অর্থনীতি

৬২ কোম্পানির ফাঁকি দেয়া ১৫ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট আদায়ে তৎপর এনবিআর

নিজস্ব প্রতিবেদক
বলা হয়ে থাকে, উন্নয়নের অক্সিজেন হচ্ছে ভ্যাট ও ট্যাক্স। এজন্য সরকার জনগণের কল্যাণ ও দেশের উন্নয়নে ভ্যাট-ট্যাক্স আদায় করতে চায় আর দেশি-বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমূহ নানা অজুহাতে ভ্যাট-ট্যাক্স কম দিতে চায় বা ফাঁকি দিতে চায় অথবা কম-বেশি এ ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এক্ষেত্রে দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর ভ্যাট-ট্যাক্স আদায়ে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক তৎপর। ইদানীং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় কোম্পানিগুলোর রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এ অবস্থায় রাজস্ব ফাঁকি রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। সম্প্রতি সংস্থাটির অনুসন্ধানে কয়েকটি কোম্পানির মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটিত হয়েছে। তাতে দেখা গেছে মোবাইল কোম্পানি, সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি শিল্পখাত, ব্যাংক-বীমা, সিমেন্ট প্রভৃতি খাত রয়েছে। এসব খাতের ৬২ কোম্পানির উদ্ঘাটিত ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ ১৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা এখনো অনাদায়ী।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর সূত্র জানায়, ফাঁকি উদ্ঘাটনে নিরীক্ষা কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বড় আকারের ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যাট অফিসে দাখিল করা কাগজপত্র, প্রতিষ্ঠানে রক্ষিত নথি, শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ঘোষিত আর্থিক বিবরণী কিংবা ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে প্রদেয় বিবরণী বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
সূত্রমতে, ভ্যাট ফাঁকির প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে, বাড়তি রাজস্ব আয়ের চাপ রয়েছে রাজস্ব প্রশাসনের ওপর। তবে ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটনের ঘটনার পর কেউ কেউ উচ্চ আদালতে কিংবা ট্রাইব্যুনালে আপিল করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আংশিক রাজস্ব ফেরত দিতে শুরু করেছে। উচ্চ আদালতে চলমান মামলাগুলোর মধ্যে ৪টি মোবাইল কোম্পানির সিম রিপ্লেসমেন্ট ও স্থান, স্থাপনা ভাড়া সংক্রান্ত এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের স্থান, স্থাপনা ও ভাড়া সংক্রান্ত মোট ১১টি মামলায় অনাদায়ি রাজস্ব প্রায় ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। গ্রামীণ ফোনের ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটন ১ হাজার ৩৪ কোটি টাকার, রবি ১ হাজার ৫৮৬ কোটি, বাংলা লিংক ৬১৪ কোটি, এয়ারটেলের ৩৯৩ কোটি টাকার। মোবাইল কোম্পানিগুলো আংশিক পরিশোধ করলেও তাদের কাছে বড় অংকের রাজস্ব পাওনা রয়েছে, যা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
ভ্যাট খাতে বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) পরিদর্শনে দেখা যায়, নানা উপায়ে কোম্পানিগুলো ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে। উপকরণ ও উৎপাদিত পণ্য ভ্যাট রেজিস্টারে আইন ও বিধি অনুযায়ী যথাযথ সংরক্ষণ না করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ভ্যাট ফাঁকি দেয়া কোম্পানি হচ্ছে এএসটি বেভারেজ লিমিটেড। কোম্পানিটির ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ ১৪৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অন্যত্র কোম্পানিটির আরো ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ফাঁকি রয়েছে। ফুড অ্যান্ড বেভারেজ খাতে ফাঁকির তালিকায় আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজও রয়েছে।
সিমেন্ট শিল্প খাতের সিমেক্স সিমেন্টের ১২৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকির তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। প্রিমিয়ার সিমেন্ট ৯৫ কোটি ৮১ লাখ, মদিনা সিমেন্ট ২ কোটি টাকা, এমআই সিমেন্ট ৪ কোটি টাকা, মীর সিমেন্ট ৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা ফাঁকি দিয়েছে। মদিনা ও এমআই সিমেন্টের কাছ থেকে ফাঁকি দেয়া অর্থ আদায় করেছে এনবিআর। সেভেন সার্কেল বাংলাদেশের ৭ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটিত হয়েছে।
বেসরকারি খাতের প্রাইম ব্যাংক ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে ৩০ কোটি ৬১ লাখ টাকা। ঢাকা ব্যাংক সাড়ে ৯ কোটি টাকা, সাউথইস্ট ব্যাংক ৫ কোটি টাকা ফাঁকি দিয়েছে। এই তালিকায় আরো রয়েছে ব্যাংক এশিয়া, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, এইচএসবিসি, ন্যাশনাল ব্যাংক। বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে রূপালী ইন্সুরেন্স, ফিনিক্স, সাধারণ বীমা, গ্রিন ডেল্টা, ইস্টল্যান্ড, রিলায়েন্স, প্রগতি, পাইওনিয়ার প্রভৃতি।
ঢাকা টোব্যাকোর ভ্যাট ফাঁকি প্রায় ১৮ কোটি টাকা। বাটা সু কোম্পানির ফাঁকি উদ্ঘাটিত হয়েছে প্রায় ৯ কোটি টাকার। এই তালিকায় আরো রয়েছে এমএল এরিকসন, ইউনিক হোটেল, ওয়েস্টিন হোটেল, সিনহা প্রিন্টার্স, গ্লোবাল হেভি কেমিকেলস, ন্যাশনাল পলিমার, চায়না-বাংলা সিরামিকস, লিবরা ইনফিউশন, এপোলো ইস্পাত প্রভৃতি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তিতাস গ্যাস, কর্ণফুলী গ্যাস, বাখরাবাদ গ্যাস, ডেসকো, পিডিবি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ঢাকা ওয়াসা, বিআরটিসি, ডিপিডিসি প্রভৃতি সংস্থার কাছে পাওনা রয়েছে বিপুল অংকের ভ্যাটের অর্থ।
এই বিপুল পরিমাণ ভ্যাট আদায়ে এনবিআরের তৎপরতা প্রসঙ্গে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভূইয়া বলেন, ৬২ কোম্পানির ১৫ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায়ে এনবিআর তৎপরতা বাড়িয়েছে। এ বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা আমলে নেয়া হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের নির্দেশনায় এনবিআর তার পথচলা অব্যাহত রেখেছে। ফাঁকি দেয়া ১৫ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায়ে এনবিআরের কর্মীরা সফল হবেন বলে আশা করি।
তিনি আরো বলেন, সরকারের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাউকে অহেতুক হয়রানি না করে দেশ ও জনগণের উন্নয়নের এনবিআর কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।