অর্থনীতি

আসবাবপত্র রপ্তানিতে অভাবনীয় সাফল্য : গত অর্থবছরে রপ্তানি বেড়েছে ২০ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিদেশে ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বাংলাদেশে তৈরি আসবাবপত্র ও গৃহস্থালি পণ্য। গত এক দশক ধরে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এর রপ্তানি আয়। ফলে বিশ্ববাজারে ইতোমধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশের আসবাবপত্র। এর ধারাবাহিকতায় বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আসবাবপত্র রপ্তানি ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৬ কোটি ৩১ লাখ মার্কিন ডলারের আসবাবপত্র রপ্তানি হয়েছে। এর আগের ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ২৫ লাখ ডলার।
দেশের আসবাবপত্র শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের দাবিÑ গুণগতমান এবং যুগোপযোগী নকশায় আসবাবপত্র তৈরির ফলে বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশের আসবাবপত্র ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তাই নতুনত্ব আর আধুনিকতায় গত এক দশকে অনেক দূর এগিয়েছে বাংলাদেশের আসবাবপত্র শিল্প। বর্তমানে আরব বিশ্ব বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মূলত বাংলাদেশে তৈরি আসবাবপত্র রপ্তানি হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য মতে, বিগত অর্থবছরে আসবাবপত্র রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ কোটি ১০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে রপ্তানি আয় হয়েছে ৬ কোটি ৩১ লাখ ডলারের। সুতরাং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১ লাখ ডলার রপ্তানি আয় বেশি হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ আসবাবপত্র রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি কে এম আক্তারুজ্জামান স্বদেশ খবরকে বলেন, নিত্যনতুন নকশা, মানসম্মত কাঠ আর কারিগরদের দক্ষতায় তৈরি করা বাংলাদেশের আসবাবপত্রের মান খুব ভালো। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক বাজারে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের বিপুল চাহিদা মেটাতেও সক্ষম হচ্ছে।
ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ ও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য গুণগতমান উন্নয়ন এবং ডিজাইনে প্রতিনিয়ত নতুনত্ব আনা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে বর্তমানে আসবাবপত্র শিল্পে বাংলাদেশকে চীনের বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে। কানাডা, চীন, ইতালি, জার্মানি ও মালয়েশিয়ার মতো বৃহৎ আসবাবপত্র রপ্তানিকারক দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আসবাবপত্র প্রস্তুতকারক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
এ বিষয়ে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) মহাপরিচালক বিজয় ভট্টাচার্য স্বদেশ খবরকে বলেন, দেশের আসবাবপত্র শিল্পকে স্থায়ী রপ্তানি পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আসবাবপত্র রপ্তানিতে ১৫ শতাংশ নগদ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। নতুন বাজার সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বৈচিত্র্যপূর্ণ পণ্য তৈরিতে সরকার ব্যবসায়ীদের সহায়তা করছে। তিনি জানান, গত এক দশক ধরে বাংলাদেশের আসবাবপত্র রপ্তানি আয় ক্রমেই বেড়েছে এবং প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হচ্ছে। গত বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১ লাখ ডলারের বেশি আসবাবপত্র রপ্তানি হয়েছে। এই শিল্পকে আরো এগিয়ে নিতে কিছু প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কহার কমানোর দাবি জানান ইপিবি মহাপরিচালক বিজয় ভট্টাচার্য।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসবাবপত্র শিল্পে ব্যবহৃত প্রধান দুটি কাঁচামাল আমদানির ওপর যে ২৫ শতাংশ শুল্ক, ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রয়েছে, তার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে আসবাবপত্র রপ্তানির যে বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। তাই এ শিল্পের ওপর আরোপিত শুল্কহার প্রত্যাহার করা উচিত বলে তারা মত দেন।
বর্তমানে আসবাবপত্র তৈরিতে কাঠের বিকল্প হিসেবে পার্টিক্যাল বোর্ড ও এমডিএফ বোর্ড ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এগুলো দিয়ে তৈরি আসবাবের দাম মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে থাকছে এবং বাড়ছে রপ্তানির পরিমাণও। কিন্তু এর ওপর বর্ধিত শুল্কহার এ শিল্পকে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ফলে থার্স্ট খাত হিসেবে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও শিল্পটি যথাযথভাবে বিকশিত হতে পারছে না।
