প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

রোহিঙ্গা নিধনের ১ বছর অতিক্রান্ত : সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি একাত্ম বিশ্ববাসী প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দ্রুত ফেরত নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি বিশ্ববাসীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে জাতিগত নিধনের শিকার হয়েছে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা নিধনের ১ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনী কর্তৃক গত বছরের আগস্ট মাসে শুরু হওয়া অভিযানে ২৪ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা করা হয়। ১ লাখ ১৪ হাজার মুসলমানকে নির্যাতন করা হয় এবং ১৫ হাজার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। আর এ ধরনের সহিংসতা থেকে প্রাণে বাঁচতে সেসময় প্রায় ১০ লক্ষাধিক নির্যাতিত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং বাংলাদেশ সরকার মানবিক কারণে এসব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় প্রদান করে। অথচ এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘসহ বিশ্ববাসীর নিন্দা ও আহ্বানকে উপেক্ষা করে মিয়ানমার সরকার তার দেশ থেকে আগত রোহিঙ্গাদের ফেরত না নেয়ার কারণে এ জনগোষ্ঠী এখন বাংলাদেশের গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে।
ফলে এ সংকটের ১ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি থেকে শুরু করে অন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়সহ সর্বস্তরে আলোচনা চলছে। সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি বিশ্ববাসী অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছে। তারা বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দ্রুত ফেরত নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি চাপ অব্যাহত রেখেছে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে অবস্থান নতুন না হলেও ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের কারণে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ১৯৭৮ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের অবস্থান বাংলাদেশে ছিল। তাদের কিছু অংশ মিয়ানমারে ফেরত গেলেও ৩ থেকে ৪ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছিল। ফলে বিভিন্ন হিসাব-নিকাশে ১৩-১৪ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজার ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়েছিটিয়ে অবস্থান করছে।
তাদের এই মানবিক বিপর্যয় অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বকে অধিক নাড়া দিয়েছে। এই সংকট বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র, সংস্থা ও সাধারণ মানুষকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া গণহত্যা ও জাতিগত নিধন প্রক্রিয়া যা মানুষকে চরমভাবে ব্যথিত ও বিস্মিত করেছে। এই গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের বিষয়টি জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানরা অকপটে স্বীকার করেছেন। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের সক্রিয় তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। এই তৎপরতার মূলে রয়েছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। উল্লেখ্য, জায়গা ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের পাশে মানবিক সহায়তার হাত প্রসারিত করে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কÑ এসব বিষয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার রোহিঙ্গাদের আপদকালীন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় প্রদান করে। পরবর্তীতে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উপায়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই সংকট সমাধানে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করে। আর এ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সম্পৃক্ত করে। এতে করে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ ক্রমেই বাড়তে থাকে। ফলে এদেশের জনগণ ও সরকার আশা করছে চলমান এ প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উপায়ে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান হবে এবং এ থেকে অচিরেই মুক্তি পাবে বাংলাদেশ।
গত বছর রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যে প্রস্তাব এখনও রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের এবং জনগণের মনোভাবের অন্যতম পরিচায়ক। এই ৫ দফা প্রস্তাবের ভেতরে একদিকে যেমন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মিয়ানমারে সম্মানজনকভাবে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি আছে, অন্যদিকে এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের পরিষ্কার ইঙ্গিতও রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের প্রস্তাবে মিয়ানমার রাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির সুস্পষ্ট আহ্বান রয়েছে। রাখাইনে সেইফ জোন অর্থাৎ নিরাপদ এলাকা প্রতিষ্ঠা করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাবটি দেয়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সাহসী এবং কার্যকর প্রস্তাব। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ এখনও বিভিন্ন পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা ও আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। এই তৎপরতার দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতেও লক্ষণীয়। ইতোমধ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট নামের একটি দলিলে স্বাক্ষর করে। ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর স্বাক্ষরিত এই দলিলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে দ্বিপক্ষীয় আলাদা আলোচনার একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। এর ওপর ভিত্তি করে ওয়ার্কিং গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করা হয় দু’দেশের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে। নীতিনির্ধারক পর্যায়ে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে তাদের প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়ার জন্য কাজ শুরু হয়। একই সঙ্গে রাখাইনে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ বজায় রাখা হয়। তাছাড়া আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ রক্ষা করে দেশ দুটিকে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থনের জন্য তৎপরতা অব্যাহত রাখা হয়। যার ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এই গুরুত্বপূর্ণ দুটি দেশ তাদের পূর্বের অবস্থান থেকে সরে এসে রোহিঙ্গাদের মানবিক দাবির প্রতি এক ধরনের সহানুভূতি প্রদর্শন করে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিম-লে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসি ও কানাডাসহ বিভিন্ন পক্ষ রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের প্রশংসার পাশাপাশি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ বরাবরের মতোই রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সোচ্চার। রোহিঙ্গাদের আত্মপরিচয়ে, নাগরিকদের অধিকার, মানবাধিকার, সর্বোপরি মিয়ানমারে তাদের ফিরে যাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার এবং আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি বিভিন্নভাবে নানা মহল থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে। মিয়ানমার রাষ্ট্রের নৃশংসতা, মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘৃণ্য নজির অং সান সু চির চরম ব্যর্থতাÑ এসব বিষয় নাগরিক সমাজ প্রতিনিয়ত বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরছে। যে সমস্যাটি এক সময় সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অনেকটা আড়ালেই ছিল সেটি এখন সবার মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের অবস্থান থেকে সরকার ও নাগরিক সমাজ এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অনেকটা একই মঞ্চে অবস্থান করছে। অর্থাৎ মিয়ানমার রাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা করার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। কিন্তু নতুন করে সৃষ্ট রোহিঙ্গা সংকটের ১ বছর অতিক্রান্ত হলেও এই সংকট সমাধানে বাস্তব পরিস্থিতি এখনও যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক নয়। বরং মিয়ানমার সরকারের অসহযোগিতামূলক আচরণ ও নানা তালবাহানার কারণে সমস্যাটির সমাধান ক্রমেই জটিল হচ্ছে। আর এই সংকটটি একদিকে রোহিঙ্গাদের জন্য বাঁচা-মরার অস্তিত্বের বিষয়। মানবতার বিষয় তো বটেই। অন্য দিকে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বের অনেক ধনী এবং শক্তিশালী রাষ্ট্র যখন ৫ কিংবা ১০ হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দিতে অনীহা প্রকাশ করে, সেখানে বাংলাদেশ ১৩-১৪ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে, নিজের সম্পদ তাদের জন্য বরাদ্দ করেছে এবং সমগ্র বিশ্বকে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছে। এই সংকটটি বর্তমানে একটি বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করেছে। একদিকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন, অন্যদিকে ক্যাম্পগুলোতে তাদের জন্য ন্যূনতম সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা, যা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভেতরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। স্থানীয় জনসাধারণ, যারা এক সময় রোহিঙ্গাদের স্বাগত জানিয়েছে তাদের মধ্যে এখন ব্যাপক উৎকণ্ঠা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ১১ লাখ রোহিঙ্গার উপস্থিতিতে কক্সবাজার-টেকনাফ এলাকায় জনমিতিক ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়েছে। স্থানীয় সম্পদের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের সহায়তা করার জন্য সব ধরনের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এমনকি ভাসানচর এলাকায় রোহিঙ্গাদের একাংশকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। শত শত স্থানীয়, জাতীয়, আন্তর্জাতিক সরকারি-বেসরকারি সংস্থাকে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সহায়তা করার, ত্রাণ তৎপরতাকে জোরদার করার কথাও বার বার বলা হচ্ছে। সরকারের প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস করে ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে পরিষ্কারভাবেই রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে একটি নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।
পাশাপাশি বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক তৎপরতার চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিষয়টি এমনিতেই চ্যালেঞ্জিং, যেখানে মিয়ানমার রাষ্ট্র একটি সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। তারা আন্তর্জাতিক চাপকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে চলছে। রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচার-প্রোপাগান্ডা ব্যাপকভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা সংক্রান্ত ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রকে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য সরবরাহ করছে। রাষ্ট্রটির ভেতরে সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় গোষ্ঠী রোহিঙ্গা ইস্যুতে একই অবস্থানে থেকে কাজ করছে।
জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণা মিয়ানমারের আচরণের মূল বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত এবং কূটনৈতিক প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার সব ধরনের প্রচেষ্টাকে দীর্ঘায়িত করার অপতৎপরতা চালাচ্ছে।
এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কি ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে, কিংবা উচিত তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই মতপার্থক্য ও উভয়সংকট কাজ করছে। কেউ কেউ যেমন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলেছে। কেউ কেউ এও মনে করে, দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় কোনো ফল আসবে না। আবার অনেকে এও মনে করেন, আইসিসির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারকে দোষী সাব্যস্ত করে দেশটিকে শায়েস্তা করতে হবে।
নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, ইতোপূর্বে এশিয়ার এই রাষ্ট্রটি ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাপক সুবিধা ভোগ করেছে। দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে এই রাষ্ট্রটির ওপর বৃহৎ শক্তির মুখাপেক্ষিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে চীন-ভারত-রাশিয়া-জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া-আসিয়ান দেশগুলো এই রাষ্ট্রের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।
অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিয়ানমারের ভেতরে তাদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করার সুযোগ খুঁজছে। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার এই নির্মম হিসাব-নিকাশ মিয়ানমারকে আরও আক্রমণাত্মক ও বেপরোয়া করে তুলেছে। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের বিষয়টি হয়তো আপাতত অধরা থেকে যাবে। তবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অবস্থান এবং তাদের সহায়তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এগিয়ে আসতে হবে। যতদিন রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কিংবা রোহিঙ্গাদের কার্যকর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু না হবে ততদিন রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতেই হবে। মানবিক সহায়তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যে কোনো হীনরাজনীতি কিংবা কৌশলগত বিবেচনা কাম্য নয়।

একনজরে গত ১ বছরে রোহিঙ্গাদের
নিয়ে যা হয়েছে মিয়ানমারে
গত ১ বছরে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদের ওপর যে অত্যাচার নির্যাতন চালিয়েছেÑ তা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দ্রুত ফেরত নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি বিশ্ববাসীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু মিয়ানমার একরোখা। দেশটির সামরিক শাসকদের হাতের পুতুল অং সান সুচি এখন উল্টো বাংলাদেশকে দোষারোপ করছে। বলছে বাংলাদেশের জন্যই নাকি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন আটকে আছে। সে যা-ই হোক, গত ১ বছরে মিয়ানমারে যা ঘটেছে তা স্বদেশ খবর পাঠকদের জন্য তারিখের ক্রমানুসারে উল্লেখ করা হলো।
২৪ আগস্ট ২০১৭ : রোহিঙ্গাদের একটি সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ করে মিয়ানমার। সে হামলায় মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের ১২ জন সদস্য নিহত হয় বলে দাবি করেছিল দেশটি। মিয়ানমার সরকার দাবি করেছে যে, ভোর রাতে একযোগে ২০টির বেশি পুলিশ ক্যাম্পে হামলা চালানো হয়। উত্তর রাখাইন অঞ্চলে এসব হামলার ঘটনা ঘটে।
২৫ আগস্ট ২০১৭ : রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন শুরু হয়। কয়েক হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে এসে আশ্রয় নেয়। তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যাকা-ের বিবরণ দেয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে।
২৬ আগস্ট ২০১৭ : রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের দূতকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে উদ্বেগ জানানো হয়। একই দিন বাংলাদেশের ভূখ-ে ঢোকার চেষ্টা করায় বেশকিছু রোহিঙ্গাকে আটক করে বিজিবি। সে সময় হাজার-হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশ আশ্রয় নেয়ার জন্য সীমান্তের অপর পাশে অপেক্ষা করতে থাকে।
৩১ আগস্ট ২০১৭ : এক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ২৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এ তথ্য দেন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা।
৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ : মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াং হি লি রাখাইনের পরিস্থিতিকে ভয়াবহ হিসেবে বর্ণনা করেন। মিস লি মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির সমালোচনা করেন।
৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ : রাখাইন অঞ্চলের পরিস্থিতিকে বিকৃতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগানের সঙ্গে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে টেলিফোনে আলোচনার পর সু চির দপ্তর থেকে এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়। একই দিন রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি ঢাকায় আসেন। তার আগে তিনি মিয়ানমার সফর করেন।
৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ : রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে চিঠি লেখেন মহাসচিব অ্যান্টনিও গুটেরেজ।
৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ : বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দেখতে তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী কক্সবাজারের উখিয়ায় যান।
১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ : জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নকে জাতিসংঘ জাতিগত নিধনের উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করে।
