কলাম

মাদকের মারাত্মক ছোবল থেকে তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতেই হবে

ড. এম এ মাননান : এক বন্ধুর কাছে একজন তরুণ গাঁজাখোরের গল্প শুনেছিলাম। গাঁজা সেবনের পর তরুণ গাঁজাখোর ঝিম মেরে বসে থাকে। আস্তে আস্তে মনটা হালকা হয়ে রিমঝিম ছন্দ তুলে ধীর ধীরে শূন্যে ভেসে ভেসে দিগদিগন্তে ছুটতে থাকে। ভাসতে ভাসতে উঠতে থাকে ঊর্ধ্ব গগনে, উপরে আরও উপরে। একসময় হারিয়ে যায় ভূগোলক ছেড়ে অন্য লোকে। অন্তরের গহিনে তার সমগ্র বিশ্বের প্রশান্তি ডানা মেলে পাখিদের মতো কূজন করতে থাকে। যখন আসে হুঁশ তখন কল্পনার নীল গগনে বিচরণরত আকাশের মহানায়কের ধপাস ধরণীতল। আবার চোখ-মুখ লাল করে ঝিম মেরে বসে থাকা। এভাবেই চলে তার দিন-রজনী। মা-বাবা দুশ্চিন্তায়, কলেজ পড়–য়া ছেলেটার হলোটা কী! কলেজে যায় না, আড্ডা মারে বাজারের গলিতে, রাত হলে চলে যায় নেশার কবলে, আড্ডার বন্ধুরা চিবিয়ে চিবিয়ে খায় ছেলেটার ভবিষ্যৎ। ইদানীং নাকি ইয়াবা হকারদের খপ্পরেও পড়েছে। হেরোইন আর ফেনসিডিল তার কাছে নস্যিতুল্য। দিন দিন শীর্ণকায় হয়ে যাচ্ছে, হাত-পা দুর্বল, ক্ষিদে কম, কাজকর্ম করার মতো শারীরিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। কিডনি, লিভার, হার্ট বিনষ্ট হয়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে তারুণ্যের মাঝপথেই। পত্র-পত্রিকায় মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের যুদ্ধ ঘোষণার খবর পড়তে গিয়ে গল্পটি মনে পড়ল। গাঁজা, ভাং, ইয়াবা ধরনের মাদক জীবন নিঃশেষ করে দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন মারাত্মক নেশাজাতীয় দ্রব্য। নেশা ধরায় আরও অনেক রকমের মাদক যেমন হেরোইন, ফেনসিডিল, অ্যালকোহল, তামাকজাত দ্রব্য (জর্দা, গুল, সাদাপাতা) এবং নামে-বেনামে আরও অনেক মাদক যেগুলো একজন মানুষের প্রাণ-ভোমরাকে মূল থেকে করে দেয় নিষ্ক্রিয়।
ইয়াবার উৎপত্তিস্থল হচ্ছে মিয়ানমার। এ দেশটি সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ, ভারত আর থাইল্যান্ডে ইয়াবা পাচার করছে বহু বছর ধরে। মিয়ানমারের নির্জন পাহাড়ের ঘন অরণ্যের ভেতরে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল নামের এলাকা ইয়াবা ব্যবসায়ের কেন্দ্রবিন্দু। দেশটির সরকার নিজের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধির লোভে এ জঘন্য ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। মাদক আরও আসে আফগানিস্তান থেকে। ব্রিটিশরা কয়েক শতাব্দী আগেই বিভিন্ন প্রকার মাদক অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশে প্রচলন করে দিয়েছিল যাতে প্রজারা রাজার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার মতো শক্তি হারিয়ে ফেলে, যেন মাদকাসক্ত হয়ে সারা দিনরাত ঝিম মেরে পড়ে থাকে।
বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের একটা বড় অংশই ডুবে যাচ্ছে মাদকে, হারিয়ে ফেলছে জীবনীশক্তি। অকর্মণ্য হয়ে যাচ্ছে সমাজজীবনে। বোঝা হয়ে যাচ্ছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের। মাদকাসক্ত হয়ে এরা হয়ে যাচ্ছে উচ্ছৃঙ্খল, করছে ছিনতাই, রাস্তায় আর অলিগলিতে করছে বখাটেপনা, জড়িয়ে পড়ছে চুরি-চামারি আর খুন-খারাবিতে। মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজন অসহায় নয়নে দেখছে তাদের প্রিয়জনটি শুরুর আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে তিলে তিলে। মাদকসেবীরা কোথাও কোথাও ভাইকে, মাকে, স্ত্রীকে, বাবাকে পর্যন্ত খুন করছে নেশার ঘোরে কিংবা মাদক কেনার টাকার জন্য। কলেজছাত্রী ঐশীর কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে; যে মেয়েটি নেশার কারণে নিজ বাবা-মাকেই হত্যা করার অপরাধে আদালতের রায়ে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলার জন্য অপেক্ষমাণ।
