প্রতিবেদন

ছাত্র আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তারকৃত শিক্ষার্থীদের ঈদের আগেই মুক্তির উদ্যোগ নেয়ায় সরকার ও বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের সাধুবাদ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মুক্তিপ্রাপ্ত অভিনেত্রী নওশাবা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হওয়া প্রায় সব ছাত্র ঈদের আগে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। পাশাপাশি গুজব ছড়ানোর অভিযোগে একই আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়া অভিনেত্রী নওশাবাও ঈদের আগের দিন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। ঈদের আগে শিক্ষার্থীদের জামিন হওয়ায় ওই শিক্ষার্থীদের পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ এজন্য সরকার ও বিচার বিভাগকে সাধুবাদ জানায়। ঈদের আগের দিন অপ্রত্যাশিতভাবে জামিন হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান অভিনেত্রী নওশাবা ও তার পরিবার।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের মামলায় গ্রেপ্তার মডেল ও অভিনয়শিল্পী কাজী নওশাবা আহমেদ জামিনে মুক্তি পাওয়ায় পরিবারের সঙ্গেই ঈদ উদযাপন করেছেন। ঈদের পরদিন সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান নওশাবা। তার লেখা একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেন স্বামী এহসান রহমান জিয়া। নিজের ফেসবুক থেকে চিঠিটি প্রকাশ করেন জিয়া। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান নওশাবা।
নওশাবার ঈদ শুভেচ্ছা এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন শিরোনাম দিয়ে নওশাবা লিখেছেন, দেশের সবাইকে ঈদুল আজহার বিলম্বিত শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আপনারা জানেন, আমাকে ঈদের আগের বিকেলে নিম্ন আদালত জামিন প্রদান করেছেন। এর মধ্য দিয়ে দেশের স্বাধীন বিচার বিভাগ তার মানবিকতার উজ্জ্বল এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমি অভিভূত। আমার আইনজীবীদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই।
আমার একমাত্র কন্যা প্রকৃতির সাথে ঈদের আনন্দ পরিপূর্ণভাবে অনুভব করার সুযোগ করে দেয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানোর উপযুক্ত ভাষা আমার জানা নেই। তিনি বাংলাদেশের ষোলো কোটি মানুষের একজন পরীক্ষিত, প্রকৃত ও সুযোগ্য অভিভাবক। এই ভূমিকার বাইরেও তিনি যে একজন মমতাময়ী মা, তা আবারো আমি নিজে একজন মা হিসেবে হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে বুঝতে পারলাম। নিকট অতীতেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার মাতৃত্বসুলভ গুণাবলির অনেক দৃষ্টান্ত তিনি রেখেছেন।
পুলিশ, র্যাব, ডিবি, সাইবার ক্রাইম ইউনিট আর কাশিমপুর কারাগারে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি সদস্য, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক এবং নার্সÑ যারাই আমাকে অনেক প্রফেশন্যালিজম আর সহমর্মিতার সাথে প্রতিটি স্তরে হেফাজত করেছিলেন, তাদের প্রতিও আমার অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতা।
অভিনয় শিল্পী সমিতির প্রেসিডেন্ট এবং সদস্যবৃন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদসহ অন্যান্য বিভাগের শিক্ষক-ছাত্রছাত্রী, বিভিন্ন গণমাধ্যমের কর্মী আর বাংলাদেশের সকল শিশুসহ আমার শুভাকাক্সক্ষীদের বলতে চাইÑ আপনারা যারা বিগত কয়েক সপ্তাহে আমার পরিবারের পাশে থেকেছেন, ক্রমাগত সাহস আর আশ্বাস দিয়েছেন, যার যার ব্যক্তিগত ও পেশাগত অবস্থান থেকে এগিয়ে এসেছেন, তাদের জন্য আমার অনেক ভালোবাসা রইল। আপনাদের সবার নিঃস্বার্থ প্রার্থনাতেই আমার মেয়ে প্রকৃতি ঈদের সারাটা দিন তার মাকে কাছে পেয়েছে।
