প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত বিশাল গণসংবর্ধনায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা : উন্নয়নের মার্কা নৌকার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টির জন্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

মেজবাহউদ্দিন সাকিল : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ গণসংবর্ধনা দিয়েছে। গণসংবর্ধনায় প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ জড়ো হয়। আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের অকৃত্রিম সংবর্ধনায় ২১ জুলাই তারিখে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সিক্ত হন জননেত্রী শেখ হাসিনা। লাখ লাখ মানুষের ভালোবাসায় আবেগে আপ্লুত হয়ে গণসংবর্ধনার মঞ্চে ওঠে উন্নয়নের মার্কা নৌকার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টির লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদাত্ত আহ্বান জানান। দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ করে শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের কাছে যান, তাদের কথা শুনুন, তাদেরকে সরকারের উন্নয়নের কথা বলুন, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য নৌকা মার্কায় ভোট দিতে বলুন।
আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ৬ মাস আগে দেশকে স্বল্প আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করা, গ্লোবাল উইমেন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড অর্জন, ভারতের আসানসোলের কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি লিট ডিগ্রি লাভ ও মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট পাঠানোসহ সাড়ে ৯ বছরে সরকার পরিচালনায় অভাবনীয় উন্নয়ন ও দেশি-বিদেশি বিরল স্বীকৃতি অর্জনের জন্য শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ গণসংবর্ধনা দেয়া হয়। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেয়া ওই গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এবং উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলামের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মানপত্র পাঠ করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
এ উপলক্ষে সকাল দশটা থেকেই ঢাকার আশপাশের জেলা ও মহানগর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমবেত হতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রতীক নৌকা ও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’র ছবিসহ বিভিন্ন ধরনের ফেস্টুন নেতাকর্মীদের হাতে দেখা যায়। উন্নয়ন ও অর্জনে অসাধারণ সাফল্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সমাবেশে এদিন জনতার ঢল নামে। লাল-সবুজ পোশাকে উদ্যানের সমাবেশস্থল ও আশপাশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট, মৎস্য ভবন ও শাহবাগ এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রতীক ‘নৌকা’ নিয়ে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, নেচে-গেয়ে খ- খ- মিছিল নিয়ে জনসভায় আসেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, সড়ক দ্বীপে শোভা পায় আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রতীক নৌকা, উন্নয়নের স্লোগান এবং প্রধানমন্ত্রীর সাফল্যগাথা সংবলিত বিলবোর্ড-প্ল্যাকার্ড। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকেও সাজানো হয় নানা রঙের ব্যানার ফেস্টুন ও পোস্টারসহ অপরূপ সাজে।
সাংস্কৃতিক নানা আয়োজনের মধ্যে শুরু হয় গণসংবর্ধনার আনুষ্ঠানিকতা। উন্নয়নের ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়। আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটির পক্ষ থেকে সরকারের অর্জন ও উন্নয়ন সংবলিত একটি প্রকাশনা সবার হাতে তুলে দেয়া হয়।
গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক মিছিলে দলীয় নেতাকর্মীদের দেশাত্মবোধক গানের তালে তালে ব্যান্ডপার্টি ও বাদ্যযন্ত্রসহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। এ সময় তারা শেখ হাসিনার জন্য বাংলাদেশ ধন্য, শেখ হাসিনার সরকার বার বার দরকার, মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেক বার, বঙ্গবন্ধুর বাংলায় রাজাকারের ঠাঁই নাই প্রভৃতি স্লোগান দেয়। ঢাকার আশপাশের জেলা ও মহানগরের নেতাদের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও জাতীয় শ্রমিক লীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন মিছিল নিয়ে গণসংবর্ধনায় যোগ দেয়। তাছাড়া রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশের জেলার আওয়ামী লীগের দলীয় সংসদ সদস্য ও আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও বিশাল বিশাল মিছিল নিয়ে গণসংবর্ধনায় যোগ দেন।
