ফিচার

সন্তানের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ সঞ্চার করবেন যেভাবে

সন্তানকে বিচ্ছিন্ন মানুষ নয় পরিবারের অংশ হিসেবে গড়ে তুলুন। সন্তানের মধ্যে আত্মিক আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের সঞ্চার করুন। ধর্মের শাশ্বত বাণী ও সুন্দর কথাগুলো তাকে বলুন, এতে তার নৈতিকতা ও মানবিক শক্তি জাগ্রত থাকবে। তাতে সে হয়ে উঠবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সত্যিকারের সম্পদ। যেকোনো ভাল কাজে সন্তানকে উদ্বুদ্ধ করুন, তা না হলে সে খেয়ালিপনা ও বিপথে পা বাড়াতে পারে। ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি ও পণ্যদাসত্বের ফলে সারা বিশ্বজুড়েই বিনোদনের অর্থ আজ বদলে গেছে। বিনোদন বলতে সাধারণত এখন যা বোঝানো হয় তা আসলে কোনো সুস্থ চর্চা নয়। বরং এগুলো মানুষকে মনোদৈহিকভাবে ক্রমশ অসুস্থ ও অবসন্ন করে তোলে। করে তোলে বিচ্ছিন্ন ও আত্মকেন্দ্রিক। ঘরে ঘরে আজ এর সবচেয়ে ভয়াবহ শিকার হচ্ছে আমাদের সন্তানেরা। ফলে শিশু-কিশোর তরুণদের একটি বড় অংশই হয়ে পড়েছে বিষন্ন ও হতাশ; যাদের জীবনে নেই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও গন্তব্য। তাই এরা বিভ্রান্ত হয় খুব সহজেই।
সুতরাং লাগামহীন বিনোদন আর নিত্যনতুন প্রযুক্তিপণ্যের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়ে সন্তানকে আত্মকেন্দ্রিক করে তুলবেন না। তাকে পরিবারের অংশ হিসেবে গড়ে তুলুন। প্রযুক্তিপণ্যের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও ফেসবুক ইন্টারনেট-ভিডিও গেমস-এর আসক্তি দেখা দিয়েছে মাদকাসক্তির চেয়েও বেশি মারাত্মকরূপে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাঙ্গন, সমাজ কোথাও নেই কোনো নৈতিকতা ও সঠিক ধর্মজ্ঞান শিক্ষার আয়োজন। ফলে তরুণরা সহজেই আক্রান্ত হচ্ছে অধর্ম দ্বারা। যার ফলে সমাজে বাড়ছে অনৈতিকতা, ধর্মান্ধতা ও মূল্যবোধের সীমাহীন অবক্ষয়। আর বাড়ছে মনোদৈহিক অসুস্থতা ও হিংস্রতা। তাই আহ্লাদ দিয়ে সন্তানের যেকোনো আবদার বা সব আবদার পূরণ করবেন না। এতে সে বাইরের জগতের কাছ থেকে কখনও প্রত্যাখ্যাত হলে প্রতিশোধপরায়ণ হবে, তাই ভুলেও সন্তানের সব চাওয়া না মিটিয়ে শুধু প্রয়োজনটুকু মিটান। তবেই সে আত্মনির্ভরশীল ও বাস্তববাদী হবে। আপনি যদি তাকে প্রয়োজনীয় সময় না দেন তখন সে মোবাইল/টিভি/ইন্টারনেট/ফেসবুক ও বাজে আড্ডায় জড়াবে ও বিপথে যেয়ে নষ্ট হবে। তাই পেশাগত কাজের ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে সন্তানকে বঞ্চিত করবেন না ও তার প্রতি বেখেয়াল হবেন না। সন্তান ভুল করলে তাকে আহ্লাদ দিবেন না বা প্রশ্রয় দিবেন না। তাকে তার ভুল ধরিয়ে দিন ও মাশুল পেতে দিন। তখন ওই পরিণতি থেকে সে শিক্ষা নেবে এবং সংশোধন হবে। সন্তান ভুল করলে তা পাপ হিসেবে বিবেচনা না করে তা শোধরাতে তাকে সুযোগ দিন। এতে তার চিন্তা ও মূল্যবোধের ভারসাম্য হবে।
