প্রতিবেদন

জনপ্রশাসন পদক-২০১৮ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী : জনপ্রশাসনকে অধিক জনবান্ধব করার আহ্বান শেখ হাসিনার

মেহেদী হাসান : ২৩ জুলাই ছিল জাতীয় পাবলিক সার্ভিস দিবস। এ দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনপ্রশাসন পদক-২০১৮ বিতরণ করেন এবং এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি জনপ্রশাসনকে অধিক জনবান্ধব করে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেক। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম এবং জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহমদ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। সরকারি কর্মচারীদের উদ্ভাবনী ও কৃতিত্বপূর্ণ কাজে উৎসাহ প্রদানের জন্য ২০১৬ সাল থেকে এই পদক চালু করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানে ৩৯ ব্যক্তি ও তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জনপ্রশাসন পদক-২০১৮ বিতরণ করেন। এতে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও সচিব, তিন বাহিনীপ্রধান, বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান এবং পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দেয়া ভাষণে বলেন, আমরা চাই দেশের উন্নয়নে সরকারি কর্মচারীরা তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাবেন। একটা সময় ছিল যখন সরকারি চাকরিতে কাজ করলেও বেতন, কাজ না করলেও বেতন পাওয়া যেত। কাজেই কাজ করলে করলাম বা না করলে নাইÑ এই চিন্তা কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের মনে রাখতে হবে দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ থেকে শুরু করে সকলের ট্যাক্সের টাকাতেই তাদের বেতন হয়। এজন্য দেশের মানুষের সেবা করার মানসিকতা লালন করতে হবে। তারা যেন অন্তত ভালো থাকে সেই চিন্তা সবসময় মাথায় থাকতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ের মানুষদের দিকে দৃষ্টি রেখেই এই চিন্তাটা করার আহ্বান জানাই আমি। তিনি বলেন, আমাদের সরকারি কর্মচারীরা যথেষ্ট মেধাবী। মেধা আছে বলেই তারা পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পাচ্ছেন। কাজেই তাদের মেধা, তাদের যোগ্যতা ও তাদের দক্ষতাকে আমাদের দেশ গড়ার কাজে যেমন লাগাতে হবে তেমনি তাদের গুণাবলি ও উদ্ভাবনী শক্তিরও মূল্যায়ন করতে হবে। এসব লক্ষ্য রেখেই আমরা যেমন পদোন্নতি দিয়ে থাকি এবং আজকের যে পুরস্কার বিতরণ সেটাও সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা করে যাচ্ছি। কোনো কাজ ফেলে রাখা এবং কাজের ক্ষেত্রে প্রচলিত লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধের জন্যও প্রধানমন্ত্রী সরকারি কর্মচারীদের প্রতি আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা প্রচলিত লাল ফিতার ধারণার অবসান ঘটিয়ে সরকারি সেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চাই। তাহলেই আমাদের উন্নয়ন সার্থক হবে। দেশ আরো উন্নত হবে এবং দেশে কোনো দারিদ্র্য থাকবে না। দেশকে আমরা গড়ে তুলতে পারবো, সেটাই আমাদের মাথায় রাখতে হবে।
সরকারি পর্যায়েও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগানো হচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ২০১২ সাল থেকে গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট নামে একটি আলাদা শাখা খোলা হয়েছে। এই ইউনিটের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন নতুন উপায় উদ্ভাবন করে সরকারি সেবা প্রদান পদ্ধতি সহজ করা। পাশাপাশি সরকারি কাজের জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়াই তাঁর সরকারের লক্ষ্য উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এই এগিয়ে যাওয়ার জন্যই আমাদের সবসময় উদ্ভাবনী শক্তি নিয়ে কাজ করতে হবে, যেন আমরা অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে উন্নত ও সমৃদ্ধ হতে পারি। তিনি সরকারি কর্মচারীদের জন্য দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ এবং উচ্চশিক্ষায় তাঁর সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রির জন্য আপনাদের অনেক সময় বিদেশ পাঠানো হয়। ডিগ্রি নিজের জন্য নয়, দেশের মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাবেন। মানুষের জীবনমানের যেন উন্নয়ন হয়, সে কাজে লাগাবেন।
দেশের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা নিজেদের অর্থ দিয়ে পদ্মাসেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করেছি। ঢাকায় মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে, দেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছি, সারাদেশে বিদ্যুতায়ন করা হচ্ছে এবং দেশব্যাপী ইন্টারনেট সার্ভিস চালু হয়েছে। বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, রাজধানীকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী অতি অল্প সময়ের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করা তাঁর পরিকল্পনায় রয়েছে। এজন্য দ্রুতগতির বুলেট ট্রেন আমরা করতে পারি। আমরা যদি ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-দিনাজপুর ও ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে পায়রাবন্দর এবং ঢাকা থেকে কলকাতা পর্যন্ত বুলেট ট্রেন চালু করতে পারি, তাহলে সমগ্র দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক উন্নত ও দ্রুত হবে। তিনি বলেন, সেইসাথে ঢাকাকে ঘিরে একটা এলিভেটেড রিং রোড তৈরি করা হবে। নদীগুলো খনন করে নৌপথ তৈরি এবং পাশাপাশি রেলপথ তৈরি করা হবে। এছাড়া মাল্টি স্টোরয়েড বিল্ডিংয়ের মাধ্যমে আবাসন সৃষ্টি করে নতুন নতুন নগর আমরা গড়ে তুলব। এভাবে আমাদের দেশকে আমরা উন্নত করতে পারি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ কাজের জন্য দিনে রাজধানীতে এলেও রাতে যেন তারা নিজ শহরে ফিরে যেতে পারেÑ জনসংখ্যার আধিক্যের কথা মাথায় রেখে সেভাবেই চিন্তা করতে হবে।
এই পর্যায়ে শেখ হাসিনা জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে বলেন, আমি সবসময় মনে করি, আমি শুধু প্রধানমন্ত্রী নই, জাতির পিতার কন্যা। সেই হিসাবে সবাই আমার পরিবার। আপনজন হারিয়ে আমি বাংলাদেশে এসেছি। কাজেই এই দেশকে আমি সেভাবেই গড়ে তুলতে চাই, যেটা জাতির পিতার স্বপ্ন ছিলÑ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলা। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে না পারায় নানা উন্নয়ন প্রকল্প থেমে গিয়েছিল উল্লেখ করে ভবিষ্যতে যেন এমনটি না হয়, সে জন্য দেশবাসীকে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী।
এ সময় ’৭৫-পরবর্তী সরকারগুলোর দুঃশাসনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের উন্নয়নের জন্য আত্মনিয়োগ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশ অনেক দূর এগিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট; সব শেষ। এরপর যারা ক্ষমতায় এসেছেন তারা নিজেদের ভাগ্য বদলের কাজ করেছেন। ফলে দেশের উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। দেশ চালানোর জন্য ভিশন লাগে। লক্ষ্য স্থির করতে হয়। এই লক্ষ্য স্থির করে কাজ করেছি বলে আমরা দেশকে এগিয়ে নিতে পারছি। আগামী ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে কেমন দেখতে চাই, সেই লক্ষ্য স্থির করেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সরকারের সময় শেষ হয়ে আসছে। আগামী ডিসেম্বরে নির্বাচন। জনগণ ভোট দিলে আছি, না দিলে নাই। এ জন্য কোনো আক্ষেপ নেই। তবে দেশটাকে উন্নয়নের মহাসড়কে তুলে দিয়েছি, তা যেন অব্যাহত থাকেÑ জনপ্রশাসন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি এটাই আমার নির্দেশ।