রাজনীতি

চলতি বছরের ডিসেম্বরেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : এখনও নানামুখী সংকটে হতাশায় বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, চলতি বছরের অক্টোবরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে এবং ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কমিশন আরো জানিয়েছে, ওই নির্বাচনে ১০০টি আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ করা হবে।
নির্বাচন কমিশনের এই ঘোষণার পর নির্বাচনের সময় নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি না থাকলেও ইভিএমে ভোটগ্রহণ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ইভিএমে ভোটগ্রহণ প্রতিহত করা হবে। নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা ইভিএম প্রতিহত করবে, না অংশ না নিয়ে প্রতিহত করবেÑ সে বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি বিএনপির তরফ থেকে।
বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে কীনা সে বিষয়টিই দলের হাইকমান্ড এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি। আসলে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে বিএনপির হাইকমান্ড বলতে এখন কিছু আছে কীনা- সেটিই একটি বড় প্রশ্ন। তবে বিএনপির কিছু সিনিয়র নেতার হাবভাবে মনে হয়, তারা প্রত্যেকেই নিজেকে হাইকমান্ড মনে করেন। অবাক করা বিষয় হলো আমানউল্লাহ আমান, খায়রুল কবীর খোকনের মতো নেতারাও নিজেকে দলীয় হাইকমান্ড ভাবেন।
সে যা-ই হোক, বিএনপির হাইকমান্ডের দৌড়ে এখন সবচেয়ে এগিয়ে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ। নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রশ্নে তিনি বিএনপির পক্ষে ৪টি শর্ত দেন এবং বলেন, প্রস্তাবিত চারটি শর্ত পূরণ হলে আগামী নির্বাচনে যেতে পারে বিএনপি। শর্তগুলো হলোÑ প্রথমত, বর্তমানে বিএনপির চেয়ারপারসনসহ সারাদেশের বিভিন্ন দলের ২০ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ৭৮ হাজার মামলা রয়েছে। এগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের তফসিলের আগে চলমান জাতীয় সংসদ ভেঙে দিতে হবে। তৃতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি মিলে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করবেন। এতে বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে বিএনপিকে পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ ৩ থেকে ৫টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিতে হবে; যাতে তারা সঠিকভাবে নির্বাচনের জন্য কাজ করতে পারে। চতুর্থত, ভোটাররা যাতে স্বাধীনভাবে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে এবং প্রার্থীরা যাতে সকল ভোটারের কাছে নির্বিঘেœ ভোট চাইতে পারে সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বিএনপির এই চার শর্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিএনপি খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয় থেকে সরে গেছে। বিএনপি বলছে, খালেদা জিয়ার মামলাসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যে ৭৮ হাজার মামলা আছে সেগুলো প্রত্যাহার করলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে। বাস্তবতা হলো খালেদা জিয়াসহ বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ৭৮ হাজার মামলা যদি সরকার প্রত্যাহারও করে তাহলেও আইনি কারণে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে জেলেই থাকতে হবে। সেক্ষেত্রে বোঝা যায় বিএনপি খালেদা জিয়াকে জেলে রেখেই নির্বাচনে যেতে চাচ্ছে। মুক্ত খালেদা জিয়াকে নিয়ে বিএনপি নির্বাচন করতে চাইলে তাদের প্রথম শর্তটিই থাকত নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। সুতরাং বলা যায়, খালেদা জিয়াকে জেলে রেখেই বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত! কিন্তু এটি নিয়েই বিএনপির ভেতরে-বাইরে এবং তৃণমূলে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপি আন্দোলন করবে, না নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য দলটি আন্দোলন করবে সে সিদ্ধান্ত নিতেই তারা বহু মতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার পর এবং এরশাদের সময়েও সংকটে পড়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও একটা বড় সংকট তাদের গেছে। কিন্তু তাদের জন্য এবারকার পরিস্থিতি আরো জটিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি দল হিসেবে আছে এটা ঠিক, কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দলের মধ্যে সংহতি কতটা আছে। কারণ এই দলের অনেক নেতা অতীতে দল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন আবার দলে ফিরে এসেছেন; আবারও যেকোনো মুহূর্তে চলে যেতে পারেন। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, বিএনপি নেতাদের তৎপরতা বাড়তে থাকবে। সুতরাং এই সময়টা বিএনপির জন্য খুবই নাজুক।
এখন যে প্রশ্নটি দলে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি যাবে না। এ নিয়ে বিএনপিতেই রয়েছে দুই-তিন ধরনের মতবাদ। কিছু নেতা বলছেন, খালেদা জিয়া জেলে থাকা অবস্থায় বিএনপি নির্বাচনে গেলে জেলবন্দি খালেদার অদৃশ্য শক্তিতেই বিএনপি বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে এবং আগামীতে সরকার গঠন করতে পারবে। আবার কিছু নেতা বলছেন, খালেদা জিয়া নির্বাচনি প্রচারণা চালাতে না পারলে বিএনপির ভরাডুবি ঘটবে। নির্বাচনি মাঠে খালেদা জিয়া না থাকলে ভোটারদের মন কিছুতেই প্রভাবিত করা যাবে না। সেক্ষেত্রে মুক্ত খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপির কিছুতেই নির্বাচনে যাওয়া উচিত হবে না।
বিএনপির তৃতীয় আরেকটি পক্ষ খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আরো সোচ্চার হওয়ার পক্ষে। তাদের মতে, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার আন্দোলন শুরু করলে এতদিন বিএনপি চেয়ারপারসন মুক্তি পেয়ে যেতেন। তার মুক্তির জন্য আন্দোলন না করে বিএনপি একদিকে খালেদা জিয়াকে জেলে রেখেছে, আরেকদিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দৌড়ে অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির এই দুই-তিনটি পক্ষের পরস্পরবিরোধী কর্মকা-ের কারণে খালেদা জিয়ার মুক্তিও মিলছে না, আবার বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি যাবে নাÑ সে বিষয়টিও তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে পরিষ্কার হচ্ছে না। এতে বিএনপি পড়েছে ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতিতে। দলটির নেতাকর্মীর কাছে তাদের ভবিষ্যৎ এখন ধূসর। বিএনপির জেলের বাইরে থাকা নেতারা খালেদা জিয়াকে মুক্তও করতে পারছেন না এবং নির্বাচনে যাবে, সে নিশ্চয়তাও দিতে পারছেন না। আসলে খালেদা জিয়া ও লন্ডনপ্রবাসী তারেক রহমান ছাড়া বিএনপিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো যে কেউ নেই, এ বিষয়টিই এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে। তাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর বেশি দিন বাকি না থাকলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ ইস্যুতে এখনও সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পেরে একরকম হতাশায় আছে দলটির নেতাকর্মীরা।