তবে আশার কথা হলো সরকার ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ এখন এক্ষেত্রে বেশ সজাগ। এ বছরের ৪ মে থেকে সারাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। এতে দেশের সাধারণ মানুষ ভীষণ খুশি। তাদের মনে স্বস্তি আসায় সমর্থন দিচ্ছে তারা অকুণ্ঠচিত্তে। সবাই বুঝতে পেরেছে এক কোটির কাছাকাছি মাদকসেবী শুধু তাদের পরিবারের জন্যই নয়, বরং পুরো দেশের বোঝায় পরিণত হচ্ছে। শহরের গ-ি ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলেও মাদকের আগ্রাসন ছড়িয়ে গেছে। চাহিদার ঊর্ধ্বগতির সাথে সাথে মাদককারবারির সংখ্যাও বাড়ছে সারাদেশে। একই সাথে বাড়ছে সমাজের বোঝা। এ বোঝা আরও বাড়তে থাকবে যদি না মাদকের আগ্রাসন রাস টেনে ধরা যায়। যে যা বলে বলুক, মাদকবিরোধী অভিযান চালাতেই হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না মাদকের সমূলে উৎখাত হয়।
উল্লেখ্য, কেবল বাংলাদেশ নয়, বরং মাদক নিয়ে সারাবিশ্বের মানুষই এখন বেশ বিচলিত। দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়া, উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো, আফ্রিকার নাইজেরিয়া আর সাউথ আফ্রিকা, এশিয়ার ফিলিপাইন আর থাইল্যান্ডে মাদকের রমরমা ব্যবসা। এদেশগুলোতে অনেক আগে থেকেই মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হচ্ছে। অভিযানে মরছে অসংখ্য মাদকব্যবসায়ী আর মাদকসেবী। কাজেই বাংলাদেশ একাই মাদকবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে না। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান সারাবিশ্বে বহু আগে থেকেই পরিচালিত হয়ে আসছে। ফিলিপাইনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট দুতার্তে তো রীতিমতো মাদকের বিরুদ্ধে ক্রুসেড ঘোষণা করেছেন। কিছুদিন আগে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় দেখেছি সাধারণ মানুষ পর্যন্ত কিভাবে মাদককারবারিদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত। বাংলাদেশেও এমনটি দেখে আমরা আশান্বিত। তবে মাদকবিরোধী এ অভিযানে যেন কোনো নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্টদের নজর দিতে হবে। আলোর মধ্যেও কখনো কখনো পোকা ঢুকে আলোকে অনুজ্জ্বল করে ফেলে। মাদকের ক্ষেত্রেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, যারা মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের মধ্যে কিছু অসাধু ব্যক্তি মাদককারবারিদের সাথে যোগসাজশে লিপ্ত। একটি পত্রিকার সংবাদে দেখতে পেলাম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২১৩ জন সদস্যকে শনাক্ত করা হয়েছে, যারা মাদকের ব্যবসায়ে মদদ দিচ্ছে। এ ধরনের অসুখকর খবর আমাদেরকে উদ্বিগ্ন করে। তবে একটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার, আর তা হলো কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এককভাবে মাদক নির্মূল করা যাবে না। মাদক থেকে পরিত্রাণের আরও উপায় খুঁজতে হবে। কিছু উপায় এখানে তুলে ধরলাম :
১. উৎসমূল ধ্বংস করা
মিয়ানমার সীমান্ত এমনভাবে বন্ধ করা দরকার যাতে কোনোভাবেই মাদক দেশের ভিতরে ঢুকতে না পারে। সীমান্তে পাহারা চৌকি তৈরি করে সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা করার কোনো বিকল্প নেই। এই মিয়ানমার রোহিঙ্গা বিতাড়নের সাথে সাথে মাদকও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দিচ্ছে।
