সাহিত্য

আসছে গুজব দমন কমিশন গুদক!

অরুণ কুমার বিশ^াস
গুজবে ছেয়ে গেছে দেশ, যে যেভাবে পারছে কথার ফুলঝুরি ছড়াচ্ছে আর মনের মাধুরী মিশিয়ে মিথ্যের বেসাতি খুলে বসেছে।
কিসের ব্যবসাÑ গুজবের! মূলধন কী! কিছুই না, স্রেফ ঠোঁট আর জিভ। টরে টক্কা।
গুজব কী জিনিস, দেখতে কেমন, খায় না মাথায় ঢালে ইত্যাকার সব প্রশ্ন পেটের ভিতর আচ্ছাসে ঘাই মারছে।
গুজবের আভিধানিক অর্থ রটনা, মিছে কথা কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সত্যের অপলাপ ছড়ানো। গুজব এমন জিনিস, আমরা জেনেবুঝেও গুজবে বিশ^াস করি। অনেকটা চিপস-চানাচুরের মতোন। কিন্তু গুজব যদি হয় এমন, যা কিনা জাতীয় জীবনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তখন তো আর তাকে হালকাভাবে নেয়ার উপায় থাকে না। রসালো গুজব দমনের জন্য দরকার পড়লে ভিনদেশ থেকে পালোয়ান ভাড়া করে আনতে হয়। নয়তো যারা এসব ছড়াচ্ছে, উঁকুনের মতো তাদের পিলে টিপে মারতে হবে।
প্রসঙ্গত মহারাজা চন্দ্রগুপ্তের রাজসভার মন্ত্রক চাণক্য প-িতের কথা অনুসৃজন করা যায়। তার ভাষ্যমতে, গুজবে কান দেয়া আর নিজের কবর নিজেই খোঁড়া সমান কথা।
নেহাতই নাদান প্রকৃতির মানুষ গুজবে বিশ^াস করে। ফলে যা হয়, দেশব্যাপী একরকম আস্থার সংকট তৈরি হয়, কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে বোঝার কোনো উপায় থাকে না।
প্রশ্ন উঠতে পারে কে, কেনই বা গুজব সৃষ্টি করে। এসব করে লাভটা কী হয়! লাভ একেবারে যে নেই তাই বা বলি কি করে! গুজব ছড়ালে সত্যের চেহারা আবছা হয়ে যায়, ব্ল্যাক মার্কেটের মতো সাদা টাকার উপরে কালো টাকা চেপে বসে। ফলে মতলববাজদের ঘোলা জলে মাছ শিকার করতে সুবিধা হয়। যাকে বলে মুখোশ-নৃত্য।
আমার এক জ্ঞানপাপী বন্ধু আছে, যে কিনা কথায় কথায় দেশপ্রেমের ঝা-া তোলে। অথচ দেশে তার কিচ্ছু নেই। এমনকি, নিজের বউ পোলাপানও ভিনদেশে পাঠিয়ে সে দেশে বসে জ্ঞানবাণী ঝাড়ছে। চলমান বিশৃঙ্খলার মাঝেও সে বগল বাজিয়ে বলে, গুজব নয়, গুড জব।
আবার এক নিন্দুক বলে কিনা গুজব নয়, গু-জব। গুজব ভাইরাল হলে দুর্গন্ধ ছড়াবেই। কারণ ওটা গু-জব। এঁদো ঘেঁটে তো আর ফরাসি সুগন্ধি মেলে না। ডাস্টবিনে ময়লাই থাকে, খুশবু নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো এই প্রাণঘাতী গুজব থামাবার উপায় কী! বাঙালি স্বভাবতই আবেগপ্রবণ। মনের মতো কিছু পেলে তা আঁকড়ে ধরে উদ্বাহু হয়ে নাচতে থাকে। নিজের নাক কেটে হলেও অপরের যাত্রাভঙ্গ করতে এদের জুড়ি নেই। বলা বাহুল্য, গণতন্ত্রে দলাদলি থাকে। থাকবেই। যদিও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর লেকির মতে, গণতন্ত্র ক্ষণভঙ্গুর। আবার কেউ কেউ মনে করেন, গণতন্ত্র আদতে গাধার তন্ত্র।
সে যাই হোক, তাই বলে গুজব ছড়াবে! কে কোন দল করছে সেটা বড় কথা নয়, তারা কোন্দলে বেশ আছে। কোন্দল সৃষ্টিতে গুজব একটি নতুন অস্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। সময়ে সামাল দিতে না পারলে গুজবের দুর্গন্ধ আরো বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই।
রাজা-উজির-সভাসদবৃন্দ গুজব সমস্যা নিয়ে ডন-টু-ডাস্ক পরামর্শ সভায় বসলেন। যেমন করে হোক একে তাড়াতেই হবে। মহাপ-িত গোছের একজন বললেন, নতুন গুজবটা কী শুনি! অমনি হেসে ফেললেন প্রধান উজির। সে কি ভায়া, আপনি এখনও গুজবই শোনেননি! তাহলে শুনেছেনটা কী! এই শহরে এমন একজন মানুষ দেখা গেছে যার কিনা তিনখানা পা। হা হা হা!
