কলাম

সকল ষড়যন্ত্রকারীর গোরস্তান হবে বাংলাদেশ

অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ^াস
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের একটি অংশে ভাষা আন্দোলন ও মুসলিম লীগের রাজনৈতিক হটকারিতা সম্পর্কে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেনÑ ‘একটি বিশেষ গোষ্ঠী, যারা ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করতে শুরু করেছেন, তারাই তাকে (খাজা সাহেব) জনগণ থেকে যাতে দূরে সরে পড়েন তার বন্দোবস্ত করলেন। সাথে সাথে তার সমর্থক নূরুল আমিন সাহেবও যাতে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান সে ব্যবস্থাও করালেন। কারণ ভবিষ্যতে এই বিশেষ গোষ্ঠী কোনো একটা গভীর ষড়যন্ত্রের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। যদিও খাজা সাহেবের জনসমর্থন কোনোদিন বাংলাদেশে ছিল না।’ (পৃঃ ২০৪)
পাকিস্তান নামের তথাকথিত রাষ্ট্রের ভেতর ষড়যন্ত্রের যে রাজনীতি বৃত্তায়িত হচ্ছিল সে সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু সচেতন ছিলেন। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছিলেন কখন কোন ঘটনা ঘটতে পারে; ধরতে পারতেন জনগণের ধমনী তরঙ্গ, উপলব্ধি করতে পারতেন কোন পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে; তার গুরুত্বই বা কী?
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তাঁর জীবনকথা ব্যক্ত হয়েছে। তবে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ভূখ-ে কিংবা বিশ^ পরিম-লে আবর্তিত তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ভাষ্য আমাদের সকলেরই জানা। সেখানেও তিনি বারবার দেখেছেন ষড়যন্ত্র; পরশ্রীকাতরতা দেখে থমকে গেছেন, আতঙ্কিত হয়েছেন।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ১৯৭২ সালের ১৫ জানুয়ারি ঢাকায় দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের চেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণ এ ধরনের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন এবং অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর। ওদের জানা উচিত যে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়া যায় না। প্রথমে আমি সরকারের বাইরে থেকে গ্রামে গ্রামে সফর করে জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে সাহায্য করার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ষড়যন্ত্র মোকাবিলার জন্য আমাকে সরকারে যেতে হয়েছে। সকল ষড়যন্ত্রকারীর গোরস্তান হবে বাংলাদেশ।’
জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে সাহায্য করা এবং ষড়যন্ত্র মোকাবিলার জন্য বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে যে দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন তার ভালো-মন্দ তিনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১১ জানুয়ারি কুমিল্লার সামরিক একাডেমিতে প্রথম শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠানে বিদায়ী ক্যাডেটদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। সেই ভাষণের একটি অংশ ছিল এরকমÑ ‘আর এক দল মানুষ আছে, যারা বিদেশিদের অর্থে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নস্যাৎ করতে চায়। তারা রাতের অন্ধকারে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে। একটি লোক কেমন করে যে পয়সার লোভে মাতৃভূমিকে বিক্রি করতে পারে, তা ভাবলে আমি শিউরে উঠি। যারা বিদেশের আদর্শ বাংলাদেশে চালু করতে চায়, এদেশের মাটিতে তাদের স্থান হবে না। মনে রেখো, বাংলাদেশের মাটি থেকে তাদের শেষ করতে হবে তোমাদের।’
মাতৃভূমিকে বিক্রি করতে চাওয়া ষড়যন্ত্রকারীদের ঠিকই চিনতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বিদায়ী ক্যাডেটদের ওই অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান জিয়াউর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। লেখাবাহুল্য, বঙ্গবন্ধুর নিজের জবানি এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারক কাজী গোলাম রসুল বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের সময় তৎকালীন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন, সব মিলে আমরা বলতে পারি, ‘১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের ঘটনা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সেনাবাহিনীর জন্য একটি চিরস্থায়ী কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত।’ এজন্য শেখ হাসিনা ‘বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সেনাবাহিনী’ প্রবন্ধে যা লিখেছেন তাও প্রণিধানযোগ্যÑ ‘জনগণের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছে সেনাবাহিনী। সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রে কিছু বিপথগামী উচ্চাভিলাষী অফিসারের হাতে প্রাণ দিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এবং এ কুচক্রীরা জাতির জনককে হত্যার মাধ্যমে তাঁর অনুসৃত কর্মসূচিকে বানচাল করে বাংলাদেশে প্রগতির ধারা পাল্টে দেয়ার উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেছে।’ এজন্যই সেদিন সেনাকর্তারা বলেছিলেন, ‘যা হবার হয়ে গেছে।’ কিংবা ‘দেশকে রাজতন্ত্রের হাত থেকে রক্ষার জন্যই তাদের ১৫ আগস্টের ঘটনা ঘটাতে হয়েছে।’ অথবা ‘যেহেতু বঙ্গবন্ধু ইতোমধ্যেই নিহত হয়েছেন, তাই কোনো পদক্ষেপ নিলে গৃহযুদ্ধ হতে পারে এবং অযথা রক্তক্ষয় হতে পারে। তাই কোনো পদক্ষেপ নেয়া সমীচীন নয়।’ সেনাদের এ ধরনের মন্তব্য সে সময়ের গভীর ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা প্রদান করে।
২.
মানবসভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা সৃষ্টি হওয়ার পর ক্ষমতা দখল কিংবা উচ্চাভিলাষী খলনায়কদের কারণে বারবার জনগণকে অস্থির সময়ের ভেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে। অস্থিতিশীল সেই কালপর্বে ব্যক্তির আকাক্সক্ষা হয়েছে ভূ-লুণ্ঠিত; জীবনের মঙ্গলপ্রদীপ নিভে গেছে, সকল শুভসূচনা হয়েছে নির্বাসিত। স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় নিমগ্ন রাজ্যচ্যুত শাসককে হত্যা করা হয়েছে; যুদ্ধ চলেছে শত শত বছর ধরে। যুদ্ধের ময়দানে ষড়যন্ত্র চলেছে, প্রতারণা করা হয়েছে নিরপরাধ জনগণের সঙ্গে। বীর ও আত্মত্যাগী শাসককে বিতাড়িত করা হয়েছে নিজ মাতৃভূমি থেকে। কখনো বা ঘরের শত্রু বিভীষণের সঙ্গে বহির্দেশীয় শত্রু একত্রিত হয়েছে। প্রাচীন সভ্যতায় যূথবদ্ধ জীবনে মানুষের প্রতিপক্ষ ছিল প্রকৃতি; পরবর্তীতে সম্পত্তির ওপর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে পৃথক পৃথক গোত্রের ধারণার সঙ্গে গোত্রপ্রধান সৃষ্টি হলো এবং পরিবার ও গোত্রে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত সেই আদিকাল থেকে।
রামায়ণ-মহাভারত কিংবা ইলিয়াড-অডিসি’র মতো মহাকাব্যে পারিবারিক কাহিনি কিংবা নর-নারী সম্পর্কের বর্ণনার সঙ্গে মানবভাগ্য ও মানবজীবন নিয়ে যে গভীর, সমৃদ্ধ ও তলস্পর্শী কথামালা অভিব্যক্ত, সেখানেও রয়েছে ষড়যন্ত্র ও সংঘাতের ব্যাপ্তি। মহাভারতে দুর্যোধন ষড়যন্ত্র করেছে সৎ ভ্রাতা পঞ্চপা-বদের বিরুদ্ধে। পুরাণে কংস খুব অত্যাচারী রাজা ছিলেন। তিনি স্বীয় পিতা উগ্রসেনকে বন্দি করে নিজে সিংহাসন দখল করেছিলেন এবং অবতার কৃষ্ণকে হত্যা করার জন্য এমন কোনো ষড়যন্ত্র নেই যা করেননি। মুঘল সাম্রাজ্যে ছিল ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। আওরঙ্গজেবের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও অত্যাচারের ইতিহাস ছিল ভয়ঙ্কর। সম্রাট শাহজাহানই তার অমর কীর্তি তাজমহলের জন্য নিজ পুত্র আওরঙ্গজেবের দ্বারা নিগৃহীত হয়েছিলেন। বিষাদসিন্ধুতে আমরা দেখেছি, এজিদের বাবা ষড়যন্ত্র পাকিয়েছে হযরত আলীকে সরানোর লক্ষ্যে। আর এজিদের ষড়যন্ত্রের লক্ষ্য ছিল ইমাম হাসান আর হোসেন। অর্থাৎ পিতা-পুত্রের লক্ষ্য ছিল দু’জনকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়ে খিলাফত কেড়ে নিয়ে ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে অবস্থান নেয়া। শেক্সপিয়রের নাটকে ষড়যন্ত্র কখনো পারিবারিক, কখনো বা ক্ষমতা দখলের চক্রান্তে পরিচালিত। খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ অব্দে রোমান রিপাবলিককে পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে