অর্থনীতি

সরকারের নানামুখী তৎপরতায় চাঙ্গা হচ্ছে পুঁজিবাজার : স্বস্তিতে বিনিয়োগকারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঈদের আগের শেষ কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় লেনদেন শেষ হয়। ঈদের পরের প্রথম কার্যদিবসেও সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দরপতন হলেও ব্যাংক খাতের দাপটে ঈদের আগের শেষ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সবকটি মূল্য সূচকের বড় উত্থান হয়। ওই দিন ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ১২৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম আগের দিনের তুলনায় বাড়ে। বিপরীতে দাম কমার তালিকায় স্থান করে নেয় ১৮৩টি। আর ২৩টির দাম অপরিবর্তিত থাকে।
বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার পরও ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৭০ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৫৩৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়। অপর দু’টি মূল্য সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ আগের দিনের তুলনায় ২৩ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৯৩৮ পয়েন্টে অবস্থান করে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৩ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ২৫০ পয়েন্টে দাঁড়ায়।
মূল্য সূচকের এই বড় উত্থানে মুখ্য ভূমিকা রাখে ব্যাংক খাত। অন্য খাতের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম কমলেও ঈদের আগের শেষ কার্যদিবসে একটি ব্যাংকও পতনের খাতায় নাম লেখায়নি। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৮টি ব্যাংকেরই শেয়ার দাম বাড়ে। আর দু’টির দাম অপরিবর্তিত থাকে।
ব্যাংক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন দাপটের কারণে ডিএসইর বাজার মূলধন বাড়ে ২ হাজার কোটি টাকার ওপরে। দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। যা আগের কার্যদিবস শেষে ছিল ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা।
বাজার মূলধন ও মূল্য সূচকের বড় উত্থান হলেও বাজারে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা কমে যায়। দিনভর ডিএসইতে লেনদেন হয় ৫৬০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। আগের দিন লেনদেন হয় ৫৮০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। সে হিসাবে ঈদের শেষ কার্যদিবসে লেনদেন কমে যায় ২০ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
টাকার অঙ্কে ডিএসইতে সব চেয়ে বেশি লেনদেন হয় বিবিএস কেবলসের শেয়ার। কোম্পানিটির ২৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়। লেনদেনে দ্বিতীয় স্থানে থাকা লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের ২০ কোটি ৭১ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়। ১৫ কোটি ৩১ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনে তৃতীয় স্থানে থাকে সিটি ব্যাংক। লেনদেনে এরপরে থাকে ঢাকা ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইফাদ অটোস, ন্যাশনাল ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক এবং ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ পতনে উদ্বিগ্ন হয়ে সরকারের পক্ষ থেকে পুঁজিবাজার সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। আর সরকারের এমন তৎপরতা দেখে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও ক্রয় চাপ বাড়িয়েছেন। ফলে ঈদের আগে ও পরে বাজারে উত্থান ঘটেছে। তবে পুঁজিবাজার গত এক-দেড় মাস ধরে টানা পতনের মুখে। মাঝে দু-একদিন করে বাড়লেও এটাকে দর সংশোধন বলা যায় না। এ অবস্থায় বাজারে আস্থা ফেরাতে টানা কয়েক দিন সূচকের উত্থান জরুরি ছিল। তাহলেই বাজারে গতি ফিরবে বলে মত বাজার সংশ্লিষ্টদের। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ফিরবে বলেও মনে করছেন তারা।
বাজার বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, আমাদের বাজারের মূল সমস্যা আস্থার। এখানে সামান্যতেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দেয়। এ কারণে মুদ্রানীতিই হোক বা রাজনৈতিক আশঙ্কা, ভীত হয়ে পড়েন অনেক বিনিয়োগকারী। এ মুহূর্তে বাজারে অর্থের সংকট খুব বেশি নেই। মূল সংকট আস্থার। ভালো কোম্পানির অভাবও এ সংকটের বড় কারণ হতে পারে। কেননা ভালো কোম্পানির শেয়ার সহজে কেউ বিক্রি করতে চায় না। যেহেতু আমাদের বাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা কম, তাই অল্পতেই বিনিয়োগকারীরা হাতের শেয়ার বিক্রি করে দেন। ফলে পতনের মাত্রা বাড়ে। তবে আমাদের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আর একটা সমস্যা সব সময় দেখা যায়, তা হলো দাম বাড়তে থাকলে তাঁরা শেয়ার বিক্রি করেন না। মনে করেন দাম খালি বাড়তে থাকবে। আবার দাম কমতে শুরু করলে সবাই একসঙ্গে বিক্রি শুরু করে দেন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১০ সালের বাজার ধসের পর অনেকগুলো প্রস্তাব এসেছিল। যেমন সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন কীভাবে সক্ষমতা অর্জন করবে, কীভাবে তারা ভালো শেয়ার বাজারে নিয়ে আসবে, কীভাবে জেড ক্যাটেগরির শেয়ারের লেনদেন কমানো যায়, কীভাবে গ্যাম্বলিং থেকে পুঁজিবাজারকে বের করে আনা যায় প্রভৃতি। আর এসবের কিছুই এখনও সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন করতে পারেনি এবং কী কারণে তারা পারল না, সেটি কেন আমরা খতিয়ে দেখি না? যেখানে দেশের অর্থনীতির সব সূচক ভালো সেখানে পুঁজিবাজার কেন অসুস্থ হয়ে আছে? এই অস্বাভাবিক বাজারের জন্য আমরা কেন বিএসইসিকে দোষারোপ না করে অন্যদের করি? বিএসইসির যা করার কথা ছিল তা তারা করেনি। গত ছয় মাসে বিএসইসি যে কয়টি কোম্পানি পুঁজিবাজারে এনেছে সেগুলো কি আসলেই বাজারে আসার মতো কোম্পানি? এদের মধ্যে কিছু কোম্পানি বাজারে আসতে না আসতেই জেড ক্যাটেগরিতে চলে গেছে। তাহলে কীভাবে এসব কোম্পানি বাজারে আসার অনুমোদন পেল, এ ব্যাপারে বিএসইসির জবাবদিহি করা উচিত। তারা কেন বাজারে ভালো কোম্পানি আনতে পারছে না? ২০১০ সালে যে কয়টি প্রস্তাব এসেছিল সেগুলোর কোনো খোঁজ-খব কেন তারা নেয়নি? আগে যে অনিয়মগুলো ছিল সেগুলো থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারেনি। সিডিবিএলের তথ্যগুলো মানুষের সামনে চলে আসে। যারা খেলোয়াড় তাদের সবার কাছে তথ্য থাকে কারা কী কিনেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সিডিবিএলের তথ্য কেন সবার কাছে যাবে? আর এই কথাগুলো কেন ব্রোকাররা বলেন না? অতএব বাজারের স্বার্থে এ বিষয়গুলোতে নজর দেয়া জরুরি বলেও মনে করছেন ওই বিশ্লেষকরা।
তবে আশার কথা হলো সাম্প্রতিক সময়ে এই বিষয়গুলো পূরণে সরকার কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফলে ধীরে ধীরে হলেও ঈদের আগে থেকে শেয়ারবাজারে ঊর্ধমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা ঈদের পরেও অব্যাহত আছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার মধ্যেই নিহিত আছে এর উন্নতি। পুঁজিবাজারের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে না আনলে বাজার সাময়িক সময়ের জন্য হয়তো চাঙ্গা হবে কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তা বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।