প্রতিবেদন

যে কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতি বিদেশি ক্রেতাদের বিপুল সাড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প খাতে বিদেশি ক্রেতারা বিপুল সাড়া দিচ্ছে। সম্প্রতি কানাডার টরেন্টোতে অনুষ্ঠিত একটি মেলায় অংশগ্রহণকালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যাপারে বিদেশি ক্রেতারা নতুন ওয়ার্ক অর্ডার দেন। অ্যাপারেল টেক্সটাইল সোর্সিং কানাডা (এটিএসসি) শীর্ষক তিন দিনব্যাপী এ মেলায় বাংলদেশের মোট ১৭টি তৈরি পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই মেলা থেকে ভালো ওয়ার্ক অর্ডার পেয়েছেন বলে জানান। এছাড়া ৩০টি দেশের ৫শ’র বেশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এ মেলায় অংশগ্রহণ করে।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) দিক-নির্দেশনায় কানাডার টরেন্টো আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে গত ২০ থেকে ২২ আগস্ট এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বৃহৎ এ ফ্যাশন মেলায় তৈরি পোশাক শিল্প এবং পাটজাত পণ্য প্রদর্শিত হয়।
কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মিজানুর রহমান, কমার্শিয়াল কাউন্সিলর শেখ মাহমুদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মাসুক শিকদার, ইপিবি’র পরিচালক অনুপ কুমার সাহা এবং সংশ্লিষ্টরা মেলা চলাকালিন সেমিনার ও আলোচনায় অংশ নেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়ন হওয়ায় এবং তৈরিকৃত পোশাকের গুণগত মান ভিয়েতনাম, চীন ও ভারতের তুলনায় ভালো হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক এখন ১ নাম্বার স্থানে
আছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড কোম্পানির এক জরিপে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বিদেশি ক্রেতাদের পছন্দের শীর্ষে আরো অন্তত ১০ বছর অবস্থান করবে। প্রতিযোগিতামূলক দর এবং বিশ্ববাজারে প্রধান প্রতিযোগী চীনের অংশ কমে আসার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের আকর্ষণ অমলিন থাকবে বলে মনে করে ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড কোম্পানি। সম্প্রতি তারা এ জরিপটি প্রকাশ করে। বিভিন্ন দেশের ৬৩টি বিখ্যাত ব্র্যান্ড এবং খুচরা ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ক্রয় কর্মকর্তাদের (সিপিও) সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জরিপ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।
দ্য অ্যাপারেল সোর্সিং ক্যারাভানস নেক্সট স্টপ : ডিজিটাইজেশন শীর্ষক জরিপে অংশ নেয়া ব্র্যান্ডগুলোর প্রধান ক্রয় কর্মকর্তাদের অর্ধেকই মনে করেন, আগামী ৫ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের আকর্ষণ অব্যাহত থাকবে। কর্মকর্তাদের ৪৯ শতাংশ মনে করেন, এখনও তাদের কাছে তৈরি পোশাকের উৎস দেশ হিসেবে বাংলাদেশই প্রথম পছন্দ। রপ্তানিকারক ৫ দেশের তালিকায় ভিয়েতনামকে অনেক পেছনে রাখা হয়েছে। মাত্র ৩৫ শতাংশ কর্মকর্তা তাদের পছন্দের দেশ হিসেবে ভিয়েতনামের কথা বলেছেন। সবচেয়ে পেছনে রয়েছে ভারতের অবস্থান। ২২ শতাংশ কর্মকর্তা ভারতকে পছন্দের কথা বলেছেন। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পর দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে ইথিওপিয়ার নাম উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেয়া এরকম কর্মকর্তার সংখ্যা ৪৩ শতাংশ। তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে মিয়ানমার। ৩৭ শতাংশ কর্মকর্তা আমদানি উৎস হিসেবে মিয়ানমারকে পছন্দ করেছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের বিশ্লেষকরা মনে করেন, পোশাক খাতে বাংলাদেশের যে অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে তারই প্রতিফলন ম্যাকেঞ্জির প্রতিবেদন। শত বাধা ঠেলে পোশাক খাতে যে সক্ষমতা তৈরি হয়েছে এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী মজুরির যে সুবিধা এখানে আছে, তাতে বাংলাদেশ এগোবেই। এ ছাড়া চীনের ছেড়ে দেয়া বাজারের বড় একটা অংশ বাংলাদেশেই আসার কথা। ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশ ৬ থেকে ১০-এ পৌঁছতে বেশি দিন সময় লাগবে না।
