ফিচার

অচল পথের সচল ছবি

অরুণ কুমার বিশ্বাস
দৃশ্যপটÑআসাদ এভিনিউ, স্থানÑসেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সময়Ñসকাল আনুমানিক পৌণে নটা। পিক বা অফিস আওয়ার যা-ই বলুন, রাস্তায় মাখোমাখো জ্যাম। জেলির মতো চটচটে আঠালো জ্যামে ফেঁসে গিয়ে সমানে ঘামছি। না না, ঘামটা ঠিক দেখা যায় না, কারণ গাড়িতে এসি সংযুক্ত আছে। গাড়ির পেটের ভিতর ঝিম মেরে বসে আছি তো আছিই। একেবারে গাদাগাদি ভিড়, নট নড়নচড়ন। যাদের গতি ও প্রয়োজন বেশি তারা বাস থেকে নেমে পায়ে প্যাডেল মারছেন, মানে জোরকদমে হাঁটছেন। সময়মতো অফিসে পৌঁছতে না পারলে কারো কারো কুচুত করে কাটা পড়তে পারে তিন দিন লেটের মাশুল হিসেবে একদিনের বেতন।
আমি বসে বসে ভাবছি, আরো দশ বছর পর রাস্তায় আদৌ গাড়ি চলবে তো! নাকি সৌখিন মানুষ গাড়িতে বসে শুধু প্রেম করবে বা নাটকের প্লট ভাববে! একটা মজাদার দৃশ্য দেখে আনমনে হেসে ফেলি। নাটকও বলতে পারেন। এই নাটকের কুশীলব কিন্তু মনুষ্যজাতীয় কেউ নয়, দুটো ছাগল।
ছাগল দুটো বেশ বড়, আই মিন বেশ লম্বা, কিন্তু চেহারাসুরত তত দৃষ্টিনন্দন নয়। আর যা-ই হোক, এই ছাগল কোরবানির উপযোগী মোটেই নয়। ছাগলের মালিক পশুদ্বয় নিয়ে হাটে গেলে নির্ঘাত হতাশ হয়ে পশ্চাদপসরণ করবেন। এই ছাগল বাজারে বিকোবে না।
নাদুসনুদুস দেখতে হলে ছাগলের দাম বাড়ে। কারণ ছাগদুগ্ধ এদেশে তত জনপ্রিয় নয়, আমরা মাংসাশি জীব, দুধের বদলে গোস্তের প্রতি আমাদের পপাত বেশি। ছাগল দুটো প্রেমিক-প্রেমিকা হলেও আটকায় না, যদিও ভাবেসাবে মোটেও তা মনে হয় না। বরং দুটিতে বেশ প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে কোমর দুলিয়ে হাঁটছে। কেউ কারো প্রতি খুব একটা নেক নজর দিচ্ছে না। এদের ক্যাটওয়াকের বদলে গোটওয়াকে নামালে বেশুমার হাততালি পড়বে, এ-কথা অন্তত নির্দ্বিধায় বলা যায়। কিছুণ কাটল। আমি আনমনে ছাগল দেখছি। মানুষের যা খাসলত হচ্ছে ইদানীং, তাতে ছাগলের কোমর দুলুনি দেখে কারো দৃষ্টিসুখকর অনুভূতি হলে তাকে দোষ দেয়া যায় না। ও মা, কী আশ্চর্য! একটু পরে দেখি ছাগল মহোদয়রা দেয়ালে সাঁটা পোস্টার খাচ্ছে। এবার বুঝলাম ওদের এমন জরাজীর্ণ চেহারার কারণ আসলে কী! মালিক এদের মোটেও খেতে দিচ্ছে না।
গাড়ি এগোয়, আমি ক্রমশ ছাগ মহোদয়গণের সমীপবর্তী হই। খেয়াল করে দেখি, ছাগলরা কিন্তু এলেবেলে কোনো কাগজ নয়, বরং একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের পোস্টার চিবুচ্ছে। সেখানে জনৈক জননেতার চরিত্র নিয়ে বিস্তর প্রশংসা করা হয়েছে। অথচ পত্রিকাসূত্রে জানা যায়, গেল মাসে উক্ত জননেতা দু’খানা রেপকেসের অভিযোগে দিন বিশেক জেল খেটে এসেছেন। কী মহান ও চরিত্রবান ব্যক্তি, ভাবুন! অবশ্য ছাগল কিংবা নেতাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ইদানীংকালে যাকে তাকে দিয়ে রাজার পার্ট করানো হচ্ছে, অঙ্কবিদ হচ্ছেন সাহিত্যিক, আবার জীবনভর সাহিত্য পড়ে তিনি হয়ে যাচ্ছেন দুরন্ত দুর্বার কৌঁসুলি। দেখবেন, প্রকৌশলী আর কৌঁসুলিকে আবার এক করে ফেলবেন না। পতœী আর উপপতœী কিন্তু এককথা নয়! এদের মাঝে বিস্তর ফারাক। ছাগল পোস্টার খাচ্ছে, তার মানে ওর পেটে মেলা খিদে। বাঘে কখন ধান খায়, বিড়াল গাছে ওঠে? তার যখন আর কিছু করার থাকে না, মানে অনন্যোপায় হয়ে তাবৎ প্রাণি তার রুচিবিরুদ্ধ কাজে ব্রতী হয়। আর মানুষ, আমরা যারা নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করি তারা কিন্তু খিদে না পেলেও খাই, বিনা প্রয়োজনে অন্যের পশ্চাদ্দেশে অপরিষ্কার বাঁশ প্রবিষ্ট করি, অকারণে মানুষের নিন্দেমন্দ করি। বলতে নেই, একরকম বদ খাসলত পেয়ে বসেছে আমাদের। সে তুলনায় ছাগল ভালো, ওরা উল্টাপাল্টা লেখাসমৃদ্ধ পোস্টার খেয়ে দেয়াল পরিষ্কার করছে, পরিবেশ নষ্টের ঝুঁকি কমাচ্ছে। ছাগল মহোদয়গণÑ তোমাদের অকুণ্ঠ ধন্যবাদ। লাল সালাম!
হঠাৎ দেখি এক মনুষ্যশিশু দৌড়ে রাস্তা পার হচ্ছে, সাথে তার পিতৃতুল্য একজন, হতে পারে চাচা কিংবা মামা। সিগনাল গ্রিন, তাই গাড়ি হঠাৎ গতিপ্রাপ্ত হয়, আর ওদিকে মাসুম বাচ্চাসমেত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হয় নির্বোধ মানুষ। অথচ দু’পা সামনে গেলেই একখানা সুদৃশ্য ফুট-ওভারব্রিজ রয়েছে। মরে গেলেও সে তাতে উঠবে না। যেন উপরে ওঠা বারণ, সে পাতালে বা হাসপাতালে যেতে চায়।
কিছুণ পরে ছাগলের মালিকের দেখা মেলে। পরণে তার চেক লুঙ্গি আর বেঢপ ফতুয়া। পেটটা ফুলে ডোল, কী খায় কে জানে! ছাগলের না, ওই মালিকের কথা বলছিলাম। চ্যাক চ্যাক করে পান চিবায়, পিচিক করে পিক ফেলে, পরিবেশের বারোটা বাজায়। কিছু লোক দেখবেন হাঁটতে হাঁটতে নানা জায়গা চুলকায়, মানুষের ঘাড়ের ওপরে গিয়ে দাঁড়ায়, না বুঝে মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়, আবার কখনও বা একটু মনের অমিল হলেই গায়ে পড়ে ঝগড়া করে। বস্তুত, এরা সভ্যতা ভব্যতা বলে কিছু শেখেনি, পরমতসহিষ্ণুতা কী জিনিস জানেই না। সেই তুলনায় আমার ছাগল ভালো। মালিক বেটা হট হট হুস করতেই ওরা তার পিছু নেয়। মানে একরকম মান্যিগণ্যি ওরা জানে। মালিকের প্রতি কিঞ্চিৎ আনুগত্যও থেকে থাকবে। অথচ ওই বস্তু মানুষের নেই। এরা বরাবরই অকৃতজ্ঞ, কৃতঘœও আছে কেউ কেউ। নারায়ণগঞ্জের ঘটনাটা নিশ্চয়ই কেউ বিস্মৃত হননি। বন্ধুর হার্টের ব্যামো। তাকে ইন্ডিয়া নিয়ে গিয়ে নিজের টাকায় চিকিৎসা করিয়ে আনলেন, তারপর সেই কৃতঘœ বন্ধুর হাতেই কয়েক টুকরো হলেন দরদি মানুষটা।
এসব খবর আমাদের শুধু পীড়িত নয়, বড় বেশি হতাশ করে। মানুষ কি আর তাহলে মানুষ নেই!
লেখক : রম্যলেখক