আসবাবপত্র শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা জানান, এই শিল্প খাতে সরকারের কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নেই; কোনো নীতিমালা প্রণীত হয়নি। এই শিল্পের কাঁচামাল সমস্যাও তীব্র। আসবাবপত্র তৈরির জন্য যে উন্নতমানের কাঠ প্রয়োজন তা দেশে বিশেষ পাওয়া যায় না। বেশিরভাগ কাঠ চোরাইপথে বা আমদানি হয়ে আসে বিভিন্ন দেশ থেকে।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ যেমন ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানও বনজসম্পদে সমৃদ্ধ। ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম প্রভৃতি রাজ্য এবং নেপাল ও ভুটান সমুদ্রবন্দরের সুবিধা বঞ্চিত হওয়ার কারণে কাঠ রপ্তানি কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছে না। ওইসব দেশের উল্লেখিত প্রতিকূলতা অতিক্রমের সুযোগ পেলে বাংলাদেশ এসব রাজ্য ও রাষ্ট্র হতে কাঠ আমদানির মাধ্যমে আসবাবপত্র তৈরি করে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতে পারে।
আসবাবপত্র শিল্প একটি শ্রমনির্ভর শিল্প হওয়ায় সস্তা শ্রমশক্তির দেশ বাংলাদেশ এ শিল্পে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করতে পারে। আসবাবপত্র শিল্পের বিকাশ ঘটলে দেশে কাঠের চাহিদা বেড়ে যাবে। ফলে সামাজিক বনায়নের উদ্যোক্তারা কাঠের ন্যায়সঙ্গত মূল্য পাবেন। দেশবাসী পতিত জায়গাজমিতে গাছ লাগাতে এগিয়ে আসবে। বনভূমির সম্প্রসারণ হবে। ফার্নিচার শিল্পের কাঁচামাল জোগানদার বনভূমি গাছের অভাব দূর করে দেশকে মরুকরণ প্রক্রিয়া, অনাবৃষ্টি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, কুয়াশা, তীব্র শীত ও অত্যধিক গরম থেকে রক্ষা করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসবাবপত্র শিল্প পোশাক শিল্পের মতো বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। তবে এ জন্য প্রয়োজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কারখানাগুলোকে একটি শিল্প এলাকায় স্থান দেয়া। পাশাপাশি ভোক্তার পরিবর্তনশীল পছন্দ ও প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিত্যনতুন আসবাবপত্র তৈরির জন্য দক্ষ নকশাবিদ গড়ে তোলা। ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের (আইটিসি) তথ্যানুযায়ী ২০০৬ সালে বিশ্বে আসবাবপত্র কেনাকেচা হয়েছে প্রায় ১৩৮ বিলিয়ন ডলারের। ২০০৭ সালে এর পরিমাণ ১৬২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২০০৮ সালে বিশ্বে আসবাবপত্র বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৮০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। আর ২০১৮ সালে এসে বিশ্বে আসবাবপত্র শিল্পে বাণিজ্যের পরিমাণ ৪৫০ বিলিয়ন ডলার।
বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের আসবাবপত্র রপ্তানির পরিমাণ কম হলেও বছর বছর তা বাড়ছে। তবে দামি ব্রান্ডের আসবাবপত্রের দেশীয় বাজার দখলের মধ্যেই এ শিল্পের সার্থকতা বেশি দেখা যাচ্ছে। দেশে বিদেশি আসবাবপত্র আমদানির যে ধারা তৈরি হয়েছিল তা কমিয়ে দিয়েছে অটবি, পারটেক্স, নাভানা, আকতার ও হাতিলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। এদের মতো অনেক প্রতিষ্ঠান এখন তৈরি করছে বিশ্বমানের আসবাবপত্র। কেউ কেউ হাসপাতালে ব্যবহার্য ধাতব বা কাঠের আধুনিক আসবাবপত্রও তৈরি করছে। ফলে বিদেশ থেকে বেশি দামি আসবাবপত্র আমদানির প্রয়োজন একেবারেই কমে গেছে।
জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আসবাবপত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করে। সারাদেশে প্রায় ৪১ হাজার প্রতিষ্ঠান নিয়ে এটি এখন একটি শিল্প। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ শিল্পকে আরো এগিয়ে নিতে এখন প্রয়োজন কিছু সরকারি উদ্যোগ। সবার আগে প্রয়োজন একটি শিল্প এলাকা।
আসবাবপত্র শিল্পের উদ্যোক্তারা বলেন, একটি শিল্প এলাকা হলে এ খাতটি একটি প্রকৃত শিল্প হিসেবে গড়ে উঠবে। বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি আমদানি করে উদ্যোক্তারা আরো ভালোমানের আসবাবপত্র তৈরি করতে পারবেন। পাশাপাশি আসবাবপত্র আমদানি কমায় তৈরি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে কাঁচামালের ওপর শুল্ক কমানো প্রয়োজন। উদ্যোক্তারা আরো বলছেন, আসবাবপত্র একটি উঠতি শিল্প খাত। এ খাতের প্রতি সরকারের সুদৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রথম প্রয়োজন একটি স্থায়ী শিল্প জোন। যেখানে কারখানাগুলো স্থাপন করা হবে। বিদেশিরা আসবেন। তারা আসবাবপত্র রপ্তানির আদেশ দেবেন। এ খাতের উদ্যোক্তারা জানান, এ শিল্পকে ঘিরে ২০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান রয়েছে। আসবাবপত্রের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জোগান দিয়ে থাকে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের তৈরি ফার্নিচার রপ্তানি করা হচ্ছে। এখন প্রয়োজন একটি শিল্প জোন ও কর্মীদের প্রশিক্ষণের একটি ইনস্টিটিউট। প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা পেলে গার্মেন্টসের মতো আসবাবপত্র শিল্পও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন পথরেখা তৈরি করতে সক্ষম হবে।