প্রতিবেদন

রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধন ইস্যুতে জাতিসংঘের প্রতিবেদন গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ ৬ জেনারেল অভিযুক্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাখাইনে রোহিঙ্গাদের যেভাবে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ ও বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে তা সবই ভয়াবহ গণহত্যার উদ্দেশ্যে। রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধÑ সবই করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এতে নেতৃত্ব দিয়েছেন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ও সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংসহ ৬ জেনারেল। আর গণতন্ত্রের নেত্রী হিসেবে পরিচিত মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি ছিলেন নীরব। দীর্ঘ তদন্ত শেষে জাতিসংঘের ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং মিশন’ (সত্যানুসন্ধানী দল) গত ২৭ আগস্ট এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে।
১০ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা হত্যাকা-ের কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬ জেনারেলসহ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এসব অপরাধের তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার বাহিনী শুধু রাখাইনে নয়, শান ও কাচিনেও গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সদস্যদের ওপর অধিনায়কদের কর্তৃত্ব নেই এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং অধিনায়কদের নেতৃত্বে ও নির্দেশেই এসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। মিয়ানমার সরকারকে এসব অপরাধ থেকে জনগণকে রক্ষা করার উদ্যোগ নিতে প্রতিবেদনে আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে গণহত্যায় নেতৃত্বদানকারী হিসেবে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং ছাড়াও উপসর্বাধিনায়ক ভাইস সিনিয়র জেনারেল সো উইন, স্পেশাল অপারেশন ব্যুরো-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল অং কিয়াও জাও, পশ্চিমাঞ্চলীয় আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডের অধিনায়ক মেজর জেনারেল মং মং সোয়ে, ৩৩ লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অং অং এবং ৯৯ লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থান ওর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) বা অন্য কোনো ট্রাইব্যুনাল গঠন করে তাদের অপরাধের তদন্ত ও বিচার করার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করার পরই বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমে এটি বেশ গুরুত্ব পায়। সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদন সম্পর্কে সিএনএনের সরাসরি সম্প্রচারে এর সংবাদদাতা ও বিশ্লেষক আলেকজান্দ্রা ফিল্ড বলেন, এগুলো (গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ) অবিশ্বাস্য রকম কঠোর শব্দ। আগে আমরা জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের ‘আক্ষরিক অর্থেই জাতিগত নির্মূল’ বলতে শুনেছি। এখন আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে শুনছি, সত্যানুসন্ধানী দল বলছে, শীর্ষ জেনারেলদের বিরুদ্ধে গণহত্যার তদন্ত ও বিচার হতে হবে। যারা মনে করতেন যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ন্যায়বিচার পাচ্ছে না, নিশ্চিতভাবে এটি তাদের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি প্রতিবেদন।
ব্রিটিশ দৈনিক দি ইনডিপেনডেন্ট এক টুইট বার্তায় ব্রেকিং নিউজ হিসেবে জানায়, প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে।
এদিকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ দপ্তরের এশিয়া বিষয়ক মন্ত্রী মার্ক ফিল্ড এক বিবৃতিতে সত্যানুসন্ধানী দলকে এ প্রতিবেদনের জন্য প্রশংসা করে বলেন, প্রতিবেদনে ভয়ংকর অপরাধের তথ্য থাকলেও এ নিয়ে বিস্মিত হওয়ার কারণ নেই। এই প্রতিবেদনের ভয়াবহতা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদÑ উভয়েরই দৃষ্টি আকর্ষণের দাবি রাখে বলে আমরা বিশ্বাস করি। অন্যদিকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট এক টুইট বার্তায় বলেছেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ সম্পর্কে জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি পড়ে অত্যন্ত বেদনাহত হয়েছি। এ ধরনের নৃশংসতা যারা চালিয়েছে তাদের কখনোই লুকিয়ে থাকার সুযোগ দেয়া হবে না। শিগগিরই আমি মিয়ানমার গিয়ে জবাব চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে জাতিসংঘের নীরব কূটনীতি ব্যর্থ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফান ডুজারিক বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব এন্টোনিও গুটেরেজসহ পুরো সংস্থা এ প্রতিবেদনকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে। মুখপাত্র বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব গণহত্যাকে ‘গণহত্যা’ বলতে লজ্জিত নন। অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার কোনো বিকল্প নেই।
এ প্রতিবেদন সম্পর্কে বিবিসি বলেছে, সত্যানুসন্ধানী দলের এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে মিয়ানমারের ভূমিকার এযাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানানো হয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী বরাবরই বলে আসছে রাখাইন রাজ্যকে জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের ঝুঁকিমুক্ত করতে অভিযান চালানো হয়েছে। জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দল তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, সামরিক প্রয়োজনে নির্বিচারে হত্যা, গণধর্ষণ, শিশুদের ওপর হামলা এবং পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার মতো বিষয় কখনো সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।
জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনটি আরো বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত ও আইনি বিশ্লেষণসহ আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে উত্থাপন ও প্রকাশ করা হবে। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু উপগ্রহ-চিত্রেরও বিশ্লেষণ থাকবে।
এদিকে ক্রমাগত অনুরোধ সত্ত্বেও মিয়ানমার সরকার এই সত্যানুসন্ধানী দলকে তাদের দেশে ঢুকতে দেয়নি। পরে দলটি বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য সফর করে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেছে। মিয়ানমারে গণহত্যা ও নিপীড়নের শিকার, প্রত্যক্ষদর্শী অন্তত ৮৭৫ জনের বিস্তারিত সাক্ষাৎকার গ্রহণ ছাড়াও উপগ্রহ-চিত্র, বিশ্বাস্যযোগ্য দলিল, স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্র সংগ্রহ করেছে দলটি। এছাড়া তারা যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, মনোবিজ্ঞান, সামরিক ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে যাচাই-বাছাই করে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে।
সত্যানুসন্ধানী দলটি বলেছে, তাদের এসব তথ্য-উপাত্ত জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনারের দপ্তরের হেফাজতে থাকবে। আগামী দিনে অপরাধীদের জবাবদিহির প্রক্রিয়ায় সেগুলো ব্যবহার করা যাবে।
সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধীদের নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করার নজির খুব একটা দেখা যায় না। তবে এ প্রসঙ্গে সত্যানুসন্ধানী দলের অন্যতম সদস্য রাধিকা কুমারাস্বামী জেনেভায় সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তারা ওই জেনারেলদের অন্যায়ের অসংখ্য তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন। সেনা সদস্যদের ওপর তাদের যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ছিল। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, কে দায়ী।