মানুষের তিন-পা! তাই কখনও হয় নাকি! কে বলেছে হয় না! হওয়ালেই হয়। বললেন রাজার বিশ^স্ত পাশর্^চর।
গুজব মিথ্যে নয়। এই কথায় স্বয়ং রাজামশাই বিচলিত বোধ করেন। তিনি দেখতে পাচ্ছেন, গুজব দমন করতে এসে উজিররাই আবার নতুন করে গুজব ছড়াচ্ছে।
কে দেখেছে শুনি? কেন, আমার পেয়ারের শালি। তার মতো সুন্দরী স্মার্ট মেয়ে কখনও মিছে বলবে না। গুজবটা মিছে হলেও সত্যি। মানতে হবে।
মিছে হলেও সত্যি! এ কেমন কথা! তার মানে আপনারাও মনে করেন গুজব মিছে নয়! তাই যদি হবে তাহলে ওটা গুজব কী করে হলো! বিরক্ত রাজা উঠে দাঁড়ান। তিনি বুঝতে পারছেন এই নাদানদের দিয়ে গুজব নিধন বা দমন কিছুই হবে না। এজন্য মহাশক্তিধর একটি কমিশন গঠন করতে হবে।
ওদিকে কমিশনের কথায় ধেই ধেই করে নেচে উঠলেন কয়েকজন। কমিশন জিনিসটা খুব সুস্বাদু, কর্ণসুখকর। টাটকা তাজা টাকার গন্ধ লাগে নাকে। কারো কারো নামের সাথে অবশ্য ‘টেন পারসেন্ট’-এর তকমা লেগে গেছে। কাজকাম যাই করো দশ শতাংশ তার চাই-ই চাই। গুজব নিধনের জন্য কমিশন গঠিত হলে নিশ্চয়ই বেশ বড় রকমের একটা ফান্ড পাওয়া যাবে। ফান্ড ব্যাপারটা আবার বড্ড ফানি। এই আছে এই নেই। কাজ না করেও ফান্ড তুলে খাওয়া যায়। আর একবার খেয়ে ফেললে কার কী করার আছে! শুধু খেয়াল রাখতে হবে বদহজম হলো কি না। তাই ফান্ড সচরাচর কেউ একা খায় না, মওসুমি কাঁঠালের মতো ভাগাভাগি করে খায়। আর যদি নিতান্তই হজম না হয় তো নতুন করে আরেকটা গুজব ছড়িয়ে দিলেই হয় যে, ফান্ড ফিউজ হয়ে গেছে।
কিন্তু গুজবেও যে আজাব আছে, ওটা যে নিছক ইয়ার্কি নয়, এবার অন্তত তার কিছুটা প্রমাণ পাওয়া গেল। কে বা কারা গুজব রটনাকারীদের তুলে নিয়ে গিয়ে এগ থেরাপি দিয়েছে। আজব ব্যাপার, এ-কথাও যে সত্যি বা গুজব নয়, তাও ঠিকঠাক প্রমাণ করা যায় না। হতে পারে সত্যি সত্যি রটনাকারীদের এগ থেরাপি দিয়েছে অথবা মুরগি থেরাপিও হতে পারে। আদতে পরিস্থিতি ক্রমশ এমন দাঁড়ায় যে, কেউ আর কিছুতে ভরসা রাখতে পারছে না। এমনকি, আমি যে আমি তাও ঠিক মালুম হয় না। গু নোজ, থুক্কু হু নোজ, এই অবস্থায় ‘গুজব দমন কমিশন’-গুদক আদৌ কোনো কাজে আসবে কি না!