পরিচালিত ষড়যন্ত্রে নিহত হন জুলিয়াস সিজার, ৬৫ খ্রিস্টাব্দে রাজন্যবর্গ কর্তৃক রোমান সম্রাট নিরোর বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় বিশাল ষড়যন্ত্র যা পিসোনিয়ান ষড়যন্ত্র নামে পরিচিত। এসব ষড়যন্ত্রে আমরা দেখতে পাই অপরের অনিষ্ট করার মনোবৃত্তি এখানে মুখ্য, যা আবার মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতার অংশ; যা মানবজীবনের সুস্থ স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত পরিসরে কালনাগিনীর অনুপ্রবেশ ও বিষাক্ত ছোবল হিসেবে গণ্য। সব ষড়যন্ত্রের পেছনে থাকে উচ্চাভিলাষ, প্রতিশোধস্পৃহা, শত্রুতা, পরশ্রীকাতরতা ও অর্থলোভ। সুবিধাবাদী মনোবৃত্তির কারণেও মানুষ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে পারে। ষড়যন্ত্রকারীর মুখোশ যখন উন্মোচিত হয় তখন সকলের ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয় সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ।
ষড়যন্ত্রের ইতিবাচক দিকের কথা ১৯৬৯ সালের ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলার ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। অন্যদিকে খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ থেকে ২৯৮ অব্দে প্রতিষ্ঠিত চন্দ্রগুপ্তের দ্বারা মৌর্যবংশের স্বর্ণযুগের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পেছনেও ছিল ষড়যন্ত্রের ইতিবাচক ফলাফল। সেইসময় ভারতবর্ষে ন্যায়পরায়ণ শাসকের আবির্ভাব ঘটেছিল কৌটিল্যের (খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০- ২৮৩) পরামর্শে। তবে শত্রুর ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতারণা ও চাতুরির আশ্রয় নেয়ার মতো অনৈতিক কাজে লিপ্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন কৌটিল্য। ইউরোপের আধুনিক যুগে ম্যাকিয়াভেলিও (১৪৬৯-১৫২৭) রাষ্ট্রের শত্রু এবং বিশ্বাসঘাতকদের সঙ্গে সন্ধির মাধ্যমে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার পক্ষে ছিলেন। এটা আসলে শাসকদের এক ধরনের কূটকৌশল। চন্দ্রগুপ্ত নন্দরাজের পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা হয়েও সিংহাসন দখলের ষড়যন্ত্র করে ব্যর্থ হন আর নির্বাসিত জীবনে চানক্য বা কৌটিল্যের কুটিলবুদ্ধির বদৌলতে ক্ষমতা লাভ করেন। ম্যাকিয়াভেলি শক্তিশালী রাজতন্ত্রের কথা বলতে গিয়ে রাজার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য চতুরতা, নিষ্ঠুরতা, অর্থনৈতিক কূটপন্থা অবলম্বনকে সমর্থন করেছিলেন। কারণ জাতীয় রাজনীতি তথা সমাজজীবনের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে শাসককে।
৩.