দুপুর বারোটার মধ্যে গণসংবর্ধনার বিশাল প্যান্ডেল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। প্যান্ডেলের ভেতর স্থান সংকুলান না হওয়ায় ১২টার পরে আসা নেতাকর্মীরা প্যান্ডেলের পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশের খালি জায়গায় অবস্থান নেয়। সেখান থেকে তারা প্রজেক্টরের মাধ্যমে গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। বিকেল তিনটার পর পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান জনসমুদ্রে পরিণত হয়। লোক সঙ্কুলান না হওয়ায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সকল প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে হাইকোর্টের সামনের শিক্ষা ভবন মোড় থেকে দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমি, টিএসসি, শাহবাগ, কাঁটাবন ও বাংলামোটর পর্যন্ত পুরো এলাকা জনারণ্যে পরিণত হয়। দুপুর ১২টা থেকে দেশের বরেণ্য শিল্পীরা দেশাত্মবোধক ও বাউল গান পরিবেশন করতে থাকেন। গানের ফাঁকে ফাঁকে চলে কবিতা আবৃত্তি। গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন বাউল সম্রাজ্ঞী মমতাজ বেগম, কণ্ঠশিল্পী শুভ্রদেব, এস ডি রুবেল, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী রফিকুল আলম, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, সালমা, আশরাফ উদাস ও ফকির শাহাবুদ্দিন প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিকেল সাড়ে তিনটায় গণসংবর্ধনা মঞ্চে এসে উপস্থিত হন। তিনি মঞ্চে এসে হাজির হলে হাজার হাজার নেতাকর্মী দাঁড়িয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা নাড়িয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান। এ সময় মমতাজ বেগম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বে দেশের উন্নয়ন ও অর্জনের ওপর ভিত্তি করে রচিত দু’টি গান পরিবেশন করেন। এরপর আবহমান বাংলার সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি গীতিনাট্য পরিবেশিত হয়। তারপর নন্দনকলার পরিবেশনায় আরো একটি গীতিনাট্য পরিবেশিত হয়। তারপর ‘তুমি শেখ হাসিনা, তুমি অনন্যা’ শিরোনামে আরো একটি গান পরিবেশিত হয়। অতঃপর পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মাধ্যমে গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
মানপত্রে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আওয়ামী লীগকে তিন বার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সফল নেতৃত্ব দেয়ার জন্য দলের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানান।
ওবায়দুল কাদেরের পঠিত মানপত্রে বলা হয়, আপনার সফল নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়ন ও অর্জনে গোটা বিশ্বের কাছে রোল মডেল। উন্নত বিশ্বের কাতারে শামিল হওয়ার আকাক্সক্ষা এখন আর খুব বেশি দূরে নয়। পদ্মাসেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়েসহ দেশের মেগা প্রজেক্টগুলো বাস্তবায়নের পথে। সমুদ্রসীমা জয়, স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর, দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়নসহ দেশের অভাবনীয় উন্নয়ন গোটা বিশ্বের কাছে বিস্ময়। সামরিক স্বৈরশাসনের অবসান, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আপনার সফল নেতৃত্বের কারণেই সম্ভব হয়েছে। আপনার সফল নেতৃত্বে শুধু জল ও স্থল নয়, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে পাঠানোর মাধ্যমে অন্তরীক্ষও জয় করা সম্ভব হয়েছে। আপনার এ উন্নয়ন ও অর্জনের জন্য পুরো জাতি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। মানপত্রে বলা হয়, বাঙালি জাতিকে একটি জাতিরাষ্ট্র উপহার দেয়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন যুগ যুগ ধরে বাঙালি মানসে অমর হয়ে থাকবেন তেমনি আপনিও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় সফল নেতৃত্ব দেয়ার জন্য বাঙালি জাতির মনে চির জাগরুক হয়ে থাকবেন।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে দাঁড়িয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের কলি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে।’ প্রাপ্ত সংবর্ধনা বাংলার মানুষকে উৎসর্গ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা জনগণের। আমার সংবর্ধনার প্রয়োজন নেই। আমি জনগণের জন্য কাজ করতে এসেছি। তাদের জন্য কাজ করছি। এদেশের মানুষের ভাগ্য যেদিন পরিবর্তন হবে, সেদিন নিজেকে সার্থক মনে করবো। গণসংবর্ধনায় দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যারা বলে ‘নৌকা ঠেকাও’ তাদের লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, তাহলে কি তারা ওই রাজাকার এবং যুদ্ধাপরাধীদেরকেই আবার ক্ষমতায় বসাতে চান? শেখ হাসিনা বলেন, দেশে আবার একটা শ্রেণি রয়েছে দেশের কোনো উন্নয়নই যাদের চোখে পড়ে না। আবার কেউ কেউ বলেন, নৌকা ঠেকাতে হবে। আমার প্রশ্ন নৌকা কেন ঠেকাতে হবে। নৌকা ঠেকিয়ে কি ওই রাজাকারদের, যুদ্ধাপরাধীদেরকেই আবার ক্ষমতায় আনবেন?