বিশ্লেষকরা আরো মনে করেন, প্রতিবেদনে ইথিওপিয়ার যে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে, তা বাংলাদেশের জন্য কোনো হুমকি নয়। তবে সে দেশে এইচ অ্যান্ড এমের মতো বিশ্বের বড় পোশাক ব্র্যান্ড বিনিয়োগ করেছে। সব ধরনের অবকাঠামো সুবিধা থাকায় চীন, হংকং থেকেও ইথিওপিয়ায় বিনিয়োগ বাড়ছে। মহাসড়ক, বন্দর, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সুবিধা দেয়া হলে বাংলাদেশের সঙ্গে পাল্লা দেয়া ইথিওপিয়া কেন কোনো দেশের পক্ষেই সহজ হবে না।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮১ ভাগই আসে তৈরি পোশাক থেকে। গত অর্থবছরে এ খাতে রপ্তানির আয়ের পরিমাণ ২ হাজার ৮১৫ কোটি ডলার। ২০২১ সাল নাগাদ এ খাত থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেয়া বেশিরভাগ কর্মকর্তাই চীন থেকে তাদের ব্যবসা সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
অভ্যন্তরীণ বাজার চাহিদা এবং মজুরি বেড়ে যাওয়ার কারণে পোশাক রপ্তানি থেকে পর্যায়ক্রমে সরে আসছে চীন। তবে পরিমাণে বেশি রপ্তানির কারণে চীন এখনও ক্রেতাদের কাছে অপরিহার্য নাম। ম্যাকেঞ্জির জরিপে ছোট এবং মাঝারি আকারের ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ বেশি লক্ষ্য করা গেছে। এ ছাড়া জরিপে অংশ নেয়া ৩৯ শতাংশ কর্মকর্তা পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। ইউরোপের অন্যান্য দেশ এবং উত্তর আমেরিকার দেশ থেকে আমদানি কমিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশ থেকে আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো তৈরি পোশাকের ফিনিশিংয়ের জন্য তাদের পছন্দের শীর্ষে রেখেছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের যে ফিনিশিং তা ভিয়েতনাম, চীন ও ভারতের চেয়ে অনেক উন্নত। আর এ জায়গাতেই বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের কাছে বারবারই হেরে যাচ্ছেন চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের নারী শ্রমিকরা।
এ বিষয়ে গার্মেন্টস বিশেষজ্ঞ শামসুল হক বলেন, বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের আঙুলের কাছেই মূলত হেরে যেতে হচ্ছে ভিয়েতনাম, চীন ও ভারতের নারীদের। ওই ৩ দেশের নারীদের আঙুলের তুলনায় বাংলাদেশের নারীদের আঙুল অনেক সরু। এই সরু আঙুলের কারণে বাংলাদেশের মেয়েরা সুঁই ও সুতার যে কম্বিনেশন গড়ে তোলেন, মোটা আঙুলের অধিকারী চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের নারীরা তা পারেন না কিছুতেই। ফলে তাদের ফিনিশিংয়ে খুঁত থেকে যায়; যা বিদেশি ক্রেতাদের প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে বাংলাদেশ থেকে পোশাক কিনতে।
তৈরি পোশাকের সব কাজই কিন্তু মেশিনে হয় না। যেমন শার্টে বোতাম লাগানোর বিষয়টি হাতেই সারতে হয়। এই হাতের কাজটি সারতে গিয়েই বাংলাদেশের নারীরা যে মুন্সিয়ানার পরিচয় দেয়, তাতে শতকরা ৯০ ভাগ পোশাকই ওকে হয়ে যায়। অপরদিকে ভিয়েতনাম, চীন ও ভারতের নারীরা তাদের আঙুলের গঠন প্রকৃতির কারণে এসব কাজে আনাড়িপনার পরিচয় দেন। ফলে অনেক পোশাক রিজেক্ট হয়ে যায়। এই কারণটিও বিদেশি ক্রেতাদের বাংলাদেশ থেকে পোশাক কিনতে আকৃষ্ট করে।