ইসলাম স্বদেশ খবরকে বলেন, বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদপে গ্রহণের ফলে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের েেত্র সম্ভাবনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের েেত্র সুদূরপ্রসারী অগ্রগতির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যেসব সুবিধা দেয়া হয়েছে সিঙ্গাপুরের েেত্র তা প্রযোজ্য হবে। দেশটির সঙ্গে বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধিতে করণীয় নির্ধারণে এফবিসিসিআই এবং সিঙ্গাপুর বিজনেস ফেডারেশনের (এসবিএফ) যৌথ উদ্যোগে ইতোমধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও সভা হয়েছে। এছাড়া সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশটিতে সম্প্রতি সফর করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। ইতোমধ্যে তিনি সিঙ্গাপুরের উচ্চ পর্যায়ের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এছাড়া বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সিঙ্গাপুর বিজনেস ফেডারেশন এবং বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার অব সিঙ্গাপুর একটি এমওইউ স্বার করেছে।
বাংলাদেশের প থেকে ইতোমধ্যে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সরকার ঘোষিত স্পেশাল ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগের জন্য সিঙ্গাপুরের উদ্যোক্তাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি জানান, সরকার বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগে উদারনীতি গ্রহণ করেছে। প্রয়োজনে বিনিয়োগকৃত অর্থ সম্পূর্ণ ফেরত নেয়া যাবে, এ বিষয়ে আইন দ্বারা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রা করা হয়েছে। তাই সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে বেশি লাভবান হবেন। সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারীরা চাইলে এক বা একাধিক ইকোনমিক জোন বরাদ্দ দেয়া হবে। কারণ সরকার ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্টকে (এফডিআই) বিশেষ গুরুত্ব ও সহযোগিতা দিচ্ছে।
এদিকে সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়িক সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের কাছে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ, সরকার প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা ও সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ অনেক পণ্য সিঙ্গাপুরে রপ্তানি করে। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি সিঙ্গাপুরে কাজ করছে। সেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্য রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এদেশের তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন, সেবাখাত ও বিদ্যুৎ খাতে সিঙ্গাপুরের উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে দেশটির উদ্যোক্তারা বাংলাদেশের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছেন বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মারজানুর রহমান স্বদেশ খবরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই সিঙ্গাপুরের সঙ্গে দ্বিপীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি ও বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং সেবাখাতে তাদের বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছেন। সিঙ্গাপুরের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে একক অথবা যৌথ বিনিয়োগ করতে পারেন। এেেত্র ইতোমধ্যে ওয়ানস্টপ সার্ভিসের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এছাড়া বেসরকারি খাতের কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন হলে সেটাও উদ্যোক্তারা নিতে পারবেন। তিনি বলেন, দেশে সরকারি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে বলেই এটা হচ্ছে। দেশে এখন সর্বোচ্চ বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বিরাজ করছে। সিঙ্গাপুরের উদ্যোক্তারা এ সুযোগ গ্রহণ করে লাভবান হতে পারেন।