প্রতিবেদন

দ্রুত এগিয়ে চলছে কর্ণফুলী টানেলের নির্মাণ কাজ : বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আসবে আমূল পরিবর্তন

নিজস্ব প্রতিবেদক
কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের নির্মাণ কাজ ২৪ শতাংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ২৫ আগস্ট চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণকাজ পরিদর্শন শেষে তিনি এ কথা বলেন।
‘ওয়ান সিটি অ্যান্ড টু টাউন’ মডেলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় কর্ণফুলী নদীর তলদেশে ৪ লেনের টানেলটি নির্মাণ করছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫৫ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ৩৫০ মিলিয়ন ডলার এবং চীন সরকার ৭০৫ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ডলার দেবে।
এর আগে মন্ত্রীকে নির্মাণাধীন প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ দেখান উপ-প্রকল্প পরিচালক (প্রশাসন) ড. অনুপম সাহা। এ সময় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ছাড়াও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম শহরকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। এক ভাগে রয়েছে নগর ও বন্দর এবং অপর ভাগে রয়েছে ভারী শিল্প এলাকা। কর্ণফুলী নদীর উপর ইতোমধ্যে ৩টি সেতু নির্মিত হয়েছে, যা বিপুলসংখ্যক যানবাহনের জন্য যথেষ্ট নয়। নদীর মরফলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কর্ণফুলী নদীর তলদেশে পলি জমা একটি বড় সমস্যা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যকারিতার জন্য বড় হুমকি। এই সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য কর্ণফুলী নদীর ওপর আর কোনো সেতু নির্মাণ না করে এর তলদেশে টানেল নির্মাণ করা প্রয়োজন। আর এ জন্যই সরকার চট্টগ্রাম জেলার দুই অংশকে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
চট্টগ্রাম হলো বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর এবং বৃহত্তম বাণিজ্যিক নগরী। কর্ণফুলী নদীর মুখে অবস্থিত চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমেই দেশের অধিকাংশ আমদানি এবং রপ্তানি কর্মকা- পরিচালিত হয়। কর্ণফুলী টানেল বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে কর্ণফুলী নদীর অপর অংশের সাথে সরাসরি সংযুক্ত করবে এবং পরোক্ষভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মাধ্যমে সারা দেশের সাথে সংযুক্ত করবে।
কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) পাস হয়েছে ২০১৫ সালেই। দেশের প্রথম এ টানেল বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে একেবারেই বদলে দেবে। চীনের সাংহাইয়ের মতো ওয়ান সিটি টু টাউন-এর মর্যাদা পাবে চট্টগ্রাম। আশা করা হচ্ছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলটি এ অঞ্চলের কোটি মানুষের ভাগ্য বদলে দেবে।
দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রাম মহানগরীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা কর্ণফুলী চট্টগ্রামকে দুভাগে ভাগ করেছে। মূল মহানগর এবং বন্দর এলাকা কর্ণফুলী নদীর পশ্চিম পাশে অবস্থিত। অন্যদিকে ভারী শিল্প এলাকা পূর্ব পাশে অবস্থিত। কর্ণফুলীর এপাড়ে সমৃদ্ধ মহানগরী গড়ে উঠলেও ওপাড়ে এখনও গ-গ্রাম। উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি সেখানে। অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে কর্ণফুলীর ওপাড়ে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি ভারী শিল্প কারখানা। নদীর ওপাড়ে আনোয়ারা উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গড়ে উঠছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড)।
টানেলের মধ্যদিয়ে দু’পাড়ের সেতুবন্ধন রচিত হলে নদীর ওপাড়ের আনোয়ারা-পটিয়া থেকে শুরু করে বিস্তীর্ণ এলাকা উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় মিলিত হবে। শিল্পায়নের পাশাপাশি সে অঞ্চলের লাখো মানুষের ভাগ্য বদলে যাবে এমন প্রত্যাশা থেকে কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়।
৯০-এর দশকে জাপানভিত্তিক উন্নয়ন-গবেষণা প্রতিষ্ঠান জাইকা এ ব্যাপারে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। তাতে কর্ণফুলী নদীতে ব্রিজ নির্মাণের বদলে তলদেশে টানেল নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। কর্ণফুলীর ওপাড়ের এলাকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ১৯৯০ সালের দিকেই টানেল নির্মাণের পরামর্শ দেয় জাইকা। কিন্তু নানা জটিলতা আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে ওই টানেল বাস্তবায়ন হয়নি। শত বছরের পুরনো কালুরঘাট রেলসেতুর পাশাপাশি কর্ণফুলী নদীতে আরও দুটি সেতু নির্মাণ করা হয়। এসব সেতু নির্মাণের ফলে কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে, যা বন্দরের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে কর্ণফুলী নদী রক্ষা এবং সেইসাথে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগরীর যোগাযোগ সহজতর করতে টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা নেয় সেতু বিভাগ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত আগ্রহে দেশের প্রথম টানেল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইসহ আনুষঙ্গিক বিষয়াদি ঠিক করতে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে চীনের চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (সিসিসিসি) প্রকল্পটির পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের ১৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। ২০১১ সাল থেকে শুরু করে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে সমীক্ষা করে সিসিসিসি রিপোর্ট পেশ করে। ওই রিপোর্টে টানেলের ব্যাপারে বিস্তারিত সুপারিশ করা হয়। এতে বলা হয়, টানেল হবে ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার। এছাড়া পূর্ব প্রান্তের ৪ দশমিক ৯৫২ কিলোমিটার এবং পশ্চিম প্রান্তের ৭৪০ মিটার সংযোগ সড়কসহ টানেলের মোট দৈর্ঘ হবে ৯ দশমিক শূন্য ৯২ কিলোমিটার। এছাড়া টোল বুথ এবং টোলপ্লাজা নির্মাণ করতে হবে ৭ হাজার ২০০ বর্গমিটার। চার লেনের
টানেলে উভয় পাশে দুইটি করে লেন থাকবে। দুইটি টিউব নির্মিত হবে। প্রতিটি টিউবের ব্যাস হবে ১০ দশমিক ৮ মিটার। টানেলটি কর্ণফুলী নদীর কমপক্ষে ৪২.৮ মিটার গভীর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
মহানগরীর সিমেন্ট ক্রসিং এলাকা থেকে টানেলটি শুরু হয়ে নদীর ওপাড়ে আনোয়ারায় শেষ হবে। সেতু বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, টানেল নির্মাণ করা হলে কর্ণফুলী নদীর দুই পাশে নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে। তাছাড়া ভবিষ্যতে মহেশখালীতে গভীর সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে ঢাকা এবং চট্টগ্রামের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এটি এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। এছাড়া মাতারবাড়িতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে, এতে করে টানেলের গুরুত্ব বাড়বে। মিরসরাই থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় একটি মহাসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। টানেলের সাথে এ মহাসড়কের সংযোগ হলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। কালুরঘাট সেতু ও কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু হয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে তীব্র যানজটের অবসান হবে।