তাঁর লক্ষ্যই দেশের উন্নয়ন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে যারা মনে করেন প্রবৃদ্ধি অর্জন ভালো নয়, দেশ উন্নয়নশীল হলে ভালো নয়, তাদের আমার সন্দেহ হয়, তারা বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে কি না বা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে কি না। নাকি তারা ওই স্বাধীনতাবিরোধীদের পদলেহনকারী সেটাই আমার প্রশ্ন। এই নৌকায় ভোট দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার পেয়েছে, এই নৌকায় ভোট দিয়েছে বলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, এই নৌকায় ভোট দিয়েছিল বলেই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, এই নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছিল বলেই বাংলাদেশ উন্নত হচ্ছে এবং আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উন্নীত হতে পেরেছি। আমরা পরমাণু বিদ্যুৎ ক্লাবে পৌঁছাতে পেরেছি। আমরা স্যাটেলাইট যুগে পৌঁছাতে পেরেছি, আজ বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২২ ভাগে নেমে এসেছে এবং দারিদ্র্যের হার আরো হ্রাস করে বাংলাদেশকে আমরা সম্পূর্ণরূপে দারিদ্র্যমুক্ত করতে পারবো ইনশাআল্লাহ।
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামনে বন্যা আসার সময় হচ্ছে। এই শ্রাবণ মাস শেষে ভাদ্র মাসেই আবার পানি আসতে পারে। তখন তারা কি নৌকায় চড়বে না, তাদেরকেও তো নৌকায় চড়তে হবে। অন্তত রাজনৈতিক নেতা যারা তাদের ত্রাণ বিতরণ করতে গেলেও নৌকাতেই যেতে হবে। তাহলে নৌকা ঠেকাবেন কেন? নৌকার অপরাধটা কী? শেখ হাসিনা বলেন, যারা নৌকা ঠেকাতে চায় তাদের কাছে সেটাই আমার প্রশ্ন?
