প্রতিবেদন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে রাশিয়ানদের পদচারণায় বদলে যাচ্ছে ঈশ্বরদীর অর্থনৈতিক চালচিত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক
পারমাণবিক প্রকল্প হলে আশপাশের জনবসতি হুমকিতে পড়বে, জমিতে ফলবে না ফসল, মারা যাবে পুকুর নদী, খাল-বিলের মাছÑ এমন প্রচারণাই একসময় ছিল ঈশ্বরদীর রূপপুর ও আশপাশের মানুষের মুখে মুখে। প্রকাশ্যে কিছু না বললেও গ্রামাঞ্চলের খুব সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল আতঙ্ক, উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা। অথচ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই মানুষগুলোই এখন গাইছে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের জয়গান।
বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু না হতেই রূপপুর এখন আলোকিত একটি গ্রাম আর ঈশ্বরদী কর্মব্যস্ত এক শহর। প্রকল্পে কর্মরত রাশিয়ানদের পদচারণায় ঈশ্বরদী এখন বদলে যাওয়া একটি জনপদ। স্থানীয় অর্থনীতিতে পড়েছে এর প্রভাব। গড়ে উঠছে নতুন নতুন স্থাপনা, ৩ তারকা মানের হোটেল, মোটেল, ব্যাংক, সুপার স্টোর, রেস্টুরেন্ট, বিনোদন কেন্দ্রসহ নানা কিছু। এতে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান; যা গোটা ঈশ্বরদীর অর্থনৈতিক চালচিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।
ঈশ্বরদী উপজেলা সদর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরের গ্রাম রূপপুর। কিছুদিন আগেও পদ্মা পাড়ের গ্রামটি ছিল শান্ত, নিরিবিলি। রাত নামলেই গাঢ় অন্ধকার সুনসান নিরবতা। কিন্তু এখন বদলে গেছে দৃশ্যপট। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ব্যাপক ও বহুমুখী কাজ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে এখানকার রাত-দিন, জনজীবন সবকিছু। রূপপুরের আকাশরেখায় মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে ২০ তলা উচ্চ দৃষ্টিনন্দন আবাসিক ভবন। এ রকম ৩টি ভবনের কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্প কর্মকর্তারা এসব ভবনে বাস করছেন। আরো একটি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। রূপপুর প্রকল্পের আবাসিক ভবন হবে ২২টি। প্রায় দেড় হাজার একর এলাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে। এতে কর্মরত কয়েকশত বিদেশি। তাদের অধিকাংশ রাশিয়ান। অন্য দেশেরও রয়েছেন কয়েকজন। এছাড়াও রয়েছেন দেশের, বিশেষ করে পরমাণু শক্তি কমিশনের বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা। কাজ করছেন কয়েক হাজার শ্রমিক।
এসব দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্যে ২৪ ঘণ্টাই মুখর থাকে প্রকল্প এলাকা। রূপপুরে এখন রাত হলেও আগের মতো অন্ধকার নামে না। রাতভর আলোকিত থাকে সার্চ লাইটের আলোয়। প্রকল্পের কাজ চলে সারারাত ধরে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মাহফুজ হাসান হাসিব স্বদেশ খবরকে বলেন, রূপপুর প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরদীতে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হচ্ছে। সাথে সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান। এলাকার মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে প্রকল্প সম্পন্ন হলে শুধু বিদ্যুতের আলোই নয়, আলোকিত হবে গোটা ঈশ্বরদীর মানুষের জীবন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সাইট অফিসে খোলা হয়েছে তথ্য কেন্দ্র। প্রকল্প সম্পর্কে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি দূর করতে কাজ করছেন তারা। দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে প্রকল্পের কাজ।
রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. শওকত আকবর স্বদেশ খবরকে বলেন, এখন রিঅ্যাক্টর বিল্ডিং তৈরির প্রস্তুতি হিসেবে সাব-বেইজ তৈরি করা হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে মূল প্রকল্পের ভিত্তি। অবকাঠামো ছাড়াও অনেক কাজ চলছে। যেমন রড, ল্যাবরেটরি, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি সব কাজই হচ্ছে পরিকল্পিতভাবেই। মূল স্থাপনার কাজ শুরু হলে তারপরের ৬৮ মাসের মধ্যেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
তিনি আরো বলেন, প্রতিদিন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশি কর্মী মিলে প্রায় ১ হাজারের বেশি কর্মী দিন-রাত কাজ করছেন। এ প্রকল্পের জন্য থ্রি প্লাস রিঅ্যাক্টর বসবে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তি, যা শুধু রাশিয়ার একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে রয়েছে। আর বাংলাদেশের রূপপুরেই হবে দ্বিতীয় ব্যবহার। এখানে মালিক (সরকার), সাব-কন্ট্রাক্টর ও আমরা সবাই এক কমান্ডেই কাজ করছি। কোনো সমস্যা নেই। নিরাপত্তা নিয়েও কোনো শঙ্কা নেই। ২০২০ সালের মধ্যেই রিঅ্যাক্টর ভেসেলসহ সব যন্ত্রপাতিই রাশিয়া থেকে চলে আসবে। তারপর এখানে অ্যাসেম্বলিং করা হবে। আগামী ২০২৩ সাল নাগাদ প্রথম ইউনিট থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।
ঈশ্বদীর বিশিষ্ট সমাজসেবক আবু হাসান এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক সচেতন। তাদের আর জুজুর ভয় দেখিয়ে কোনো কিছুতে আটকে রাখা যাবে না। ঈশ্বরদীবাসী সৌভাগ্যবান, কারণ এখানে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের কাজ চলছে। এই প্রকল্পের কারণে ঈশ্বরদীর মানুষের জীবনমানের অনেক উন্নয়ন ঘটছে।
বিশিষ্ট এই সমাজসেবক জোর দিয়েই বলেন, দ্রুতগতিতে চলমান এ প্রকল্প সম্পন্ন হলে শুধু পাবনা-ঈশ্বরদী নয়, সারা বাংলাদেশের অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন ঘটবে। দেশের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ হবার পাশাপাশি শিল্প বিকাশের মাধ্যমে সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান।
উল্লেখ্য, রাশিয়ার সরাসরি তত্ত্বাবধানে পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ২০০ করে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট স্থাপন করা হবে। এককভাবে বাংলাদেশে এটিই সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল প্রকল্প। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১ লাখ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ৯০ ভাগ অর্থ ঋণ হিসেবে রাশিয়া দেবে। বাকিটা বাংলাদেশ সরকার বহন করবে। পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের খরচ অনেক বেশি। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কম বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।