প্রতিবেদন

যানজট নিরসনে ঢাকা মহানগরীতে সাবওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা মহানগরীতে গণপরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে উন্নত বিশ্বের ন্যায় সাবওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রাথমিক নকশা প্রণয়নে নিয়োগ করা হয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।
গত ২ আগস্ট নগরীর একটি হোটেলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের সাথে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রধান অতিথি হিসেবে এ সময় উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সেতু বিভাগের সিনিয়র সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তি অনুযায়ী স্পেনের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টিপসা ঢাকা মহানগরীতে প্রস্তাবিত সাবওয়ের চারটি রুটের সম্ভাব্যতা যাচাই করবে। প্রথম রুটটি টঙ্গী-উত্তরা-এয়ারপোর্ট-খিলক্ষেত-কাকলী-মহাখালী-মগবাজার-কাকরাইল-পল্টন-শাপলাচত্বর-যাত্রাবাড়ী-শনিরআখড়া হয়ে নারায়ণগঞ্জ লিংকরোড পর্যন্ত। দ্বিতীয় রুটটি আমিনবাজার থেকে শুরু হয়ে গাবতলী-শ্যামলী-আসাদগেট-নিউমার্কেট-টিএসসি-বঙ্গবাজার-ইত্তেফাক মোড় হয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত। তৃতীয় রুটটি গাবতলী থেকে শুরু হয়ে মিরপুর-১-মিরপুর-১০-কাকলি-গুলশান-২- নতুন বাজার-রামপুরা টিভি ভবন-খিলগাঁও-শাপলাচত্বর হয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত। আর চতুর্থ রুটটি রামপুরা টিভি ভবন-নিকেতন-তেজগাঁও-রাসেল স্কয়ার-ধানমন্ডি ২৭-জিগাতলা-আজিমপুর-লালবাগ হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত।
প্রথম পর্যায়ে পিপিপি ভিত্তিতে ৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রথম ও দ্বিতীয় রুট নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ রুট দু’টি নির্মাণে ব্যয় হবে ৫ দশমিক ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সাবওয়ে নির্মিত হলে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০ মিটার নিচ দিয়ে চলবে যাত্রীবাহী ট্রেন। এতে মহানগরীর প্রায় ৪০ লাখ যাত্রী পরিবহন সুবিধা ভোগ করতে পারবে।
চুক্তিপত্রে সেতু বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমদ এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টিপসা’র পক্ষে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অ্যান্টোনিও রদ্রিগেজ স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী সাবওয়ের ৪টি রুটের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ব্যয় হবে প্রায় ২১৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। উল্লেখ্য, ঢাকা মহানগরীতে সাবওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা প্রকল্পটি ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতাধীন একটি অগ্রাধিকার প্রকল্প। সাবওয়ে নির্মাণের পাশাপাশি রাজধানীর যানজট সমস্যা নিরসনে সরকার তিন ধাপে এগুনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ধাপ তিনটি হলো জরুরি পদক্ষেপ, মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপ ও পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ। এতে জরুরি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে প্রথমেই অবৈধ দখলদার থেকে ফুটপাত উদ্ধার করতে সরকারকে কঠিন মনোভাব নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ফুটপাত দখল একটি বড় বাণিজ্যের আখড়া। এখানে কোটি কোটি টাকার নীতিবহির্ভূত বাণিজ্য হয়। এই বাণিজ্যে জড়িত প্রভাবশালী অনেকেই। যদি অবৈধ দখল থেকে রাস্তা এবং ফুটপাত উদ্ধার করা যায় তবে যানজট বহুলাংশে কমে যাবে, সন্ত্রাসী কর্মকা-ও অনেকাংশে দূর হবে, শহর পরিচ্ছন্ন হবে এবং শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে। অবৈধ দখলদাররা ঢাকা তথা বড় বড় শহরগুলোর যানবাহন চলাচলের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি জায়গা দখল করে আছে। এসব রাস্তা উদ্ধার করে যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা গেলে যানজট নিরসনে এক আমূল পরিবর্তন ঘটবে, শহরগুলোর চেহারাই পাল্টে যাবে।