২. চাহিদা বন্ধ করা
চাহিদা বন্ধ হলে জোগান এমনিতেই স্বাভাবিক নিয়মে বন্ধ হয়ে যাবে। তাই পারিবারিক ও সামাজিকভাবে জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মাদকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এর জন্য পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন আরো দৃঢ় করতে হবে।
৩. সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক
কর্মকা- বৃদ্ধি করতে হবে
খেলাধুলার পরিবেশ সৃষ্টিসহ জারিগান, সারিগান, যাত্রাগান, বিকেলে মাঠে খেলার ব্যবস্থাকরণ, বৈশাখী মেলা, পূজা-পার্বণে অনুষ্ঠান, ফুটবলের সুদিন ফিরিয়ে আনা এবং স্কুল-কলেজের মাঠগুলোকে সকলের জন্য মুক্ত করে দেয়া অপরিহার্য।
৪. শিক্ষকসমাজকে মাদকবিরোধী
সচেতনতা তৈরিতে সম্পৃক্ত করা
দিনের একটা বড় অংশ শিক্ষার্থীরা কাটায় স্কুল-কলেজ ও শিক্ষকদের সান্নিধ্যে। শিশুদেরকে ব্যস্ত রাখতে হবে গানে, খেলায়, বাগানের কাজে, চিত্রাঙ্কনে, নাটকে, বিতর্কে, বৃক্ষরোপণে, গল্প-কবিতা লেখার প্রতিযোগিতায়, রচনা প্রতিযোগিতায়, গল্পের বই পড়ায়। নিরানন্দ, একঘেয়ে লেখাপড়ার হাত থেকে তাদের মুক্তি দিয়ে সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখা খুবই জরুরি। বিড়ি-সিগারেটের কুফল থেকে শুরু করে সকল প্রকার নেশা জাতীয় জিনিসের ক্ষতিকর দিকগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে প্রাঞ্জল ভাষায় নিয়মিত তুলে ধরতে হবে মাসিক আলোচনা বা মতবিনিময় সভায়।
৫. মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনকে
এ কাজে সম্পৃক্ত করা
সারাদেশে অবস্থিত ৩ লাখ মসজিদের ৬ লাখ ইমাম-মুয়াজ্জিনের মাধ্যমে মাদকবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টি করা যেতে পারে। পবিত্র ধর্মগ্রন্থে উল্লিখিত মাদক সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিশেষ করে সূরা মায়িদার ৯০ ও ৯১ নম্বর আয়াত থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট হাদিস তুলে ধরে তারা সব অপরাধ-অনাচার-পাপের জনক মাদকব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের আখেরাতে ভয়ঙ্কর পরিণতির কথা প্রচার করতে পারেন।
৬. পারিবারিক সচেতনতা সৃষ্টি করা
সন্তানদের সাথে পারিবারিক বন্ধন বাড়াতেই হবে। সম্পর্কের উষ্ণতা বাড়াতে না পারলে নিজের অজান্তে পরিবারেই বিপর্যয় নেমে আসবে। পরীক্ষার চাপে রেখে খেলাধুলা কমিয়ে দিয়ে সকালে ক্লাস আর বিকেলে কোচিং-এ পাঠিয়ে সন্তানকে কী উপহার দিচ্ছি আমরা? নিজের অজান্তেই ঠেলে দিচ্ছি মাদকের হাতে!
৭. দেশজুড়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা
কেউ কেউ মাদক নির্মূলের জন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছেন। মনে হয়, আইডিয়াটা উত্তম।
অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য মানবাধিকারের ধুয়া তুলে যারা রাজনৈতিক বাঁশি বাজাতে ব্যস্ত, তাদের বাঁশি বাজতে থাকুক; মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলতেই থাকুক। কারণ তাদের বাঁশি একবার বাজতে শুরু হলে আর থামে না, থামবেও না। অযথা বাঁশি বাজানো এদের বদ অভ্যাস। ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়া মাদকের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এ যুদ্ধে পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই। তাই মাদকের অভিশাপ থেকে তরুণ সম্প্রদায় তথা এ জাতির ভবিষ্যৎকে রক্ষা করতেই হবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট এবং উপাচার্য
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়