পৃথিবীতে সাম্রাজ্য কুক্ষিগত করার জন্য যুগে যুগে চলেছে ষড়যন্ত্র। রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের নানান ধরনের ঘটনা ইতিহাসের তথ্যপঞ্জি থেকে আমরা এখানে কিছু উল্লেখ করতে পারি। এসব ক্ষেত্রে দেখা যায় শাসকের পরিবারকে সমূলে নির্মূল করে পরিচালিত হয়েছে ষড়যন্ত্র। কখনো কখনো ব্যর্থ অভ্যুত্থানে সেই ষড়যন্ত্র শেষ হয়েছে। যেমন ১৫৮৩ সালে ব্রিটেনের রাণী এলিজাবেথকে উৎখাতের লক্ষ্যে পরিচালিত হয় থ্রকমরটন নামের ব্যর্থ ষড়যন্ত্র। ১৬০৩ সালে রাজা প্রথম জেমসকে সরিয়ে তার আত্মীয় আরবেলা স্টুয়ার্টকে সিংহাসনে বসানোর জন্য জর্জ হেনরি ব্রুক স্প্যানিশ সরকারের আর্থিক সহায়তা নিয়ে এক ষড়যন্ত্র করে, যার পরিণতিতে ব্রুক নিহত হন। আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন (১৮০৯-১৮৬৫), পররাষ্ট্রমন্ত্রী (সেক্রেটারি অব স্টেট) ও ভাইস-প্রেসিডেন্টকে হত্যার লক্ষ্যে মঞ্চঅভিনেতা জন বুথের নেতৃত্বে পরিচালিত ষড়যন্ত্রে আব্রাহাম লিঙ্কন নিহত হন। পরে সকল ষড়যন্ত্রকারীর ফাঁসিতে মৃত্যুদ- হয়। এরপরও বিভিন্ন দেশে অনেক ষড়যন্ত্র আর অভ্যুত্থান ঘটেছে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার আগে বিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য ষড়যন্ত্র ছিল ইরানে। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে অনুষ্ঠিত গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী হন মোসাদ্দেক। তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রথম শাসক। মোসাদ্দেক প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে রেজা শাহের ক্ষমতা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। নির্বাচনি ওয়াদা হিসেবে মোসাদ্দেক ইরানের তেলসম্পদকে জনগণের সর্বোচ্চ কল্যাণে কাজে লাগানোর জন্য মনোনিবেশ করেন। ইরানে তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রিটিশদের হাতে। গণদাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি অ্যাংলো-ইরানিয়ান তেল কোম্পানিকে জাতীয়করণ করে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চক্ষুশূল হয়ে পড়েন। নির্বাচিত হওয়ার মাত্র ২ বছরের মাথায় ইঙ্গ-মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর (বিশেষত সিআইএ) সমন্বিত উদ্যোগে ইরানে একটি সামরিক ও রাজনৈতিক অভ্যুত্থানে ১৯৫৩ সালের আগস্টে মোসাদ্দেক ক্ষমতাচ্যুত হন। মোসাদ্দেক উৎখাতের গোয়েন্দা তৎপরতায় ইরানের শাহ রাজবংশ, সেনাবাহিনী ও নাগরিকসমাজকে সম্পৃক্ত করার নেপথ্য ভূমিকা পালন করে সিআইএ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দারা। ১৯৫৪ সালে সিআইএ-এর ষড়যন্ত্রে গুয়াতেমালার রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমান ক্ষমতাচ্যুত হন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে সফল হওয়ায় ভারতবর্ষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকের করতলে চলে যায়। আর ব্রিটিশ রাজন্যবর্গের ষড়যন্ত্রের ফলে ভারত ভাগ হয়। তবে ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসকদের সকল ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বঙ্গবন্ধু আমাদের জয়মাল্যভূষণে অভিষিক্ত করেন।
৪.
ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই, রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক জীবন কিংবা তাঁর সন্তানদের নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা নানা খেলায় মেতে উঠেছিল। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চক্র বঙ্গবন্ধুর প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসাকে বিষিয়ে তুলতে চারিদিক থেকে সর্বাত্মক চক্রান্তের জাল বুনেছিল। যখন তিনি শেখ মুজিবুর রহমান তখন তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছড়িয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে কণ্টকিত করার প্রচেষ্টা ছিল। যখন তিনি বঙ্গবন্ধু তখন মামলা, হামলা আর হত্যার ষড়যন্ত্র করে বাঙালির জনপ্রিয় নেতাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে মোশতাক গং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ১৯৭১-এর জুলাই মাসে প্রকাশ্যেই মুজিব নগর সরকারের পদত্যাগ দাবি করা হয়। এইচ টি ইমামের ‘বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১’ থেকে জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালের এপ্রিলের পর থেকেই নানারকম ষড়যন্ত্র দানা বাঁধতে শুরু করে। তাজউদ্দিনের নেতৃত্ব মেনে না নিয়ে খন্দকার মোশতাক আরও কিছু নেতাকে সঙ্গে নিয়ে নতুন সরকারের বিরোধিতার চেষ্টা করে। তার উদ্যোগ ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে থাকার জন্য আমেরিকার মাধ্যমে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আপস রফায় যাবার চেষ্টা। কলকাতার একটি দূতাবাসের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে শেষাবধি যোগাযোগ ছিল মোশতাক গং-এর। তার সেই ষড়যন্ত্রের পরিণতি দেখতে পাওয়া যায় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের হত্যাকা-ে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে কর্মচঞ্চল জাতির পিতাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের জন্য এক গভীর পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের জাল বিছানো হয়। একদিকে দেশের জন্য মাইলফলক স্থাপনকারী কর্মকা-ের বিশাল জগৎ অন্যদিকে স্বাধীনতাবিরোধীদের তৎপরতা আর দেশি-বিদেশিদের চক্রান্ত শোকের সাগরে ভাসিয়ে দেয় আমাদের। স্বাধীনতা-উত্তর যখন বঙ্গবন্ধু দেশ পুনর্গঠনের কাজে মনোনিবেশ করেছেন তখন তাঁর প্রশাসন সম্পর্কে একের পর এক অপপ্রচার চালানো হয়। ১৯৭২ সালে জামায়াতে ইসলামীকে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করার অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য এবং পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। যুক্তরাজ্যে শরণার্থী থাকাকালীন গোলাম আজম পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটিও গঠন করে। অর্থাৎ বিদেশের মাটিতে থেকেও বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধীদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল।
অতীতে ষড়যন্ত্রের একটি মুখ্য অস্ত্র ছিল ‘অপপ্রচার’ বা ‘গুজব’। আর সেই কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করে স্বাধীনতাবিরোধীরা। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত অপপ্রচার করে বলা হয়েছেÑ বঙ্গবন্ধু হিন্দু ধর্মাবলম্বী, তিনি হিন্দু পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা-মা হিন্দু ছিলেন ইত্যাদি। অথচ জাতির পিতার পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল ইসলামের আদর্শে লালিত জীবন। মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার তাগিদ পবিত্র কোরআন শরিফে বারংবার দেয়া হয়েছে; যা তিনি অনুসরণ করেছেন জীবনভর।
বঙ্গবন্ধু ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রসারে যে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন তা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে আরো বিস্তৃত হয়েছে। চীনপন্থি সশস্ত্র রাষ্ট্রদ্রোহী কমরেড সিরাজ সিকদারের মৃত্যুকে ঘিরে বঙ্গবন্ধু প্রশাসনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হয়েছিল। অথচ সিরাজ সিকদারের ‘সর্বহারা পার্টি’ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করে দেখেছিল। তারা মনে করত, পাকিস্তানের উপনিবেশ থেকে দেশ এবার ভারতীয় উপনিবেশের মধ্যে গিয়ে পড়েছে। ফলে ‘সশস্ত্র সংগ্রাম’ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সর্বহারা পার্টি। ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিনে সর্বহারা পার্টি সারাদেশে হরতালের ডাক দেয়। বিভিন্ন এলাকায় থানা লুটের ঘটনা ঘটতে থাকে, একইসঙ্গে শ্রেণিশত্রু খতমের নামে স্থানীয় ভূস্বামী, জোতদার থেকে শুরু করে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছলদের হত্যা করা হতে থাকে গোটা বাংলাদেশে। পার্টির ভেতরও হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। যুদ্ধের পরপর বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে এই চীনপন্থিদের অনেকেই অস্ত্র জমা দেয়নি।
যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর প্রধান রাজনৈতিক শত্রুতে পরিণত হয় মাওপন্থিরা। ১৯৭৪ সালে সিরাজ সিকদার আত্মগোপনে চলে যান। তবে পুলিশের হাতে ১৯৭৫ সালে আটক হন এবং ২ জানুয়ারি পুলিশের কাছ থেকে পালাতে গিয়ে নিহত হন। সেসময় তাঁর হত্যাকা-কে নিয়ে গুজব রটানো হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে কুচক্রিমহল সারাদেশে একটি গুজব রটিয়ে দিয়েছিল। জাতির পিতার বড় ছেলে দেশপ্রেমিক, নির্দোষ, মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার চালিয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাংক ডাকাতির অপবাদ দেয়া হয়। জনগণকে বোঝানো হয় বঙ্গবন্ধু প্রশাসন পরিচালনায় ব্যর্থ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। তাঁর নামে কুৎসা রটনা করা হয়। হত্যার বিচার বন্ধ করার জন্য ‘কালো অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়। ২১ বছর যাবৎ জিয়াউর রহমান, জামায়াত-শিবির, খালেদা জিয়া সবাই এই অপপ্রচারে নিজেদের সামিল করেছেন। বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা সংক্ষেপে ‘বাকশাল’ই তৎকালীন একমাত্র আইনগতভাবে বৈধ রাজনৈতিক দল; যার জন্ম হয়েছিল ৭ জুন ১৯৭৫ সালে, সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে। এর ফলে অপপ্রচার করা হয় গণতন্ত্র ধ্বংস হলো, একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেল। অথচ বাকশাল ছিল ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার জন্য এবং সকল অপরাজনীতি, অপশক্তি এবং সকল শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্লাটফর্ম। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের অন্যতম জিয়াউর রহমান নিজেও বাকশালের সদস্য ছিলেন এবং যারা বাকশালে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের চিঠি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। জাতীয় রক্ষীবাহিনীর কার্যক্রমের বিরুদ্ধে জনমনে তৎকালীন স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালিয়েছিল। ওই সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে দুটো গুজব ছড়িয়ে পড়ে। একটি হলো রক্ষীবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে এবং এদের অধিকাংশ ভারতীয়। অন্যটি হলো রক্ষীবাহিনীর বাজেট সশস্ত্র বাহিনীর বাজেটের চেয়ে বেশি। এই দুটি তথ্যই সশস্ত্র বাহিনীর ভিতরে অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং সরকারের ওপর মেজর ফারুক-রশিদ গং অন্যদের তীব্রভাবে ক্ষুব্ধ করে তোলে। অথচ প্রকৃত সত্য হলো রক্ষীবাহিনীর মোট সদস্য মাত্র ১২ হাজার এবং এতে ভারতীয় কোনো সদস্য ছিল না। আর ১৯৭৩ সালে রক্ষীবাহিনীর জন্য বাজেট ছিল মাত্র ৯ কোটি টাকা, যেখানে সেনাবাহিনীর বাজেট ছিল ৯২ কোটি, যা পরবর্তীতে বাড়িয়ে ১২২ কোটি করা হয়। প্রচার করা হয়েছিল সিরাজ সিকদারকে রক্ষীবাহিনী হত্যা করেছে, যে প্রচারণাগুলো ছিল ষড়যন্ত্রেরই অংশ। সেসময় অবাধ তথ্যের অভাবে সাধারণ মানুষ সেসব বিশ্বাস করতে শুরু করে। ফলে লাভবান হয় ষড়যন্ত্রকারীরা। আসলে শঠতা আর মিথ্যাচারে পরিপূর্ণ এদেশ। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময় কুড়িগ্রামের বাকপ্রতিবন্ধী বাসন্তীর জাল পরিহিত সাজানো ছবি থেকে শুরু করে কয়েক বছর আগে চাঁদে সাঈদীকে দেখতে পাওয়ার গুজবও জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে।
৫.
অবশ্য বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্রকারীরা আজ ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে হারিয়ে গেছে। তারা এবং তাদের বংশধররা এখন ঘৃণার পাত্র। তবে এখনো ষড়যন্ত্র চলছে। শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে ১৯ বার। অথচ তিনি আছেন বলেই আজ বাংলাদেশের এত উন্নয়ন, বিশ্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। তিনি কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। মিয়ানমারের নির্যাতিত ১০ লক্ষ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে শেখ হাসিনা বিশ^মানবের রাষ্ট্রনায়ক। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জঙ্গি দমন ও মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ গ্রহণ শেখ হাসিনার মতো দৃঢ়চেতা নেতার পক্ষেই সম্ভব।
অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করে আজ বিএনপি ’৭১ এর পরাজিত শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধেছে। এজন্য আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র ও নাশকতার আশঙ্কা রয়েছে। এসবই জনগণকে নিয়ে প্রতিহত করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর মতো আমরাও বলতে চাই, ‘সকল ষড়যন্ত্রকারীর গোরস্তান হবে বাংলাদেশ।’
লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
এবং পরিচালক, জনসংযোগ
তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়