আন্তর্জাতিক

ইমপিচমেন্টের শঙ্কায় শঙ্কিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

স্বদেশ খবর ডেস্ক
সংবাদমাধ্যমে বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ যত খবর প্রচারিত হচ্ছে তার একটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে। তার টিমেরই সাবেক দু’জন সদস্য আইন ভঙ্গ করার কারণে বড় রকমের সমস্যায় পড়েছেন। তাদের মধ্যে একজন ট্রাম্পের সাবেক আইনজীবী মাইকেল কোহেন।
কোহেন এখন তারই সাবেক বসের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ করেছেন যে, নির্বাচনে অর্থ খরচ করার বিষয়ে যেসব আইন আছে ট্রাম্প তা ভঙ্গ করেছেন। এদিকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ট্রাম্প বলেছেন, কোহেন এখন তার বিরুদ্ধে গল্প বানাচ্ছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তাকে ইমপিচ বা অভিশংসন করার যেকোনো চেষ্টা হলে মার্কিন অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে।
মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আমাকে যদি ইমপিচ করা হয় তাহলে শেয়ার বাজারে বিপর্যয় নেমে আসবে এবং সবাই খুব গরিব হয়ে যাবে।
ট্রাম্পের সাবেক আইনজীবী মাইকেল কোয়েন নির্বাচনি বিধি ভঙ্গ করার অভিযোগে নিজের দোষ স্বীকার করার পর ট্রাম্প এই মন্তব্য করেছেন। কোয়েন বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশেই তিনি কাজ করেছিলেন। মাইকেল কোয়েন আরো বলেছেন, ২০১৬ সালের নির্বাচনি প্রচারণার সময় দুজন নারীর মুখ বন্ধ রাখার জন্য তিনি তাদের অর্থ দিয়েছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই দুই নারীর একজন পর্ন তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলস এবং অন্যজন প্লেবয় মডেল ক্যারেন ম্যাকডুগাল। এই দুই নারীই দাবি করেছেন ট্রাম্পের সঙ্গে তাদের প্রথমে প্রেমের ও পরে শারীরিক সম্পর্ক ছিল।
আদালতে শপথ নিয়ে কোয়েন বলেছেন, তিনি তাদের মুখ বন্ধ রাখতে অর্থ দিয়েছিলেন ট্রাম্পের নির্দেশে এবং এর মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনকে প্রভাবিত করা। তবে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, ওই দুই নারীকে অর্থ দিয়ে নির্বাচনি প্রচারণা বিধি লঙ্ঘন করা হয়নি। তিনি বলেছেন, ওই অর্থ তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে দিয়েছিলেন, প্রচারণার জন্য বরাদ্দ অর্থ থেকে নয়।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আইনপ্রণেতা বলছেন, নভেম্বরে মধ্য-মেয়াদের নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের প্রতিপক্ষরা তাকে ইমপিচ করার চেষ্টা করবেন বলে মনে হয় না। সে যা-ই হোক, সর্বশেষ এই কেলেঙ্কারির ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে। বলা হচ্ছে শেষ পর্যন্ত কি তাকে সংসদীয় বিচারের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া বা ইমপিচ করা হতে পারে? কিন্তু এই ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনের অর্থ কী এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেলায় এর সম্ভাবনা কতটুকু?
সংশ্লিষ্টরা অবশ্য বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনের ঘটনা বিরল। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস, যেখানে আইন তৈরি করা হয়, তারা দেশটির প্রেসিডেন্টসহ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে বলা আছেÑ বেশকিছু অপরাধের জন্য প্রেসিডেন্টকেও তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়া অর্থাৎ তাকে ইমপিচ করা যেতে পারে। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে : রাষ্ট্রদ্রোহিতা, ঘুষ নেয়া অথবা অন্য কোনো বড় ধরনের কিংবা লঘু অপরাধ। আর ইমপিচমেন্টের প্রক্রিয়া শুরু হতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভস থেকে। এটি মার্কিন কংগ্রেসের একটি অংশ। এই প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য এটি সেখানে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হতে হবে। আর সেটা পাস হলে পরের ধাপে বিচার অনুষ্ঠিত হবে সিনেটে, যেটা কংগ্রেসের দ্বিতীয় অংশ।
এটা অনেকটা আদালত কক্ষের মতো, যেখানে সিনেটররা বিচারক বা জুরি হিসেবে কাজ করবেন। তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন প্রেসিডেন্ট দোষী কি নির্দোষ।
তবে প্রেসিডেন্টকে তার পদ থেকে সরিয়ে দিতে হলে এই সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সিনেটরকে ইমপিচমেন্টের পক্ষে ভোট দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মাত্র দু’জন প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তারা হলেন বিল ক্লিনটন এবং অ্যান্ড্রু জনসন। কিন্তু তাদের কাউকেই দোষী সাব্যস্ত করে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়নি।
সর্বশেষ যে প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তিনি বিল ক্লিনটন। সেটা ১৯৯৮ সালের ঘটনা। ক্লিনটনের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্টের প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য ভোট পড়েছিল প্রতিনিধি পরিষদে। এর আগে এরকম ঘটনা ঘটেছিল ১৮৬৮ সালে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনের বিরুদ্ধেও ইমপিচমেন্টের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু ক্লিনটন কিংবা জনসন তাদের কাউকেই সিনেটে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। সুতরাং ইমপিচমেন্টের অর্থ এটা নয় যে এর প্রক্রিয়া শুরু হলেই প্রেসিডেন্টকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়নি। তবে একজন প্রেসিডেন্টকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার উপক্রম হয়েছিল। তিনি রিচার্ড নিক্সন। ১৯৭৪ সালে তার বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন। ধারণা করা হয়, প্রক্রিয়াটি শুরু হলে তাকে হয়ত প্রেসিডেন্টের পদ থেকে শেষ পর্যন্ত সরিয়ে দেয়া হতো।
এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, তার বিরুদ্ধে গল্প রটানো হচ্ছে। বর্তমানে এরকম কোনো সম্ভাবনা নেই। হাউজ অফ রিপ্রেজেনটেটিভ ও সিনেটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান পার্টির সদস্য সংখ্যা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্য সংখ্যার চেয়েও বেশি। ফলে প্রচুর রিপাবলিকানকে, আরো সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে হাউজ অফ রিপ্রেজেনটেটিভে ২৫ রিপাবলিকান সদস্যকে এবং সিনেটে ১৭ জনকে তাদের নেতার বিরুদ্ধে ভোট দিতে হবে এই প্রক্রিয়া শুরু করা এবং তাকে ইমপিচ করার জন্য।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচন আসছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন। এবছরের শেষের দিকে। ওই নির্বাচনের ফলাফল হয়ত বর্তমানের এই হিসাব-নিকাশকে বদলে দিতে পারে।
আগামী নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য ওই নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ কংগ্রেসের সদস্যদের নির্বাচন করবেন। হাউজ অফ রিপ্রেজেনটেটিভের সবকটি অর্থাৎ ৪৩৫টি আসনে এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে হবে এই নির্বাচন।
নির্বাচনের ফলাফল কী হয় সেটা দেখতে হবেÑ হাউজ অফ রিপ্রেজেনটেটিভে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ফেলতে পারে রিপাবলিকানরা। সিনেটেও এরকম ঘটতে পারে। আর ট্রাম্পকে যদি শেষ পর্যন্ত ইমপিচ করা হয় তাহলে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।