সন্তানের ভুল শোধরানোর জন্য প্রয়োজনে তার প্রতি কঠোর বা দৃঢ় হতে দ্বিধা করবেন না, কারণ আপনার এই দৃঢ়তা তাকে অনেক অনাগত বিপদ থেকে রক্ষা করবে। আপনার সঠিক দৃঢ়তা সন্তানের মধ্যে নিরাপত্তা বাড়াবে। তাই সন্তানের প্রতি মনোযোগী ও দৃঢ় হোন। সন্তানের বদঅভ্যাস দূর করতে শাস্তি দিন, কিন্তু মারবেন না। শিশুকাল থেকে সন্তানের মধ্যে দাতার অভ্যাস গড়ে তুলুন। সন্তানের ভালো বন্ধু হোন কারণ বন্ধু দ্বারাই সে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে। আপনার নিজের জীবনের দুঃখ-কষ্টের কারণে হোক আর বঞ্চনার কারণেই হোক সে দুঃসহ অভিজ্ঞতার কারণে ভুলেও সন্তানের প্রতি আসক্ত হবেন না। কারণ আপনার মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি ও দুবর্লতা তাকে মেরুদ-হীন করে তুলতে পারে, যা তার সাফল্যের পথে অন্তরায়। তার বেড়ে ওঠার সময়ে তার সব আবদার ভুলেও মেটাবেন না। মাঝে মাঝে না শুনতে অভ্যস্ত হতে দিন ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিস দিবেন না। মাঝে মাঝে উপহার দিয়ে তার ভালো কাজকে উৎসাহিত করুন। তবেই সে বখাটেপনা ও বিকৃত মানসিকতা থেকে দূরে থাকবে।
সন্তান কিছু চাইলে বা আবদার করলে ভুলেও তা সাথে সাথে মিটাবেন না বা পূরণ করবেন না। কারণ এতে সে যেকোনো জিনিস পেতে আসক্ত হবে এবং তার নৈতিক মূল্যবোধে ঘাটতি হতে পারে। তাই একটু বিরতি নিয়ে তার আবদারের যেগুলো সঠিক ও প্রয়োজনীয় তা মিটানোর চেষ্টা করুন। এতে তার মানসিক ও শারীরিক দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। সন্তান আপনার সম্পত্তি নয়, সে আপনার কাছে আল্লাহর আমানত। তাকে যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ও নৈতিক গুণে গুণান্বিত করে অনন্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন। কারণ এটা আপনার জীবনের প্রধান দায়িত্ব। সন্তানের প্রতি কর্তব্য পালনের জন্য প্রতিদানের আশা করবেন না আর বার্ধক্যে তাকে আশ্রয়স্থল ভাববেন না, কারণ আল্লাহই প্রকৃত আশ্রয়দাতা।
স্নেহের বাড়াবাড়িতে আপনার সন্তানকে ননীর পুতুল বানাবেন না। কারণ এ দুনিয়ায় আপনি যখন থাকবেন না তখন তাকে বিভিন্ন প্রতিকূলতার সাথে জীবনযাপন করতে হবে। তখন সে নিজেকে প্রতিরোধ না করতে পেরে পরাজিত হয়ে খেই হারিয়ে ফেলবে। নিজেরা কষ্ট করে তাকে আয়েশি জীবন উপহার দিবেন না। তাকে আয়েশি জীবনে অভ্যস্ত করে তুললে পুরো রাজত্ব ও সাম্রাজ্য পেলেও সে বিপদে পড়লে তা রক্ষা করতে পারবে না। তাকে সব ব্যাপারে আপনাদের ওপর নিভর্রশীল করে তুলবেন না তাহলে আপনাদের অনুপস্থিতি তার ভোগান্তি বাড়াবে। ছোটবেলা থেকে সন্তানকে কষ্ট ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলুন। তার নিজের কাজগুলো তাকে করতে দিন। শুধু পরীক্ষায় এ + পেতে নয়, জীবনে প্রথম হওয়ার গুণাবলি অর্জনে তাকে সহায়তা ও উদ্বুদ্ধ করুন। নৈতিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন সঠিক ধর্মজ্ঞান। ধর্মই মানুষকে সুশীল, বিনয়ী ও মানবিক করে। সঠিক ধর্মজ্ঞানের মাধ্যমেই মানুষ বুঝতে পারে তার জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
নৈতিকতা, অহিংসা ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি সহমর্মিতাই তখন হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় শক্তি। অস্ত্র, হিংসা বা উগ্রতা নয়। তাই সন্তানকে ছেলেবেলা থেকেই একটি লক্ষ্য দিন। শুধু পড়াশুনা ও বিনোদনের নামে সন্তানকে একা ঘরে থাকতে অভ্যস্ত করবেন না। তাকে ভালো কাজে ব্যস্ত রাখুন। সন্তানের ভালো বন্ধু হোন আর আপনার উপস্থিতি যেন তাকে আনন্দিত করে। মাথার ওপর যতক্ষণ আপনার হাত থাকবে ততক্ষণ কোনো অপশক্তি তাকে বিপথগামী করতে পারবে না।