আন্তর্জাতিক

মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ কোথায় নিয়ে যাবে বিশ্বকে

স্বদেশ খবর ডেস্ক : মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর মার্কিন-চীন সম্পর্কে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অপ্রত্যাশিত ফলাফলে ট্রাম্প প্রশাসন ৪৪ বছরের চীন-নীতি থেকে সরে এসেছে। বস্তুত তাইওয়ানকে চীনের অখ- অংশ মনে করার নীতিই এক চীন-নীতি। ১৯৭২ সালে চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের মধ্যে এক চীন-নীতির প্রতি মার্কিন সমর্থনের ব্যাপারে ঐকমত্য হয়। এরপর থেকে কোনো
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলেননি। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনালাপের মাধ্যমে তাদের সে অবস্থানের ইতি ঘটিয়েছেন। ফলে মার্কিন-চীন সম্পর্কের টানাপড়েনের পারদ আরও গতি পেয়েছে।
১৯৭২ সালে মাও-রিগ্যান সমঝোতার সাথে সঙ্গতি রেখে ১৯৭৯ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ৪৬ বছরে তাইওয়ানের ব্যাপারে চীনের অবস্থানকে সম্মান জানিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ৪৬ বছরের সেই রীতি ভেঙে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইং ওয়েন-এর সঙ্গে ফোনে কথা বলে বিতর্কের ঝড় তুলেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু সকল বিতর্ক ছাপিয়ে মার্কিন-চীন এখন মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। যা সর্বাত্মক সামরিক সংঘাতে রূপ না নিলেও এটি যে বাণিজ্য যুদ্ধের একটা অশুভ ইঙ্গিত বহন করে তা মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায়।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। গণচীনের এই অগ্রযাত্রা ও উত্থান যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এর যৌক্তিকতার বিষয়টিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। খুব সঙ্গত কারণেই চীনের প্রতি নরম-গরম নীতি চালিয়ে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। একদিকে বাণিজ্যযুদ্ধ এড়াতে আলোচনা, অন্যদিকে দণি চীন সাগরে সামরিক তৎপরতার পরিণতি সম্পর্কে চীনকে সতর্ক করে দিচ্ছে ওয়াশিংটন। দণি চীন সাগরে চীনের বেড়ে চলা সামরিক তৎপরতা গোটা অঞ্চলের মাথা ব্যথার কারণ। কিন্তু সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে ক্রম অগ্রসরমান চীন যুক্তরাষ্ট্রসহ কোনো শক্তিকে একেবারেই পাত্তা দিতে রাজি নয় বরং দেশটি আপন গতিতেই এগিয়ে চলেছে।
মূলত কোনো দেশ কোনো এক বা একাধিক পণ্য আমদানির ওপর কর, শুল্ক বা অন্য কোনো আর্থিক বোঝা চাপালে বাকি দেশগুলোও পাল্টা পদপে নিতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বিশাল দেশের সংঘাতের জের ধরে গোটা বিষয়টি আন্তর্জাতিক স্তরে বাণিজ্য যুদ্ধের আকার নিতে পারে। যা নিয়ন্ত্রণ মোটেই সহজসাধ্য হবে বলে মনে হয় না। বিগত শতাব্দীর তৃতীয় দশকে শেষ বাণিজ্য যুদ্ধের জের ধরে গ্রেট ডিপ্রেশন বা বিশাল মন্দা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুবার সে বছর শুল্ক সংক্রান্ত নতুন আইন কার্যকর করার ফলে ২০ হাজারেরও বেশি পণ্যের ওপর শুল্ক চাপানো হয়েছিল। এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রতিকূল বাণিজ্য ঘাটতির বিরুদ্ধে শুরু থেকেই তোপ দেগে এসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সমালোচকদের মতে, এমন সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির ফলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের স্বার্থ দেখতে পাচ্ছেন না। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কাঠামো তোলপাড় হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আন্তর্জাতিক মহলের সব সাবধানবাণী উপো করে ট্রাম্প যে আমদানির ওপর বাড়তি শুল্ক চাপিয়েছেন, তার পরিণতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ইতিবাচক হবে না। যেমন ইস্পাত আমদানির ওপর শুল্ক চাপালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও তার মূল্য বেড়ে যাবে। তার ফলে মার্কিন ইস্পাত কোম্পানিগুলোর লাভ হলেও ক্রেতাদের বাড়তি মূল্য গুনতে হবে। যে কোম্পানিগুলো ইস্পাত ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন করে, তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে।
এছাড়া আমেরিকায় ইস্পাত রপ্তানি করতে না পারলে চীন ইউরোপের বাজারে তা আরও সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রি করার চেষ্টা করতে পারে। স্বাভাবিক বাণিজ্য ব্যাহত হলে এমন আরও দৃষ্টান্ত দেখা যেতে পারে। সামগ্রিকভাবে এমন অস্বাভাবিক প্রবণতা নানাভাবে সাধারণ মানুষের জন্য তিকর হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক নানা সংকট কাটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি যখন সবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে, তখন নতুন করে এমন বিপদ দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে।
শেষ পর্যন্ত মার্কিন-চীন যে একটা অনাকাক্সিক্ষত বাণিজ্য যুদ্ধের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে তা মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মূলত সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত ৩ মে বেইজিংয়ের ওপর প্রথমবারের মতো কড়া শুল্ক আরোপ করার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্বের শেয়ার বাজারে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই বিশ্বযুদ্ধে দু’প ান্ত না দিলে, আরও রক্ত ঝরবে বিশ্বের বাজারে। যা কারো জন্যই কল্যাণকর হবে না।
শুধু ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক আরোপ নিয়ে নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিযুদ্ধও শুরু হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন গত আগস্টে চীনের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরির অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে। সম্প্রতি মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ ব্যাপারে শিগগিরই নতুন পদপে নেয়া হতে পারে। মার্কিন বাণিজ্য সচিব উইলবার রস বলেছেন, উচ্চ প্রযুক্তি হবে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কে চ্যালেঞ্জের নতুন ত্রে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, চীনের ওপর বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদসংক্রান্ত বড় ধরনের জরিমানা আরোপ করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিসের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম রাইনস বলেছেন, সব প্রশাসনের হাতেই বিভিন্ন সুযোগ থাকে, চরম থেকে মাঝারি যেকোনো পদপেই সে নিতে পারে। তিনি বিল কিনটনের প্রশাসনেও কাজ করেছেন। কিনটন প্রশাসনের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের পার্থক্য হচ্ছে এই প্রেসিডেন্ট চূড়ান্ত পদপে নিতেই বেশি আগ্রহী।
উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায় মার্কিন-চীন সম্পর্ক রীতিমতো সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠছে। আর এই সংঘাত সর্বাত্মক সামরিক রূপ লাভ না করলেও তা যে বাণিজ্যিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে তা স্পষ্ট করে বলা যায়। মূলত বিশ্ব রাজনীতিতে উভয় দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা থেকেই এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পরিণতিতে কী হতে যাচ্ছে তা বলার সুযোগ হয়ত এখনও সৃষ্টি হয়নি। তবে ভালো কিছু আশা করা দুরাশাই হতে পারে।