আন্তর্জাতিক

বিশ্বের একক সুপারপাওয়ার হওয়ার প্রতিযোগিতায় চীন-যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিশ্বের একক সুপারপাওয়ার হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। সর্ববৃহৎ অর্থনীতির এই দুটি দেশের এই সঙ্ঘাতকে অশনি সঙ্কেত হিসেবে দেখা হচ্ছে বিশ্ববাণিজ্যের জন্য। সামরিক খাত ও বিশ্বে প্রভাববিস্তার নিয়ে দুই দেশের লড়াই এবার ছড়িয়ে পড়ছে নতুন একটি ফ্রন্টে। দেশের অর্থনীতির দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশে আমদানিকৃত চীনের পণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়ার পরই চীন পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এতে উভয় দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যার প্রভাব পড়বে সারা বিশ্বের ব্যবসাবাণিজ্যের ওপর।
নির্বাচনি প্রচারণার সময় করা সব বিতর্কিত অঙ্গীকারই পূরণ করে চলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বারাক ওবামার সময় চালু করা নিজ দেশের নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প ওবামা কেয়ার বাতিল করেছেন। অভিবাসন নীতি বিশেষ করে মুসলিম অভিবাসীদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছেন। জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও অনেক দূর এগিয়েছে। নাফটা চুক্তি থেকে ইতোমধ্যে বের হয়ে গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর বিশ্ব অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে চীনের সাথে শুরু হওয়া বাণিজ্যযুদ্ধ। এ সবই ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনি অঙ্গীকার। দেশের রক্ষণশীল ভোটারদের কাছে এসব অঙ্গীকার করেই নির্বাচনে জিতেছিলেন কট্টর জাতীয়তাবাদী ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নির্বাচনি প্রচারণার সময়ই বারবার বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতারণা করছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার দখল করেছে চীনারা। তাদের শিক্ষা দিতে তিনি চীনা বাণিজ্যের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করবেন। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গত জানুয়ারিতে আমদানিকৃত সৌর প্যানেল ও ওয়াশিং মেশিনের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্চের শেষ দিকে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যে ২৫ শতাংশ ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। ওই সব পণ্যের আমদানিমূল্য আনুমানিক ৬ হাজার কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্ক বৃদ্ধির ঘোষণার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত মদ, শূকরের মাংস, ফলসহ ৩০০ কোটি ডলারের মার্কিন পণ্য আমদানির ওপর শুল্ক বসায় চীন। ১৫ শতাংশ থেকে শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার ঘোষণা দেয়। মূলত এর মাধ্যমেই বেজে ওঠে বাণিজ্যযুদ্ধের দামামা। বিনিয়োগকারী থেকে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ সবাই শঙ্কা প্রকাশ করেন দুই পরাশক্তির নতুন এ লড়াই নিয়ে। এরপর কয়েকদফা আলোচনা হয় বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে। মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী উইলবার রস ও চীনা উপ-প্রধানমন্ত্রী লিও হির মধ্যে তিনদফা বৈঠক হয় এ বিষয়ে। নতুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর বেইজিং সফরের সময়ও আলোচনা হয় বাণিজ্য ইস্যুতে। একপর্যায়ে উভয় দেশই নতুন শুল্ক আরোপের বিষয়টি স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়, কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও নতুন করে ২০ হাজার কোটি ডলারের চীনা পণ্যে শুল্প আরোপের ঘোষণা দেন। ট্রাম্প মনে করেন, চীনের কাছে বাজার খুলে দিয়ে আমেরিকার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের শত শত শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। ট্রাম্পের সর্বশেষ শুল্ক আরোপের ঘোষণার পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা ইতোমধ্যেই দিয়েছে চীন। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ট্রাম্পের নতুন ঘোষণাকে ব্ল্যাকমেইল হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বেইজিং বলছে, ইতঃপূর্বের বৈঠকগুলোতে দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে এটি তার বিরোধী। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও হতাশ করেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ঘোষণা। শক্ত প্রতিক্রিয়া ও সমপরিমাণ পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কাজেই তাদের পক্ষ থেকে নতুন কোনো ঘোষণা আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সমগ্র বিশ্বব্যবস্থা যখন মুক্তবাণিজ্য ও উদার নীতির দিকে ঝুঁকছে, সে সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প হাঁটতে শুরু করেছেন সম্পূর্ণ উল্টো পথে। বিশ্বের এক ও দুই নম্বর অর্থনীতির মধ্যে এই বাণিজ্যযুদ্ধের পরিণতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা বাণিজ্যযুদ্ধে বিশ্ববাজারে ইতোমধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনকে মোকাবিলা করতে গিয়ে ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করছেন। এমনকি ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির অনেকেও অবস্থান নিয়েছে তার এই একরোখা বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে। অবশ্য ট্রাম্প এসবকে পাত্তাই দিচ্ছেন না। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, এতে আমেরিকার কোনো ক্ষতি নেই বরং লাভ। আসলেই এতে আমেরিকার কোনো লাভ আছে কি না তা নিশ্চিত হতে পারছেন না কেউই। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের বাণিজ্য বিষয়ক রিপোর্টার অ্যান্ডু ওয়াকার মনে করেন, এতে সমস্যা আরো বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে, ফলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে মার্কিন নাগরিকদেরই। অ্যান্ডু ওয়াকার মনে করেন, যেসব চীনা পণ্যে শুল্কারোপ করা হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে মার্কিন আমদানিকারকরা চীন বাদ দিয়ে বিকল্প সাপ্লায়ার খুঁজে নেবে, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের খুব বেশি লাভ হবে না।
অবশ্য বিশ্বের অনেক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মনে করছেন, ট্রাম্পের এটি একটি রাজনৈতিক চাল। চলতি বছর অনুষ্ঠিত হবে সিনেট নির্বাচন। এ নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জিতিয়ে আনতে ট্রাম্প দেশের বাণিজ্য উন্নয়ন ও বেকারত্ব হ্রাসের এই টোপ ফেলেছেন। আর মার্কিন ভোটাররা যে কট্টর জাতীয়তাবাদী ইস্যুগুলোকে সমর্থন করে, সেটি তো ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই দেখা গেছে। কিন্তু কথা হচ্ছে চীনের সাথে নতুন একটি সেক্টরে যুদ্ধ লাগিয়ে কতটা সফল হবেন ট্রাম্প? চীন বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় শক্তি। অনেক দিন ধরেই তাদের অর্থনীতির চাকা ক্রমেই জোরে ঘুরছে। বিশ্ববাজার দখলে এখন চীন সবাইকে ছাড়িয়ে। তাই এ যুদ্ধে চীনকে পরাজিত করা ট্রাম্পের পক্ষে সম্ভব নয়। এমনিতেই বাণিজ্যযুদ্ধ আসলে কাউকে থামিয়ে রাখতে পারে না। রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তবুও সমান তালে যুক্তরাষ্ট্রকে টক্কর দিয়ে চলেছে মস্কো। আর সারা বিশ্বেই চীনা বাজারের যে অবস্থা, তাতে তাদের হারানো ট্রাম্পের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং বিশ্বের শীর্ষ সুপারপাওয়ার হওয়ার প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যে সারা বিশ্বের বাণিজ্য ব্যবস্থাকেই তছনছ করে ছাড়বে, তা হলফ করেই বলে দেয়া যায়।