এদিকে সরকার নতুন এবং রি-কন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানির ওপর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। ২০০০ সিসির ওপর গাড়ি আমদানি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কোনো পরিবারে ৫টির বেশি গাড়ি থাকতে পারবে না। একই পরিবারে একটির বেশি গাড়ি আমদানিতে বেশি ট্যাক্স আদায় করার চিন্তাভাবনা চলছে। প্রাইভেট পাবলিক ট্রান্সপোর্ট মালিকদের গাড়ি আমদানি, রুট পারমিট এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমতি দেয়ার সময় মালিকের গাড়ি রাখা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো জায়গা আছে কি নাÑ সেটি কঠিনভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিকল্প রাস্তা বা বাইপাস সড়ক যানজট নিরসনে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। সেজন্য সরকার ঢাকা শহরকে ঘিরে বেশ কয়েকটি বাইপাস সড়ক নির্মাণ করেছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন সময়ে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে যানবাহন চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করে। রাস্তা কাটাকাটির পর মেরামতের ব্যবস্থাও করা হয় না। আবার মেরামত করা হয় ঠিকই কিন্তু কয়েকদিন পর দেখা যায় আরেকটি সংস্থা এসে আবার নতুন করে রাস্তা কাটা শুরু করলো। সরকারি এই সংস্থাগুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে যদি নিজ নিজ কাজগুলো সমাধা করেন তাহলে একবারই রাস্তা কেটে কাজগুলো একসাথে সমাধান করা যায়। ফলে সরকারি টাকারও সাশ্রয় হয় এবং মানুষের ভোগান্তিও কম হয়। সরকার এ বিষয়টিতে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জরিমানার হার আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে সরকারের। জরিমানার হার চার-পাঁচশ টাকা হওয়ায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গের প্রবণতা বেশি। যদি এই বাড়িয়ে দেয়া যায় এবং সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয় তাহলে ট্রাফিক আইন ভাঙার প্রবণতা অনেকাংশে কমে যাবে, ফলে যানজটও কমে আসবে।
ঢাকা শহরে প্যাডেলচালিত রিকশা যানজটের প্রধান কারণ। যেকোনো শহরের সর্বমোট জায়গার ২৫ শতাংশ রাস্তার জন্য থাকতে হবে; এটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। রাজধানী ঢাকার রাস্তার ৩৩ শতাংশই দখল করে আছে প্যাডেলচালিত রিকশা; যার গতি ঘণ্টায় মাত্র ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার। এছাড়া ফুটপাথে অবৈধ ও ভাসমান দোকান, ঠেলাগাড়ি ইত্যাদির বিষয়তো আছেই। প্যাডেল চালিত রিকশাওয়ালাদেরকে নগদ ভর্তুকি বা অনুদান দিয়ে বিদায় করতে হলে জাতীয় বাজেটে থোক বরাদ্দ দিয়ে অর্থায়নের ব্যবস্থা করে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটির মাধ্যমে ভর্তুকির টাকা প্রদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ঢাকা শহরের ভেতর দিয়ে যে ট্রেন লাইন চলাচল করছে সেটি উঠিয়ে দিয়ে বাসাবো-কদমতলা হয়ে পাতাল রাস্তার মাধ্যমে সরাসরি বিমানবন্দর হয়ে টঙ্গী পর্যন্ত যদি নতুন ট্রেন লাইন করা যায় তবে ঢাকা শহরের যানজট বহুলাংশে কমে যাবে। ঢাকা শহর দিয়ে চালিত বর্তমান ট্রেন লাইনকে একটি বিকল্প রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে অথবা এর উপর দিয়েই মেট্রোরেল চালু করা যেতে পারে। সাবওয়েসহ এসব ব্যবস্থা গৃহীত হলে আশা করা যায়, রাজধানী ঢাকার যানজট অনেকাংশে কমে আসবে।