প্রতিবেদন

এলএনজি যুগে বাংলাদেশ : গ্যাস সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক
এলএনজি (লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস) সরবরাহ শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে গ্যাস সংকট সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে আরো এক ধাপ এগুলো সরকার। এলএনজি সরবরাহ শুরু হওয়ায় চট্টগ্রামের গ্যাসের চাহিদা পূরণ হতে চলেছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে বর্তমানে প্রতিদিন ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে। জাতীয় গ্রিড থেকে দেয়া হচ্ছে ১২৬ মিলিয়ন ঘনফুট। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি কর্ণফুলী গ্যাসকে সরবরাহ করা হবে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কো¤পানি সূত্রে জানা যায়, এলএনজি সরবরাহ শুরু হওয়ার পর কাফকোকে ৫০ মিলিয়ন এবং শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৩২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজির সরবরাহ পাওয়া যাবে। জাতীয় গ্রিড থেকে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ পাওয়া গেলে চট্টগ্রামে গ্যাসের সমস্যা অনেকটা লাঘব হবে। উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
জানা যায়, চট্টগ্রামের রিং মেইন পাইপলাইনের মাধ্যমে আপাতত এলএনজি সরবরাহ শুরু করা হয়েছে। এই পাইপলাইনের ক্ষমতা সর্বোচ্চ ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর চেয়ে বেশি গ্যাস সরবরাহ করা এই পাইপলাইন দিয়ে সম্ভব হবে না। টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রামে গ্যাস আনতে মহেশখালী-আনোয়ারা ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে। আনোয়ারা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন স্থাপনের কাজ চলছে।
সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী কাতারের রাসগ্যাস এলএনজি সরবরাহ করছে। সরকার কাতার ছাড়াও ওমানের সঙ্গে এলএনজি সরবরাহ চুক্তি করেছে। এর বাইরে আরও ২৬টি কোম্পানির কাছ থেকে স্পট মার্কেটিং ভিত্তিতে এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ২৪ এপ্রিল ০.৬৫ মিলিয়ন টন এলএনজি নিয়ে এক্সিলারেট এনার্জি নামের একটি কার্গো ভেসেল মহেশখালিতে নোঙর করে। এই কার্গো ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে এলএনজি যুক্ত হয় মূল টার্মিনালে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে এই গ্যাস চট্টগ্রাম এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সারকারখানা ও অর্থনৈতিক জোনগুলোতে দেয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে মিশ্রণ হয়ে সারা দেশে পৌঁছে যাবে এই গ্যাস।
পেট্রোবাংলা সূত্রে আরও জানা গেছে, টেস্টিং পর্যায়ে জাতীয় গ্রিডে ১০০ এমএমসিএফডি (মিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস যুক্ত করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে চাহিদা অনুযায়ী এটি বাড়িয়ে প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নিয়ে যাওয়া হবে।
মহেশখালিতে নোঙর করা কার্গো ভ্যাসেল হতে প্রতিদিন ১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হলে তা থেকে আগামী ২ মাস পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। আর প্রতিদিন ৫০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করতে হলে প্রতি ৬ দিন অন্তর এ রকম একটি জাহাজ মহেশখালিতে নোঙর করাতে হবে। এই হিসাবে বছরে ৬০টি এ ধরনের কার্গো ভেসেল এলএনজি লাগবে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এক্সিলারেটর এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেডের (ইইবিএল) মাধ্যমে বাস্তবায়িত ভাসমান টার্মিনাল থেকে এই গ্যাস গরম করে প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তরিত করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হচ্ছে। কাতার ছাড়াও ওমান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেও জি-টু-জি ভিত্তিতে এবং স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র আরো জানায়, এক্সিলারেট এনার্জি ছাড়াও দেশীয় কোম্পানি সামিট এলএনজি টার্মিনাল কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে চলতি বছরের মধ্যে আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে। এছাড়া কুতুবদিয়া ও পায়রাতে আরও এক বা একাধিক স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্র জানায়, জাতীয় গ্রিডে এলএনজি যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেট্রোবাংলার আওতাধীন গ্যাস বিতরণ কোম্পানির মধ্যে তিতাস, কর্ণফুলী, বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানির ২ হাজার ৩৯০টি নতুন শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে। সরকার ধাপে ধাপে অনুমোদিত এই ২ হাজার ৩৯০টি শিল্পকারখানায় নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেবে।
জানা যায়, ইইবিএলের টার্মিনাল থেকে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৭৫ এমটিপিএ এলএনজি আমদানি করে রি-গ্যাসিফিকেশনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। আর সামিটের টার্মিনাল থেকে চলতি বছর শেষে ৩ দশমিক ৭৫ এমটিপিএ এলএনজি রি-গ্যাসিফিকেশন করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ আগামী বছর নাগাদ এ দুটি টার্মিনাল থেকে সাড়ে ৭ এমটিপিএ এলএনজি আমদানি করে তা রি-গ্যাসিফিকেশনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, এলএনজি আমদানি ও রি-গ্যাসিফিকেশনের জন্য রিভলবিং ফান্ড হিসেবে ৮৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে এলএনজির এলসিতে ৩ কোটি ডলার, ল্যাটেন্ট হিট ক্যাপচার সিস্টেমের (এলএইচসিএস) জন্য ১ কোটি ৪২ লাখ ডলার এবং এলএনজি আমদানি ও পরিচালনার জন্য রিভলবিং ফান্ড হিসেবে এসবিএলসিসহ প্রয়োজন হবে আরও ৮০ কোটি ডলার।
বিইআরসি (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন) সূত্রে জানা গেছে, ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তায় ২০১৫ সালে গঠন করা হয় জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল। এখন পর্যন্ত এ তহবিলে জমা হয়েছে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এটি একটি রিভলবিং ফান্ড হিসেবে পরিচালিত হবে। এ তহবিলের অর্থ থেকে অর্জিত সুদ ও সারচার্জ তহবিলে জমা হবে। তহবিল পরিচালনায় জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে।
আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, এলএনজিতে মিথেনের পরিমাণ ৮৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এছাড়া ইথেন ৬ দশমিক ৩২ শতাংশ, প্রপেন ২ দশমিক ১৬ শতাংশ ও বিউটেন ১ দশমিক ১২ শতাংশ। আমদানিকৃত এলএনজি গ্যাসের মান নিশ্চিতকরণে তিনটি টিম কাজ করবে। এগুলো হলো ক্রেতা পেট্রোবাংলার পক্ষে একটি, বিক্রেতা রাশগ্যাসের পক্ষে একটি ও অন্যটি ক্রেতা-বিক্রেতার সমন্বয়ে একটি স্বাধীন কমিটি।
উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক গ্যাস সাধারণ চাপ ও তাপমাত্রায় গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে। শীতলীকরণ (রেফ্রিজারেশন) প্রযুক্তির মাধ্যমে তাপমাত্রা কমিয়ে মাইনাস ১৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনলে তা তরলে পরিণত হয়। এই তরল প্রাকৃতিক গ্যাসকেই বলা হয় এলএনজি। একটি জাহাজে দুই থেকে আড়াই হাজার মিলিয়ন বা ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আনা সম্ভব।