পরিশেষে আমি আবারো একান্ত অনুরোধ করে বলতে চাই, যেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার চিরায়ত মাতৃত্বসুলভ মমতায় আমার আবেগতাড়িত ও অনিচ্ছাকৃত ভুলকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেন।
গত ৪ আগস্ট রাজধানীর জিগাতলায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় দুই ছাত্রের মৃত্যু এবং একজনের চোখ তুলে ফেলার গুজব ফেসবুকে ছড়ানোর অভিযোগে উত্তরা এলাকা থেকে নওশাবাকে আটক করে র্যাব। পরে তার বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করা হয়। পরে ৫ আগস্ট ঢাকা মহানগর হাকিম নওশাবার ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সেই রিমান্ড শেষে ১০ আগস্ট তাকে আদালতে হাজির করে ফের রিমান্ডের জন্য আবেদন করে ডিবি পুলিশ। ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এর মাঝে দুবার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার পর ঈদের আগের দিন ২১ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান নওশাবা।
উল্লেখ্য, ৪ আগস্ট ধানমন্ডিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্বৃত্তের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় ফেসবুক লাইভে হাজির হয়েছিলেন ঢাকা অ্যাটাক ছবির অভিনেত্রী কাজী নওশাবা। সে সময় নওশাবা বলেছিলেন, আমি কাজী নওশাবা আহমেদ, আপনাদের জানাতে চাই, একটু আগে জিগাতলায় আমাদেরই ছোট ভাইদের একজনের চোখ তুলে ফেলা হয়েছে এবং দুজনকে মেরে ফেলা হয়েছে। আপনারা সবাই একসঙ্গে হোন প্লিজ। ওদের প্রোটেকশন দেন, বাচ্চাগুলো আনসেভ অবস্থায় আছে, প্লিজ। আপনারা রাস্তায় নামেন, প্লিজ রাস্তায় নামেন, প্লিজ রাস্তায় নামেন এবং ওদের প্রোটেকশন দেন।
সরকার প্রোটেকশন দিতে না পারলে আপনারা মা-বাবা, ভাইবোন হয়ে বাচ্চাগুলোকে প্রোটেকশন দেন, এটা আমার রিকোয়েস্ট। এদেশের মানুষ-নাগরিক হিসেবে আপনাদের কাছে রিকোয়েস্ট করছি যে, জিগাতলায় একটি স্কুলে একটি ছাত্রের চোখ তুলে ফেলা হয়েছে এবং দুজনকে মেরে ফেলা হয়েছে এবং ওদের অ্যাটাক করা হয়েছে। ছাত্রলীগের ছেলেরা সেটা করেছে। প্লিজ ওদের বাঁচান প্লিজ। তারা জিগাতলায় আছে।
তবে ওই ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি। পরে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর খবরটি গুজব বলে জানান। কিন্তু এরই মধ্যে অভিনেত্রী নওশাবার লাইভ ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়।
এরপর গত ৪ আগস্ট রাতে রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে নওশাবাকে আটক করেন র্যাব সদস্যরা।
নওশাবা জামিনে মুক্তি পাওয়ার আগের দিন ২০ আগস্ট নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের সময় সংঘাত, ভাঙচুর, উসকানি ও পুলিশের কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সর্বশেষ ৯ শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান। শিক্ষার্থীরা যখন একে একে বেরিয়ে আসছিলেন, তখন জেলগেটে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ।
মুক্তি পাওয়া ৯ ছাত্র হলেন- সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের ছাত্র জাহিদুল হক, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নূর মোহাম্মদ, ইস্ট ওয়েস্টের ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস বিভাগের ছাত্র খালিদ রেজা, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র রেদোয়ান আহমেদ, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়ো-টেকনোলজির ছাত্র রাশেদুল ইসলাম, নর্থ সাউথের মাইক্রো বায়োলজির ছাত্র শাখাওয়াৎ হোসেন, বিবিএর ছাত্র আজিজুল করিম, আইইউবির বিবিএর ছাত্র শিহাব শাহরিয়ার ও ইস্ট ওয়েস্টের ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস বিভাগের ছাত্র তরিকুল ইসলাম।