সাহিত্য

চন্দন চৌধুরীর পাঁচটি অণুগল্প

সাজগোজ
এক ব্যক্তির স্ত্রী ঘরদোর সাজিয়ে রাখতে ভালোবাসতো। একদিন জানতে পারল তাদের বাসায় আত্মীয় বেড়াতে আসবে। সেদিন তো সাজগোজ আরও বেড়ে গেল। স্বামী বলল, ওরা তো আসবে আগামীকাল, আজ থেকে বিছানা গুছিয়ে লাভ কি! রাতে তো ঘুমাতে হবে।
স্ত্রী বলল, তা ঘুমাওগে। আমার কাজ আমি করে রাখি। পরদিন আত্মীয় আসার আগে ঘরদোর বিছানাপাতির ওপর আরও নজর দিল। বিকেলে এল আত্মীয়রা। এসে দেখল ঘরদোর পরিপাটি করে সাজানো। কিন্তু বাড়ির বৌয়ের মুখের অবস্থাই ভালো না। ঘরদোর পরিষ্কার করতে গিয়ে মুখে হালকা কালিঝুলি লেগে গেছে।
এক আত্মীয় বলল, তোমার মুখে কালি কেন? বাড়ির বৌ খুব বিব্রত হলো। বলল, কাজ করতে গিয়ে এই একটু লেগে গেছে মনে হয়। এই বলে লজ্জায় তাড়াতাড়ি ওয়াশ রুমে ঢুকে গেল।

হাতির বুদ্ধি
কথা বলছিল হাতি আর পিঁপড়ে। পিঁপড়ে বলল, চলো আমরা ভাবনা-ভাবনা খেলা খেলি।
হাতি বলল, এটা আবার কেমন খেলা রে বাবা! বাপের জন্মে শুনিনি।
পিঁপড়ে বলল, শোনোনি দেখে কী হয়েছে! এই তো শুনলে! শোনো, তুমি একটা জিনিস ভাববে, সেটা আমিও ভাববো। তারপর আমি একটা জিনিস ভাববো, সেটা তুমিও ভাববে।
হাতি বলল, বাহ বেশ তো!
পিঁপড়ে বলল, তাহলে তুমি কিছু একটা ভাবো তারপর আমায় বলো, সে জিনিসটা আমিও ভাববো।
হাতি কিছুক্ষণ ভেবে বলল, মাথায় তো তেমন কিছু আসছে না। আচ্ছা ঠিক আছে, আমি ভাবছি একটা সুন্দর কলাগাছ। কী চমৎকার সব কলা! আমি গাছসুদ্ধ খাচ্ছি।
পিঁপড়া বলল, বাহ, বেশ মজা। আমারও কলা খাওয়া হলো। এবার আমি ভাববো। আচ্ছা, আমি ভাবছি আমি তোমার মতো বিশাল হয়ে গেছি আর তুমি আমার মতো ছোট হয়ে গেছ।
এই কথা শুনে হাতির চোখ লাল হলে গেল। বুঝতে পারল পিঁপড়ের মতলব। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিল হাতি। তারপর বলল, খুবই সুন্দর। তোমাকে বড় দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু ছোট জিনিস তো আমি ভাবতেই পারি না। এই যেমন তোমাকেও ঠিকভাবে আমি দেখি না। এত্ত ছোট তুমি!
বুদ্ধিতে হাতিকে হারাতে না পেরে নিজে নিজে জ্বলতে লাগল পিঁপড়েটা। আর পিঁপড়েকে দেখে মনে মনে হাসল হাতি।

