প্রতিবেদন

কোরবানীর পশুর চামড়ার কাক্সিক্ষত দাম না পেলে পাচারের আশঙ্কা : সরকারের আশু হস্তক্ষেপ চান মৌসুমী ব্যবসায়ীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি খাত চামড়াশিল্পের প্রধান কাঁচামাল সংগ্রহ ব্যবস্থাপনার অবহেলায় এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম না পাওয়ায় ওই কাঁচামাল অনেকটাই বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে। কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়ায় চামড়া পাচারের আশঙ্কা বাড়ছে। মৌসুমী ব্যবসায়ীদের মতে, চামড়া সংগ্রহ থেকে ট্যানারি পর্যন্ত একটি সিন্ডিকেট এই পণ্যকে মূল্যহীন করে তুলছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে চরম সংকটে পড়বে চামড়াশিল্প। এ শিল্পকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে প্রতিযোগিতায় ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণ, দক্ষ জনশক্তি গড়া এবং চামড়া রপ্তানি উন্মুক্ত করাসহ চামড়ার আধুনিক কারখানা করার জন্য কিছু বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানায়, এবার কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহে সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সরকারকে জিম্মি করে ফেলা হয়েছে। আর এটা করা হয়েছে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি পল্লী স্থানান্তর করতে মালিকদের বাধ্য করার প্রতিশোধ হিসেবে। ফলে চামড়া কিনতে সরকার ৬০০ কোটি টাকা দেয়ার পরও কাজে লাগেনি। টাকার সংকট দেখিয়ে চামড়া কিনতে পারেনি বলে দাবি করছেন ট্যানারি মালিকরা। অথচ সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক এবং অন্যান্য খাত মিলিয়ে প্রায় হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে এ সময়ে।
রাজধানীর একজন কোরবানীদাতা জানান, এবার এক লাখ টাকার কম দামের গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে গড়ে ৫০০ টাকায় আর এক লাখের বেশি দামের গরুর চামড়া বিক্রি হয় গড়ে ৭০০ টাকায়। এসব চামড়া মহল্লার ছেলেরা কিনে নিয়ে যায়। আর খাসির চামড়া একেবারেই কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে।
চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় আরো সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে একটি লেদার কোম্পানির চেয়ারম্যান বলেন, সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গেলে সরকারের নীতিমালা ও কোরবানির ঈদের কমপক্ষে এক মাস আগে মাংস থেকে চামড়া ছাড়ানোর টেকনিক নিয়ে প্রচারণার উদ্যোগ নিতে হবে। কোরবানির পশু জবাইকারীদের আরো প্রশিক্ষিত করার উদ্যোগ নেয়া দরকার। অন্যথায় কোরবানির পশুর মালিকসহ ফড়িয়াদের ঠকতে হবে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হবে প্রতিবছর। তিনি আরো বলেন, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সরকারের দেয়া দরদামের তোয়াক্কা না করে চামড়া কেনে। ফলে সঠিক মাপের চামড়া কিনতে পারে না। তাই তাদের কম দামে চামড়া বিক্রি করতে হয়। এ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে চামড়া থেকে মাংস ছাড়ানোর ফলে প্রতিবছর প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার চামড়া নষ্ট হয়। এ জন্য দক্ষ জনবল গড়া এবং রাজধানীর বাইরে চামড়া সংরক্ষণের পরামর্শ দেন তিনি।
