প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় শেখ হাসিনাকে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টেনিও গুটেরেজ ও বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমের অব্যাহত সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টেনিও গুটেরেস এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে তাদের অব্যাহত সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ১ জুলাই তাঁর তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে সৌজন্য সাাৎ করে তারা ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় প্রদানে বাংলাদেশের মহানুভবতার প্রশংসা করেন এবং এই বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে রয়েছে বলে জানান।
বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট এই সমস্যার সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার তাদের সংকল্পের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব এবং বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের ল্েয বাংলাদেশে আসেন। তারা মূলত রোহিঙ্গা সমস্যা এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়াবলী নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ মহাসচিব এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ স্বাগত জানিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সেই ১৯৭৭ সাল থেকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে চলে আসতে থাকার বিষয়েও তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ কেবল মানবিক কারণে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় প্রদান করেছে, কেননা এ দেশের জনগণেরও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতে শরণার্থী হিসেবে অনুরূপ আশ্রয় গ্রহণের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, সরকার প্রায় ১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে একটি দ্বীপে সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে যেখানে তারা জীবনযাপনের জন্য আরো ভালো অবস্থা পাবে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে সম্পাদিত সমঝোতার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার এটার বাস্তবায়নে এখনও কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
শেখ হাসিনা বলেন, সরকার স্বাস্থ্যসেবাসহ রোহিঙ্গাদের সকল প্রকার মানবিক সহযোগিতা প্রদান করছে, বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আগমনে স্থানীয় জনগণ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সহমর্মিতার কথা উল্লেখ করে জাতিসংঘ মহাসচিব এ বিষয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ বজায় রাখার এবং বাংলাদেশকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
জাতিসংঘ মহাসচিব রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় গোঁড়ামির বিষয়ে আশঙ্কা ব্যক্ত করে তাদের শিা পদ্ধতি পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাদের বিষয়ে মিয়ানমার আসলে কি করতে চায় সে বিষয়টি অনুধাবনের জন্য তিনি মিয়ানমারের ওপর আরো চাপ প্রয়োগের ওপরও জোর দেন। অ্যান্টেনিও গুটেরেজ এ সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং বাংলাদেশের সমস্যার সমাধানে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসার জন্য বিশ্বব্যাংকের পদেেপ সন্তোষ প্রকাশ করেন।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেন, উন্নয়ন কর্মকা- এবং মানবিক বিষয়াবলী একযোগেই বাস্তবায়িত হবে। বাংলাদেশ বিশ্ব ব্যাংকের ঋণের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রহীতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনার নেতৃত্বের প্রতি আমাদের আস্থা এ থেকেই প্রতীয়মান হয়।’
এলডিসিভুক্ত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রশংসা করে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি এ বিষয়ে ব্যাংকের বোর্ড অব গভর্নরসদের সভায় একটি প্রস্তাব পেশ করবেন যাতে বাংলাদেশকে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করা হয়।
জাতিসংঘ মহাসচিব গুটেরেজ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সেইসাথে সন্ত্রাস দমন কর্মকা- এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির ভূয়সী প্রশংসা করেন। বাংলাদেশকে তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অন্যতম সেরা দেশ হিসেবেও অভিহিত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলায় আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের চুম্বক অংশ তুলে ধরে বলেন, কাক্সিক্ষত উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ দ্রুতলয়ে এগিয়ে চলেছে এবং গেল অর্থবছরে বাংলাদেশ ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে সম হয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা এবং শান্তিরী প্রেরণে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের ভূমিকারও প্রশংসা করেন। জাতিসংঘ মহাসচিব ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ প্রদানের একটি আলোকচিত্রও প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেন।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেন, নির্মম দমন-পীড়নের মুখে মিয়ানমার থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে সহায়তার জন্য বিশ্বের কাছে থেকে বাংলাদেশের আরো বেশি সমর্থন প্রয়োজন। কিম বলেন, আমি সরাসরি এ সমস্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে জেনেছি এবং চরম দুর্দশাগ্রস্ত নারী ও পুরুষদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা তাদের গ্রামে ফিরত যেতে চায়। রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়ে বাংলাদেশ মহৎ কাজ করেছে। কিন্তু বর্ষা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং রোগ-ব্যাধির প্রাদুর্ভাবে তাদের আরো অনেক সমর্থন ও সহায়তা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই সহায়তার উদ্যোগ নিতে হবে।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টেনিও গুটেরেজ বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে সম্প্রতি পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কাছে সেখানে হত্যা ও ধর্ষণের যে সংখ্যার কথা শুনেছি তা অকল্পনীয়। তারা এখন ন্যায়বিচার এবং নিরাপদে ঘরে ফিরতে চায়। রোহিঙ্গারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বঞ্চিত ও নিগৃহীত একটি জনগোষ্ঠী।’
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট একটি মানবিক ও মানবাধিকারের েেত্র দুঃস্বপ্নের সংকট। বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের আশ্রয় দিয়ে ঔদার্য প্রদর্শনের জন্য আমি বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানাই।’ বর্ষা মৌসুমে রোহিঙ্গাদের সার্বিক অবস্থা নাজুক হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করে জাতিসংঘের মহাসচিব ওই সময় তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমি আজ বাংলাদেশে সাাৎকালে রোহিঙ্গাদের মনে যে প্রত্যাশা দেখেছি তা বর্ষার পানিতে ধুয়ে যেতে দিতে পারি না।’
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, পররাষ্ট্র মন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান, ইআরডি সচিব কাজী শহিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন এ সময় উপস্থিত ছিলেন।