শেখ হাসিনা বলেন, যারা ওই সামরিক শাসকদের উচ্ছিষ্ট খেয়ে জীবনধারণ করেছে, বড় হয়েছে; কেবল তাদের মুখেই একথা মানায়। কিন্তু যারা দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তাদের মুখে এ কথা মানায় না। দেশে গণতন্ত্র নেই বলে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স এবং ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন আওয়ামী লীগেরই দাবি ছিলÑ যাতে জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচিত করতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর স্থানীয় ও তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সাড়ে ৬ হাজারেরও বেশি নির্বাচন, উপ-নির্বাচন হয়েছে। প্রত্যেকটি নির্বাচনে জনগণ ভোট দিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচিত করেছে। গণতন্ত্র যদি দেশে নাই থাকবে, তাহলে মানুষ ভোট দিয়ে এসব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলো কিভাবে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় নির্বাচন ঠেকানোর নামে বিএনপির ভাঙচুর, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা এবং নৈরাজ্যের কঠোর সমালোচনা করে জনগণের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, জনগণ প্রতিহত করেছিল বলেই তারা ব্যর্থ হয়ে ঘরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, এই দেশ আমরা স্বাধীন করেছি। আওয়ামী লীগ জাতির পিতার হাতে গড়া সংগঠন আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই জনগণ কিছু পায়। দেশের জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়, তাদের অস্তিত্ব টিকে থাকে।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত দেশের মানুষ দেখেছে যে কী হয়েছে। এদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। আজকের বাংলাদেশ বিশ্বে যে মর্যাদা পেয়েছে সেখান থেকে দেশকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য। একটি দেশকে কিভাবে আমরা উন্নত করবো সেই পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। সেই কথা চিন্তা করেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, তাঁর সরকার এই রাজধানী ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-দিনাজপুর, ঢাকা-বরিশাল, পায়রাবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে দ্রুতগতির বুলেট ট্রেন চালু করে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত করে তুলবে। আকাশপথে যোগাযোগ বৃদ্ধির পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের বিমানবহর একেবারে ধ্বংসপ্রাপ্ত ছিল, ইতোমধ্যে নতুন বিমান ক্রয় করা হয়েছে, আরো ৭টি নতুন বিমান আমরা ক্রয় করবো; যা আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করবে। সেই সাথে সৈয়দপুর বরিশাল, রাজশাহী, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে আরো উন্নত করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে ধ্বংসপ্রাপ্ত রেলের পুনরুজ্জীবনে সরকার আলাদা মন্ত্রণালয়সহ নতুন নতুন স্থানে রেল যোগাযোগ স্থাপন করে যাচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সমগ্র বাংলাদেশে আজ তাঁর সরকার সড়ক যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। তাছাড়া দেশের সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে পায়রাবন্দর এবং উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত চার লেন সড়ক করে দেয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন শেখ হাসিনা। নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে দেশের নদ-নদীগুলোর নাব্যতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নৌ চলাচলের জন্য চ্যানেলগুলো উন্মুক্ত করায় তাঁর সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে; এখন জনগণের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাঁর সরকারের লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৫ ঘণ্টা ঘুমান আর বাকি সময় দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করেন উল্লেখ করে বলেন, আমি কোনো উৎসবে যাই না। সারাক্ষণ আমার একটাই চিন্তাÑ দেশের উন্নয়ন এবং দেশের মানুষের উন্নয়ন।
জাতির পিতার কাছ থেকে পাওয়া রাজনৈতিক শিক্ষার আলোকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়াই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতার পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশকে গড়ে তুলবো। প্রতিটি গ্রামকে শহর হিসেবে গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি গ্রামের মানুষ সকল নাগরিকসুবিধা পাবে। সেভাবেই আমরা গ্রামের মানুষের অবস্থার উন্নতি করতে চাই। শিক্ষা-দীক্ষায় সবদিক থেকে বাংলার মানুষ উন্নত জীবন পাবে। ক্ষুধা আর হাহাকার থাকবে না। একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না। প্রত্যেকটা মানুষ উন্নত জীবন পাবে। শেখ হাসিনা দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, মৃত্যু যখন আসবে তখন মৃত্যু আসবেই। কিন্তু মৃত্যুর আগে আমি মরতে রাজি নই। তার আগে যতক্ষণ জীবন আছে বাংলার মানুষের সেবা করে যাবো। এই পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের জিয়া বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধে জিয়াই ‘দায়মুক্তি’ অধ্যাদেশ জারি করে বিচারের পথ রুদ্ধ করেছিল। আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম যে ক্ষমতায় যেতে পারলে বঙ্গবন্ধুর খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবো। সে কাজ করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশ কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। আজ বিশ্বে আবারো বাংলাদেশের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশে উদযাপিত হবে এবং ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ।