কলাম

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমনে শেখ হাসিনার অবদান

অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ^াস
বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে যে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদের কারণে নিন্দিত ও সমালোচিত হতো, লজ্জায় আমাদের মাথা হেঁট হয়ে যেতো, সেই বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবে সারাবিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছে। (জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ, ১৮/১০/২০১৩)
যেকোনো জনসভা এবং বৈঠকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি নির্মম সত্য কথা উচ্চারণ করে জনগণকে সতর্ক করে দিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, ‘জঙ্গিবাদের উত্থান বিএনপি-জামায়াতের কারণে।’ বিশ্বনেতৃবৃন্দ একই কথা একটু অন্যভাবে বলেন। যেমন, ভারতের একজন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এরকম, ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতি থাকলে, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হলে, বাংলাদেশ জঙ্গিবাদমুক্ত থাকলে- আমরা স্বস্তি পাই। কারণ সে পরিবেশে জঙ্গি বা সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশে অবস্থান নিয়ে ভারতে কিংবা আশপাশের দেশে নাশকতা চালানোর সুযোগ পায় না।’ বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারের বহুমুখী পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে জঙ্গি এবং সন্ত্রাসবাদ নির্মূল হয়েছে এবং বাংলাদেশের আপামর মানুষ এখন জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার বলে মত দিয়েছিলেন মনমোহন সিং।
কেবল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নন, বিশ্বের অনেক শীর্ষ নেতা একই ধরনের মনোভাব প্রকাশ করেন জঙ্গিমুক্ত বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। কারণ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় আবহমান বাংলা সবসময়ই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর ছিল। এই সেদিন পর্যন্ত অর্থাৎ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকা-ের আগেও এদেশে জঙ্গিবাদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর শাসন-কালোত্তর টানা ২১ বছর সামরিক শাসকদের মদদে দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদের জন্ম হয়। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার ক্ষমতায় এলে পটভূমি পাল্টে যায়। মৌলবাদী গোষ্ঠী মাথা তুলে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে জঙ্গিরা তৎকালীন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসীন হলে জঙ্গিরা গা-ঢাকা দেয়। আত্মগোপনে থাকা এসব জঙ্গি ও জঙ্গি সংগঠন বর্তমান সরকারের সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে আবারও মাথা তোলার চেষ্টা করছে। আর সংগঠনগুলোর সবই একই নেটওয়ার্কে অর্থাৎ হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজি)-এর কার্যক্রম অনুসরণ করে নাশকতার বিস্তৃত কর্মকা-ে লিপ্ত হয়েছে।
বর্তমান সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর আছে জঙ্গিবিরোধী আলাদা ইউনিট। আর সেখানে জঙ্গিদের তথ্য সংগ্রহ, জঙ্গিবিরোধী অভিযান এবং তদন্ত চলে। তারা যৌথ অভিযানেও অংশ নেন। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারির হামলার পর ‘র্যাব’ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সহায়তায় একের পর এক জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে জঙ্গি নির্মূল করছে। এসব অভিযানের কারণে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে জনজীবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ফিরে এসেছে। তবে জঙ্গিবাদ উত্থানের কিছু কারণ রয়েছে সেগুলো বন্ধ না হলে জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নির্মূল হবে না। অন্যদিকে মনে রাখা দরকার জঙ্গিবাদ একটি বৈশি^ক সমস্যা। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা সরকারের যে সাফল্য, যে অর্জন, সেটা অকল্পনীয়। বিশ্বের বহু দেশ এটা করতে পারেনি। ১৭ কোটি মানুষের দেশে জঙ্গিসদস্য এবং তাদের আস্তানা খুঁজে বের করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মেধাবী ও চৌকস অফিসাররা যে অপারেশনগুলো করেছেন, তা বিরল ঘটনা।
২.
১৯৯২ সালে আফগান-ফেরত মুজাহিদদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রম শুরু হয়। তাদের অনুসৃত পথে এখন শতাধিক জঙ্গি সংগঠন রয়েছে দেশে। নেতৃত্বে আছে আফগান-ফেরত মুজাহিদদের কেউ না কেউ। মহাজোট সরকারের আমলে একদা গ্রেপ্তারকৃত ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’-এর সদস্যরা সংগঠিত হয়েছিল হুজির সাবেক নেতা ও ফাঁসিতে মৃত্যুবরণকারী শায়খ আবদুর রহমানের আদর্শে। মূলত হুজির পূর্বসূরিদের ‘সশস্ত্র বিপ্লব’-এর মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমের ‘অসম্পন্ন’ কাজ সম্পন্ন করতে নেমেছিল বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ায়, জঙ্গিদের কার্যক্রম প্রায় কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য বিভিন্ন সময়ে নাশকতার সৃষ্টি করে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করছে তারা। তারা হেফাজতের সঙ্গে মিশেও সরকার উৎখাতের চেষ্টা করেছিল; ব্যর্থ হয়ে নিজেরা নাশকতার ছক তৈরি করে দেশজুড়ে। উল্লেখ্য, আফগান-ফেরত কয়েক হাজার মুজাহিদ আলাদা আলাদা সংগঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে তালেবানি রাষ্ট্র বানানোর কার্যক্রমে জড়িত রয়েছে। হুজি, জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ ও আনসারুল্লাহ’র নীতি ও আদর্শ একই।
রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ক্ষমতায় আসীন হয় এবং ২০১৪ সালে পুনরায় সরকার গঠন করে। গত সাড়ে ৯ বছরে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোর দিকে অগ্রসর হয়েছে এদেশ। এ সময় সরকার ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং বামপন্থি সর্বহারাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছে। কিন্তু ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ শুরু হলে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র শিবির দেশে অরাজকতা ও নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা করে। অন্যদিকে ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাব ঘটলে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় নিষিদ্ধ ঘোষিত কিছু জঙ্গি সংগঠন। এদের সকলের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানো। ফলে মহাজোট সরকারের আমলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও, তাদের কারণে খানিকটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত সরকারকে প্রায় ৫০টির মতো সন্ত্রাসী কর্মকা- মোকাবিলা করতে হয়েছে। এর মধ্যে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বন্দুকযুদ্ধে মারা পড়েছে শতাধিক ব্যক্তি। ৫৫টির মতো ইসলামী দলের নাশকতা ব্যর্থ করেছে পুলিশ-র্যাবের যৌথবাহিনী। গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিন হাজার জঙ্গিকে যারা হুজি, ইসলামী ছাত্র শিবির, জেএমবি, হিযবুত তাহরির ও হিযবুত তাওহিদের সদস্য। একসময় যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের মুক্ত করার জন্য দেশব্যাপী যে নাশকতার সৃষ্টি করা হয় সে পরিস্থিতিতে আরও বেশ কিছু শিবিরকর্মীকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হয় পুলিশ। এক হিসেবে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৮৫টি নাশকতার ঘটনায় ৩ হাজার ২৪৪ জন ক্যাডারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মূলত ইসলামী জঙ্গি গ্রেপ্তারে সাফল্য রয়েছে অনেক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পুলিশ ছাত্র শিবিরের বিপুলসংখ্যক ক্যাডারকে গ্রেপ্তার করে। একই অভিযোগে হিযবুত তাহরিরের ক্যাডারদের ধরা হয়। উপরন্তু ব্যাপক নাশকতার পরিকল্পনা করার জন্য মিটিংয়ে বসলে ঢাকার পান্থপথের একটি রেস্টুরেন্ট থেকে হিযবুত তাওহিদের অর্ধশত ক্যাডারকে আটক করা হয়। এছাড়া নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলো সরকারের বিরুদ্ধে মিছিল করার চেষ্টা করলে কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলে র্যাব ও পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে একাধিক জনকে। এদের মধ্যে কেবল হিযবুত তাওহিদ নয়, জেএমবি’র নেতারাও রয়েছে।
দেশব্যাপী ২০১৭ সালে পরিচালিত অনেকগুলো অভিযানের মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদ দমনে র্যাব সদস্যরা সাফল্য দেখিয়েছেন যা পূর্ববর্তী বছরের মতো সরকার ও জনগণের কাছে সুনাম অর্জন করেছে। এসময় তারা চাঞ্চল্যকর অপরাধে জড়িত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনেছেন। ২০১৬ সালের জুলাই মাস থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৬টির বেশি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালানো হয়। এতে ৪৬ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। তাদের ৩৫ জন পুরুষ ও ৬ জন নারী জঙ্গি। এছাড়া বাকি ৫ জন শিশু। ২০১৬ সালের ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’, ‘অপারেশন স্টোর্ম-২৬’, ‘অপারেশন হিট স্ট্রং ২৭’, ‘অপারেশন রূপনগর’, ‘অপারেশন আজিমপুর’, ‘স্পেইট-এইট’, ‘অপারেশন শরতের তুফান’, ‘অপারেশন হারিনাল’, ‘অপারেশন গাজীরাস্ট’, ‘অপারেশন কাপমারা’, ‘অপারেশন রিপল ২৪’ প্রভৃতি জঙ্গিবাদ বিরোধী অপারেশনে ‘র্যাব’ সদস্যরা সম্পৃক্ত ছিলেন।
২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা ছিল নব্য জেএমবির। র্যাবসহ পুলিশের যৌথ টিমের অভিযানে (আগস্ট বাইট) সেই পরিকল্পনা নসাৎ করে দেয়া হয়। এছাড়া পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি নামধারী চরমপন্থিদের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে যেমন জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকা- নির্মূল করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে, তেমনি যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকদের নাশকতা ও জঙ্গিপনার জবাব দিতে হচ্ছে এখনও সরকারকে। কারণ ১৪ নভেম্বর ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন যে, বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করা হবে। যত বাধা ও হামলা আসবে তত দ্রুত নিষ্পন্ন হতে থাকবে মামলা এবং একে একে রায় ঘোষিত হবে। সে বছরই ২৫ নভেম্বর রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানানো হয়। ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় আসীন হলে এসব অপরাধীকে যে মুক্তি দেয়া হতে পারে সে সম্পর্কেও সতর্ক করা হয়। কারণ অপরাধীদের ফাঁসির রায় ঘোষিত হলেও তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে দেখা যায়নি।
উল্লেখ্য, বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুকেন্দ্রিক আন্দোলনের সুযোগে জঙ্গিদের তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। ২০১২ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল হলে বিএনপি দেশব্যাপী হরতাল-অবরোধের ডাক দেয়। ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলের আন্দোলনের নামে সহিংসতায় মারা যায় ২০ জন, ৪০ জন পুলিশসহ আহত হয় ২৯০ জন। ৭০ টির মতো বোমা হামলা চালায় বিরোধীদলের সমর্থকরা। পুলিশের ৫টিসহ গাড়ি পোড়ানো হয় ৫০টি। ভাঙচুর করা হয় আরও ১৫০টি। সরকার বিএনপির দাবিকে অযৌক্তিক হিসেবে চিহ্নিত করে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বারবারই বলে আসছিল। কারণ পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ ৬ হাজার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সাবেক নির্বাচন কমিশন ৫ জানুয়ারি (২০১৪) জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে সক্ষম বলে তারা মনে করতেন। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে জঙ্গি দমনের বিষয়ে অভিন্ন মতামত প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সন্ত্রাস নির্মূলে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ‘বন্দি-বিনিময় চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছে। উপরন্তু সীমান্তে সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারী ব্যতীত কাউকে গুলি করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি এবং উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে ঢাকা থেকে ভারতে পাঠানো হয়েছে। এর আগে মার্কিন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের প্রশংসা করা হয়েছে।
‘এ দেশের মাটিতে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালানো কঠিন’- এ শিরোনামে সন্ত্রাস দমনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশের মাটিতে কাজ চালানো সন্ত্রাসীদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক সন্ত্রাস নিয়ে ২০১৩ সালের ৩০ মে ওয়াশিংটনে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদনে একথা বলা হয়। ২০১২ সালের পরিস্থিতি নিয়ে ‘কান্ট্রি রিপোর্টস অন টেরোরিজম ২০১২’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘সন্ত্রাস দমন আইন, ২০০৯’ পাস করে। সে আইনকে যুগোপযোগী করার প্রয়োজন দেখা দেয় বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী কর্মকা-ের ধরন দ্রুত পাল্টানোর ফলে। এজন্য সন্ত্রাসী কর্মকা-ে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ (এপিজি) এবং ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) মানদ- অনুসরণ করতে সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এরপর ২০১২-এ এক দফা আইনটি সংশোধন করা হয়। কিন্তু তারপরও আরও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আন্তর্জাতিক মহল থেকে অনুরোধ আসে। এসব বিষয় যুক্ত করতেই সরকার আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের ১১ জুন জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল-২০১৩ পাস হয়েছে। এ বিলের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইন্টারনেটভিত্তিক সন্ত্রাসী কর্মকা- প্রতিরোধে বাস্তবসম্মত ধারাসমূহের অন্তর্ভুক্তি। কোনো সন্ত্রাসী ব্যক্তি বা সংগঠন ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকা- করলে সাক্ষ্য আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, এ সংক্রান্ত তথ্যগুলো প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা যাবে। অন্যদিকে, এ বিলে জঙ্গি দমনে গুরুত্বপূর্ণ ধারা যুক্ত হয়েছে। আল কায়েদার সম্পদ বাজেয়াপ্ত, অস্ত্র বিক্রি ও ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা এবং জঙ্গিবাদে অর্থায়নে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নেয়া দুটি প্রস্তাবও আইনে পরিণত করা হয়েছে।
আইন, বিচার ও নিবিড় নজরদারির কারণে বাংলাদেশে জঙ্গিরা সুবিধা করতে পারছে না। অন্যদিকে জঙ্গি অপতৎপরতা দমনে আত্মত্যাগ করতে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। ২০১৭ সালের ৩১ মার্চ সিলেটে জঙ্গিদের বোমা হামলায় র্যাবের গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদ নিহত হয়েছেন। শুধু তিনি নন, এর আগেও র্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান কর্নেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ ২০০৯ সালে পিলখানায় নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। আধুনিক র্যাব গঠনে তার ভূমিকা ছিল ব্যাপক। ২০১৭ সালের ১৮ মার্চ আশকোনায় র্যাব ক্যাম্পে আত্মঘাতী হামলায় র্যাবের দুই সদস্য আহত হন। প্রাণ যায় হামলাকারীরও। আশকোনায় র্যাব ক্যাম্পে আত্মঘাতী হামলার একদিন পরই ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে রাজধানীর খিলগাঁও থানার নন্দীপাড়া শেখেরটেকে র্যাবের চেকপোস্টে হামলার ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণে র্যাবের দুই সদস্য আহত হন। র্যাবের গুলিতে হামলাকারী নিহত হয়। এছাড়া আত্মত্যাগের আরো দৃষ্টান্ত রয়েছে ‘র্যাবে’র নিজস্ব ওয়েবসাইটে।
বাংলাদেশে ৯০ দশক থেকে জঙ্গি তৎপরতার শুরু হলেও ২০১৬ সালে এসে জঙ্গিদের আরও হিংস্র ও আগ্রাসী মনোভাব দেখা যায়। তবে পাল্টা অভিযানে বেশ সফলই হয়েছে এলিট ফোর্স ‘র্যাব’। ২০১৭ সালেও জঙ্গিবিরোধী বেশ কিছু অভিযানে শীর্ষস্থানীয় বেশ কজন জঙ্গি নিহত হয়, পাশাপাশি ভেঙেছে তাদের জাল।
জেএমবি ২০০২ সাল থেকে এ পর্যন্ত হত্যা এবং হামলার তালিকা প্রকাশ করেছে। ২০০২ সাল থেকে ২০১৬ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৫ বছরে মোট ১৭৮টি হত্যা ও হামলার দায় স্বীকার করেছে জেএমবি। এর মধ্যে তারা ২০টি চাঞ্চল্যকর হত্যাকা- ঘটিয়েছে বলেও দাবি করা হয়। অবশ্য ১৩ ডিসেম্বর ২০০৫ তারিখে জেএমবি’র সামরিক কমান্ডার আতাউর রহমান সানিকে ঢাকার তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে ১ মার্চ ২০০৬ জেএমবি প্রধান শায়খ আব্দুর রহমানকে সিলেট শহরের শাপলাবাগ এলাকার সূর্যদীঘল বাড়ি নামের একটি বাড়ি থেকে এবং একই বছরের ৬ মার্চ জেএমবি’র সেকেন্ড-ইন-কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইকে ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা থানার চেচুয়া বাজারের রামপুর গ্রাম থেকে র্যাব সদস্যরা গ্রেপ্তার করেন। এদের গ্রেপ্তারের ফলে জেএমবি অনেকটা কোণঠাসা ও দুর্বল হয়ে পড়ে। এসকল সংগঠনের মূল নেতৃত্ব বর্তমানে জীবিত না থাকলেও গোপনে গোপনে এরা সংগঠিত হয়ে এদের তৎপরতা এখানো চালিয়ে যাওয়ার প্রয়াস পাচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জঙ্গি হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের দায়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের মোট ৭৭৮ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৫২ জনই হলো নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবি সদস্য। এ সময় ‘র্যাব’ ও অন্যান্য সদস্যরা মোট ২০৪টি গ্রেনেড ও বোমা, ৭৫টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, প্রায় তিন হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ, দুই হাজার কেজি বিস্ফোরক, ৬২৪টি গ্রেনেড এর বডি, ৯ হাজার ডেটোনেটর ও বিপুলসংখ্যক সাংগঠনিক বই, সিডি ও লিফলেট উদ্ধার করেছেন।
গাজীপুর ও মিরপুর এলাকা থেকে ২০০৯ সালে জেএমবি’র ঢাকা বিভাগের একজন সামরিক কমান্ডার, একজন বোমা বিশেষজ্ঞ ও আইটি প্রধানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া ২০১০ সালে ‘র্যাব’ সদস্যরা বেশ কিছু জেএমবি, পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়বা, হরকাতুল জিহাদ ও হিজবুত তাহরির সদস্যকে গ্রেপ্তার করেন। ২০১৬ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার আলোকদিয়া গ্রাম থেকে জেএমবি’র আমীর মাওলানা সাইদুর রহমানের একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ ও সদস্যদের গ্রেপ্তার ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনা থেকে এটা ধারণা করা যায় যে দেশে জঙ্গি সংগঠনের তৎপরতা কমে গেলেও তা একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। ‘র্যাব ইন্টেলিজেন্স উইং’ সারাদেশে তাদের গোয়েন্দা কার্যক্রমের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে তা যাচাই-বাছাইয়ের পর সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, জঙ্গিবাদসহ যেকোনো অপরাধ দমনে অভিযান পরিচালনা করছে। এ দেশের মানুষের ধর্মভীরুতার সুযোগ গ্রহণে সচেষ্ট জঙ্গি সংগঠনসমূহের অপতৎপরতা ও পরিকল্পনার তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরে এনে ২০১৩ সালে ২১৪ জন জঙ্গিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।’ এদেশের মানুষ ধর্মীয় উগ্রবাদিতা ও তাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত জঙ্গিবাদকে ঘৃণা করে। দেশের অগ্রগতি ও নিরাপত্তার জন্য সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বড় ধরনের অন্তরায়। এই অন্তরায় দূর করার জন্য গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ‘র্যাব’ বাহিনীর সফল অভিযানে শীর্ষ স্থানীয় জঙ্গি নেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ সদস্য গ্রেপ্তার ও নিহত হয় এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলা-বারুদ উদ্ধার করা হয়। ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান হামলার পর এ পর্যন্ত যতগুলো অপারেশন পরিচালিত হয়েছে তার সবগুলো থেকেই জঙ্গিগোষ্ঠী আঘাত হানার পূর্বে ‘র্যাব’ তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে জঙ্গি আস্তানাসমূহ গুড়িয়ে দিয়েছে। জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ ‘র্যাব’ একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ফলে বর্তমানে জঙ্গি তৎপরতা বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে এবং জঙ্গি দমনে এ সাফল্য আন্তর্জাতিক পরিম-লে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। উপরন্তু জনগণের নিরাপত্তা এবং দেশের সুনাম অক্ষুণœ রাখার লক্ষ্যে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকা- দমনে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। র্যাবের উদ্যোগে ‘কতিপয় বিষয়ে জঙ্গিবাদীদের অপব্যাখ্যা এবং পবিত্র কোরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াত ও হাদীসের সঠিক ব্যাখ্যা’ শীর্ষক প্রকাশিত পুস্তিকা এখন সকলের হাতে। অন্যদিকে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে বিবেচিত হওয়ায় ও জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৭টি সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। জঙ্গিবাদ এবং জঙ্গিবাদের অর্থায়নে জড়িতদের কার্যকরভাবে দমনের লক্ষ্যে সরকার সন্ত্রাস বিরোধী আইন-২০০৯ (সংশোধনী-২০১৩) এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ প্রণয়ন করেছে। সরকারের আন্তরিকতা এবং গৃহীত নানা পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে শান্তিশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। জনগণের প্রত্যাশা জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ দমনে ‘র্যাবে’র সকল কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। উল্লেখ্য, জঙ্গি হিসেবে ‘র্যাব’ এযাবৎ যতজনকে গ্রেপ্তার করেছে তাদের অধিকাংশই তিনটি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের। সংগঠনগুলো হচ্ছে : জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ওরফে আনসার আল ইসলাম ও হিযবুত তাহরির। জেএমবি গঠিত হয়েছে জামায়াতের প্রাক্তন সদস্যদের নিয়ে। আল-কায়েদার অনুসারী আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যদের মধ্যে রয়েছে শিবিরের লোকজন। হিযবুত তাহরিরের সঙ্গে সরাসরি জামায়াতের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া না গেলেও দল দুটির মধ্যে মতাদর্শগত মিল রয়েছে; এরা ওয়াহাবী ধারার জিহাদি।
অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত জানিয়েছেন, বিদেশি অর্থ ছাড়াও জামায়াতী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মুনাফার ৪০ হাজার কোটি টাকা প্রতি বছর বিনিয়োগ হচ্ছে জঙ্গি চাষাবাদে। এদের নিষিদ্ধ করে নির্মূল করা হলে বন্ধ হবে জঙ্গিবাদ। আর জঙ্গিবাদের বিলোপের মাধ্যমে নিশ্চিত হবেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের বিজয়।
৩.
মূলত শেখ হাসিনা সরকারের আন্তরিকতার কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়মিত জঙ্গিদের কার্যক্রম নজরদারি করা হচ্ছে। তারা যাতে সংগঠিত হতে না পারে সেজন্য গোয়েন্দা কার্যক্রম ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জঙ্গি দমনে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। ইতোমধ্যে এ দেশের সকল নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা এবং জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সন্ত্রাস সম্পর্কে জিরো টলারেন্স নীতিতে বিশ্বাসী হিসেবে অভিনন্দিত হয়েছেন শেখ হাসিনা। ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের বিপক্ষে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে এদেশের। নাশকতা ও সহিংসতা গণতন্ত্রকামী মানুষকে আকৃষ্ট করে না। বরং যারা নাশকতা ও সহিংসতা করবে বা এর পৃষ্ঠপোষকতা দেবে, তাদের প্রতি ক্রমাগত ঘৃণাই প্রকাশ করে জনগণ। আর জঙ্গিমুক্ত স্বস্তিকর বাংলাদেশই জনগণের প্রত্যাশিত সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং
পরিচালক জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়