লালবাগের চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, রাজধানীর পাড়ায় পাড়ায় এক শ্রেণির মৌসুমি ব্যবসায়ী নামমাত্র মূল্যে চামড়া সংগ্রহ করে। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এসব ফড়িয়া বা মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়ার মূল্য কম দেয়। এদের আইনি আওতায় আনা গেলে এবং সরকার চামড়ার ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করে দিলে উৎস পর্যায়ে ন্যায্য দাম মিলবে। তবে ফড়িয়ারা ঠকালেও তাদের অদক্ষতার কারণে কৌশলে তাদের চামড়া কম মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য করে আড়তদাররা। ফলে অনেক ফড়িয়া এখন উঠে যাচ্ছে। এ ছাড়া ট্যানারি ব্যবসায়ীদের ছলচাতুরীর কারণে ঠকতে হচ্ছে আড়তদারদেরও। এমন একটি অস্থিরতার মধ্যে মূল্যহীন হয়ে পড়ছে দেশের বৃহত্তর রপ্তানি পণ্য চামড়া।
আরেকজন চামড়া ব্যবসায়ী জানান, সারা দেশে আলুর সংরক্ষণব্যব্যস্থা থাকলেও নেই রপ্তানি আয়ের অন্যতম খাত চামড়ার। ফলে চামড়া খাতের সরবরাহব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে অরাজকতা। দেখা গেছে, এবার কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কম হওয়ায় মসজিদ, মাদ্রাসা, এমনকি এতিমখানাগুলোও চামড়া নিতে চায়নি। আর বেচতে না পারার ক্ষোভে অনেকে ফেলে দিয়েছে, কেউ বা মাটিতে পুঁতে ফেলেছে।
একজন খুচরা ব্যবসায়ী জানান, চামড়াশিল্পের কাঁচামালের ব্যবস্থাপনা বলে কিছু নেই। চামড়ার উৎস থেকে প্রতিটি ধাপে অরাজকতা। ফলে এর নিজস্ব মূল্য হারাতে বসেছে। তাই সারা দেশে এর সংরক্ষণব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য অবশ্যই সরকারি প্রতিষ্ঠান বিসিকসহ সরকারকেও দায়িত্ব নিতে হবে। অন্যথায় একসময়ের সোনালি আঁশ পাটের মতো দেশের মূল্যবান স¤পদ চামড়াও তার জৌলুস হারাবে।
আরেকজন খুচরা চামড়া ব্যবসায়ী জানান, অব্যবস্থার ফলে ট্যানারি মালিকরা সরকার ও ব্যবসায়ীদের হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। হাতে টাকা রেখেও তারা ন্যায্য দামে চামড়া ক্রয় করেনি। এমনকি কৌশল করে দর নামানো হয়েছে। ২০ লাখের বেশি খাসির চামড়া না কিনে নষ্ট করেছে। আর এটা করা হয়েছে সরকার ও জনগণকে জিম্মি করতে। রাজধানী থেকে সাভারে ট্যানারি পল্লী নিয়ে যাওয়ায় এটা করা হয়েছে। হাজার কোটি টাকা লেনদেনের উৎস বের করা গেলে ট্যানারি মালিকদের এ অরাজকতার চিত্র বেরিয়ে আসবে।
চামড়ার জুতা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের একজন কর্ণধার স্বদেশ খবরকে বলেন, রাজধানী থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরে চামড়াশিল্পের কোনো লাভ হয়নি। বর্জ্য শোধনাগারের কাজ শেষ না হওয়ায় রপ্তানি আয় কমে যাচ্ছে। কার্যাদেশও পাচ্ছে না। তবে চামড়ার দরপতনে তিনি পাচার হওয়ার আশঙ্কা করছেন। তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে চামড়া আসবে না। এসব চামড়া বেশি দামে চলে যাবে পার্শ্ববর্তী দেশে। ফলে সামনে চামড়ার সংকটে পড়তে হবে ট্যানারি মালিকদের।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ অবশ্য স্বদেশ খবরের কাছে দাবি করেন, চামড়ার দরপতনে সরাসরি ট্যানারি মালিকদের কিছুুই করার থাকে না। পাড়া-মহল্লায় কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী এসব চামড়া কেনে। এরপর তারা ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করে। ফড়িয়ারা আবার আড়তদারদের কাছে বিক্রি করে। কিন্তু ফড়িয়ারা ঠিক নিয়মে চামড়া সংরক্ষণ না করায় কম দামে চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সরকারি দাম অনুসারে আমরা চামড়া কিনি এবং অনেক সময় একটু বেশি দাম দিয়েও কিনে থাকি। এবার কাঁচা চামড়া পাচারের আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের সীমান্তগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে। অন্যথায় দেশের চামড়াশিল্প সংকটে পড়তে পারে।