কলাম

বড়পুকুরিয়া দুর্নীতিতে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি

কয়লার অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া বিদ্যুকেন্দ্র। গত ২৪ জুলাই ২৭৪ মেগাওয়াটের নতুন ইউনিটটিও বন্ধ হয়ে যায়। এর মাধ্যমে বড়পুকুরিয়ার কয়লাখনির ওপর নির্ভর করে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির যে তিনটি ইউনিট গড়ে উঠেছিল, তার সবগুলোই বন্ধ হয়ে গেল। এতে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তা মারাত্মক আকার ধারণ করেনি। কারণ জরুরি ভিত্তিতে সিরাজগঞ্জ হতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেয়া হয়েছে। এর আগে বড়পুকুরিয়ার উত্তোলিত কয়লার মজুদ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কোল ইয়ার্ডে কাগজে-কলমে কয়লার যে মজুদ ছিল, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধি সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে সেখানে ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লার ঘাটতি দেখতে পান; যার বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক’শ কোটি টাকা। এতে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির এমডি ও জিএম (প্রশাসন ও কোম্পানি সচিব)’কে স্ট্যান্ড রিলিজ এবং মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) ও ডিজিএম’কে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস)’র নেতৃত্বে গঠন করা হয় ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী প্রাথমিক তদন্তে কয়লার ঘাটতি পেয়েছে দুদক এবং এ বিষয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পূর্ণ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এই ঘটনার পর কেউ কেউ ধারণা করছেন যে, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র চুরি করে খোলাবাজারে এসব কয়লা বিক্রি করে দিয়েছে। এ খনি হতে উৎপাদিত কয়লা পিডিবির বিদ্যুৎকেন্দ্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহ করার পর দেশের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান, ইটভাটা, চা বাগান ও অন্য ব্যবহারকারীদের কাছে বিক্রি করা হয়। তবে সদ্য অপসারিত এমডির বক্তব্য হলো কোল ইয়ার্ডে কাগজে-কলমে যে কয়লার হিসাব দেখানো হচ্ছে তা সঠিক নয়। তার মতে, ২০০৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১ কোটি ২০ লাখ টন কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে। কিন্তু কোনো সময় সিস্টেম লস বা উৎপাদন ঘাটতিকে হিসাবে নেয়া হয়নি। খনি হতে কয়লা উৎপাদনের পর কয়লাতে জলীয়বাষ্প থাকার কারণে পরবর্তীকালে এক থেকে দুই শতাংশ কয়লা এমনিতেই ওজন হারিয়ে ফেলে। এজন্য আন্তর্জাতিকভাবে দুই শতাংশ সিস্টেম লস ধরা হয়। আমরা মনে করি, দেড় শতাংশ সিস্টেম লসও যদি ধরা হয়, তাহলে এই ঘাটতি সঠিক রয়েছে। অর্থাৎ এটি হিসাবের গরমিল বা ভুল বুঝাবুঝিও হতে পারে, আবার চুরিও হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২ বিলিয়ন টন কয়লার মজুদ আছে আমাদের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে। কিন্তু ভারত ও চীনসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো তাদের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে কয়লাশক্তির ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল হলেও আমরা এর সদ্ব্যবহার করতে পারছি না। এমনকি বড়পুকুরিয়ায় মাটির নিচে যে কয়লার মজুদ আছে, তার ১০ ভাগও আমরা এখনো উত্তোলন করিনি। সুতরাং কয়লাশক্তির ব্যবহারে একটি সমন্বিত, ভারসাম্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। আমরা আশা করি, সিস্টেম লস হিসাবের পরও বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে যদি প্রকৃত অর্থে দুর্নীতি হয়ে থাকে, তাহলে এর সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি। না হয় দুর্নীতি ও চুরিকে প্রশ্রয় দেয়া হবে; যা আমাদের কারোরই কাম্য নয়।