ঈশ্বর ও কবিত্ব
ঈশ্বর একবার পাগলের বেশ নিয়ে এক গাছের ছায়ায় বসলেন। সকাল গেল দুপুর গেল, তারপর বিকেল। গাছ দেখতে পেল লোকটা উঠছেই না, আর কোনো কথাও বলছে না। গাছ বেশ বিরক্তবোধ করল। শেষে বলল, সেই সকাল থেকে দেখছি তুমি এখানে বসে আছ, বসেই আছ। কোনো কাজ নেই বুঝি?
পাগলবেশী ঈশ্বর বললেন, আমি কাজ করছি তো।
গাছ অবাক হয়ে বলল, কই, কোনো কাজ তো করছ না!
পাগল বলল, এই যে তোমার ছায়ায় বসে আছি, এটাই তো আমার কাজ।
গাছ হাসল। মনে মনে বলল, আমার ছায়ায় বসলে দেখি পাগলও কবি হয়ে যায়।
পাগলরূপী ঈশ্বর কিন্তু গাছের মনের কথা ধরে ফেললেন। বললেন, তোমাকে আমি সৃষ্টি করেছি, একদিন তোমার ছায়ায় বসে থাকব বলে!
গাছ বলল, এও একটা ভালো বাক্য।
পাগল হেসে বললেন, জানো তো, কবি না হলে কেউ সৃষ্টি করতে পারে না। সেই সূত্রে ঈশ্বরও একজন কবি। তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।
গাছ তখন হেসে বলল, তোমার একটা কথাকে ভালো বাক্য বলাতে নিজেকে প্রথমে কবি, পরে আবার ঈশ্বর ভেবে বসো না!
পাগলরূপী ঈশ্বরও হেসে বললেন, আমার মতো পাগল যদি নিজেকে ঈশ্বর বলে তবে কেউ কিছু মনেও করবে না।

প্রশ্ন এবং উত্তর
মৌখিক পরীক্ষা চলছিল। প্রশ্নকর্তা বললেন, এক পথে দুজন যাচ্ছিল। একজন পান করে এসেছে, অন্যজন স্বাভাবিকই ছিলেন।
অপর দিক থেকে দুই বন্ধু গল্প করে আসছিল। তারা লোক দুটিকে দেখল। এক বন্ধু মাতালকে জিজ্ঞেস করল, তুমি বুঝি পান করে এসেছ?
মাতাল বলল, না। আমি তো পান করিনি। তখন ওই বন্ধুই দ্বিতীয় জনকে জিজ্ঞেস করল, তাহলে তুমি কি পান করেছ? খুব ঘ্রাণ লাগছে নাকে! দ্বিতীয়জনও বলল, না, আমি তো পান করিনি। বলে ওরা চলে গেল। দুই বন্ধু তাদের চলে যাওয়া দেখল।
প্রথম বন্ধু বলল, দেখলি কিভাবে মিথ্যে বলে গেল! দ্বিতীয় বন্ধুটি বলল, ওরা তো মিথ্যে বলেনি। সত্যিই তো বলেছে। এই বলে থামলেন প্রশ্নকর্তা। তারপর পরিক্ষার্থীর দিকে তাকিয়ে বললেন, আসলে কোনটা ঠিক।
উত্তরদাতা একটু সময় নিয়ে বলল, দুজনই ঠিক বলেছে।
এই শুনে প্রশ্নকর্তা আবার উত্তরদাতার উত্তর রিপিট করলেন, দুবন্ধুই কি ঠিক বলেছে?
উত্তরদাতা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। প্রশ্নকর্তা হেসে বলল, হুম, দুজনই ঠিক বলেছে।

পার্থক্য
এক গাছে অনেক ফুল ফুটে আছে। দুইটি মৌমাছি একটি ফুলের দিকে উড়ে গেল। একটি ভ্রমর বলল, ঠিক আছে তুমি নাও।
অন্যটি বলল, আমি তো পরে এসেছি তুমি নাও। বলে দুটিই দুদিকে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর দুই দিক থেকে দুইটি পাখি এসে বসল। একটি বলল, কী উদ্দেশ্যে এলে ভাই?
অন্যটি বলল, ভাবছিলাম বাসা বানাব।
প্রথমটি বলল, তাহলে আমি যাই। বলেই উড়ে গেল।
দ্বিতীয়টি মনে মনে বলল, আহা! আমি অন্যজনকে বাসা বানানোতে বাধা হলাম না। আমারও এখানে বাসা বানানো ঠিক হবে না। ভেবেই উড়ে গেল পাখিটা।
ঠিক কিছু সময় পর দুই জন লোক এসে বসল গাছের গোড়ায়। একজন বলল, পুরো ছায়াটা নিজেই ভোগ করছেন, আমাকেও একটু দিন।
দ্বিতীয় জন বলল, আমি আগে এসে বসেছি আমারই পুরোটা পাওনা। আপনি অন্য কোথাও খোঁজ করুন।