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ : রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে কক্সবাজারের উখিয়ায় যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে গিয়ে তিনি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় সরকারের সর্বাত্মক উদ্যোগের কথা জানান। মানবিক বিবেচনায় সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।
১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ : মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দেখতে ঢাকায় কর্মরত প্রায় অর্ধশত বিদেশি কূটনীতিক ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা কক্সবাজার সফর করেন। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ তৈরির যে চেষ্টা বাংলাদেশ শুরু করেছে তারই অংশ হিসেবে বিদেশি কূটনীতিকদের বিশাল এই দলটিকে কক্সবাজার নিয়ে যায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একটি বিশেষ বিমানে করে তাদের নেয়া হয় কক্সবাজারে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, চীন, ভারত, সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতরা এই সফরে শামিল হন।
২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ : বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেন। সেখানে তিনি রোহিঙ্গা সংকট তুলে ধরে সেটি সমাধানের জন্য ৫ দফা সুপারিশ উত্থাপন করেন। শেখ হাসিনার উত্থাপিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলÑ রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করা, মিয়ানমারে তাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে রাখাইনে নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তোলা।
২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ : জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা আইওএম-এর হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়ে যায়। সংকট শুরু হওয়ার ৩৪ দিনের মধ্যেই বাংলাদেশে ৫ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়।
২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭ : দীর্ঘ ৮বছর পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের উদ্যোগে এ বৈঠকের আহ্বান করা হয়। সে বৈঠকে জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হেলি মিয়ানমারের সমালোচনা করেন।
৬ নভেম্বর ২০১৭ : জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ রোহিঙ্গা সংকটের অবসান চেয়ে একটি বিবৃতি দেয় । যেখানে মিয়ানমার সরকারের প্রতি রাখাইনে রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর ওপর নৃশংসতা ও জাতিগত নিধন বন্ধের জোরালো দাবি তোলা হয়। এই বিবৃতিতে চীনেরও সম্মতি আদায় করা হয়। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ থেকে প্রথম বারের মতো কোনো বিবৃতি আসে।
১৮ নভেম্বর ২০১৭ : চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ঢাকা সফরে আসেন। ঢাকায় তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলেন। মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের ওপর জোর দেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
২৩ নভেম্বর ২০১৭ : রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সেখানে বলা হয় যে রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে মিয়ানমারে ফেরত নেয়া হবে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন ৩০০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়া হবে। যেদিন থেকে যাওয়া শুরু হবে, তার পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে প্রক্রিয়াটি শেষ হবে বলে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন।
৩০ নভেম্বর ২০১৭ : তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসেন রোমান ক্যাথলিকদের ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস। এরপর দিন অর্থাৎ ১ ডিসেম্বর ঢাকার কাকরাইলে বাংলাদেশে খ্রিস্টানদের প্রধান গির্জায় তিনি কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এবং বাংলাদেশ সরকারের ব্যবস্থাপনায় ক্যাম্প থেকে বাছাই করা রোহিঙ্গাদের ঢাকায় আনা হয়। সে অনুষ্ঠানে পোপ ফ্রান্সিস প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেন। যদিও এর আগে তার মিয়ানমার সফরের সময় পোপ ফ্রান্সিস রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেননি।
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ : বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্যে ৮ হাজার রোহিঙ্গার একটি তালিকা দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে তুলে দেয়। ঢাকায় দু’দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এই তালিকা হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে সে তালিকা থেকে মাত্র ৩৭৪ জনকে নিতে রাজি হয় মিয়ানমার।
২৯ এপ্রিল ২০১৮ : রোহিঙ্গাদের দুর্দশা স্বচক্ষে দেখার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি দল রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে। বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের দলটি আবারো বলেছে, রোহিঙ্গা সংকট দ্রুত সমাধান হবে না। এ সফরের সময় রাশিয়ার প্রতিনিধি বলেছেন রোহিঙ্গা সংকটের কোনো জাদুকরি সমাধান নেই। নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী এবং ১০টি অস্থায়ী সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা এ দলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
২ জুলাই ২০১৮ : রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টনিও গুটেরেজ এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের জিম ইয়ং কিম একসঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলার পর জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, রোহিঙ্গারা বিচার চায়। নিরাপদে বাড়ি ফিরতে চায়। এক সংবাদ সম্মেলনে গুটেরেজ বলেন, রোহিঙ্গাদের যে দুঃখ-কষ্ট তিনি দেখেছেন তাতে তার হৃদয় ভেঙে গেছে।