রাজনীতি

খালেদা কি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করেন!

মমতাজ লতিফ : খালেদা জিয়ার আচরণ দেখে মনে হয় আদালতকে তিনি দয়া করে, দয়া দেখিয়ে আদালতের রায় মেনে কারাগারে থাকছেন। তার নিজস্ব বিশ্বাস, তিনি রাষ্ট্রের কোষাগারের মালিক। প্রাচীন যুগের রাজা-রানী-সম্রাট, উজির-নাজির সবাই প্রজাদের রাজস্ব হিসেবে দেয়া কর, অন্যান্য পণ্য, ফসলকে বিলাস-ব্যসনে ব্যয় করত, বড় বড় সুরম্য মূল্যবান পাথরখচিত প্রাসাদ, সমাধি ভবন তৈরি করে নিজেদের উচ্চ শিল্পরুচির প্রমাণ দিত। এদিকে জনগণ অভুক্ত, রুগ্ন, ভাঙ্গা ঘরে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন যাপন করত। খালেদাও বাঙালি এতিমদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বিদেশি রাষ্ট্রের দানের অর্থকে নিজের অর্থাৎ সরকারপ্রধানের জন্য উপহার ধরে নিয়ে ওই অর্থ নিজের ও নিজ পুত্রদের ব্যবসাবাণিজ্যে লগ্নি করেছেন। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কারণ খালেদা জিয়ার পে সামান্য সারতার জ্ঞান নিয়ে রাষ্ট্রের অসীম মতার অধিকারী হয়ে এটা উপলব্ধি করা কঠিন যে, রাষ্ট্রের কোষাগারের পাহারাদার, জিম্মাদার হচ্ছে সরকারপ্রধান, কোনমতেই তিনি তার মালিক নন। বিদেশি রাষ্ট্র যখন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানকে কোনো উপহার দেয়, যেমন দরিদ্র নারী ও শিশুর অবস্থার উন্নয়নে বা এতিমদের শিা, খাদ্য, আশ্রয়ের উন্নয়নে কোনো দান, গ্রান্ট বা ডোনেশন দেয়, তখন সে অর্থ কোনোভাবেই কোনো ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপ্রধান সে উপহার, উপঢৌকন, গ্রান্ট, ডোনেশন নিজের মালিকানায় নিয়ে নিজ পরিবারের জন্য ব্যয় করতে পারেন না। এমন ক’টি দেশ আছে যে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান বেতন গ্রহণ করেন না? বঙ্গবন্ধু ৭২-এ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, সরকারপ্রধান হয়ে বেতন গ্রহণ করেননি। বঙ্গবন্ধু যখন আমলা, পেশাজীবীদের বলেন, ‘কে আপনাদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিবিদ, প্রশাসক বানিয়েছেন? সে তো এই দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক’Ñ তখন গণতন্ত্রের মৌলিক সৌন্দর্যটি বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করতে আমরা দেখতে পাই। উপরোক্ত রীতিগুলোই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যেমন সংসদে রাষ্ট্রের ও জাতির কল্যাণকর যেকোনো সরকারি প্রস্তাবে বিরোধী দল ঐকমত্য পোষণ করবে। খালেদা-নেতৃত্বের বিরোধী দল প্রত্যেকবার দেশ ও জাতির কল্যাণকে মোটেও বিবেচনা না করে সংসদের ফাইল, কাগজপত্র ছুঁড়ে মারাকে নিয়মে পরিণত করেছিল। দিনের পর দিন সংসদে অনুপস্থিত থেকে গণতন্ত্রকে অর্থহীন করার প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন খালেদা জিয়া। সংসদ, গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ এবং নিজেকে সংসদের ওপরে গণ্য করে আত্মম্ভরিতা প্রকাশ করেছেন। খালেদা কখনও ওই দরিদ্র নারী, পুরুষ ভোটারদের মানুষ গণ্য করেননি। কেননা ভুয়া ভোটার, জালভোট, সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপর হামলা, নির্যাতন করে ভোটদানে বাধা দান করাকে নিয়ম মনে করেন তিনি। সর্বোপরি বিদেশি রাষ্ট্রের সাহায্যে খালেদা মতায় আসায় বিশ্বাসী ছিলেন, এখনও আছেন, যা গণতন্ত্র থেকে বহুদূরে স্বৈরতন্ত্রের রীতি-নীতির সঙ্গে মিলে যায়।
খালেদা জিয়ার পে গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের পার্থক্য অনুধাবন অসম্ভব। কেননা রাজনীতিতে নেমে তিনি সব সময় রাষ্ট্রমতায় আসীন থাকবেন, কখনও রাষ্ট্রমতার বাইরে থাকবেন না এই ধারণায় বিশ্বাসী। আইএসআই, সিআইএ, জঙ্গি মৌলবাদী দল, যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবিরের সহায়তায় তিনি সব সময় মতায় থাকবেন এই বিশ্বাসে রাজনীতির চর্চা করেছেন। তার অনুসরণে বিএনপি নেতারা এখন, এই যুগে বিদেশিদের কাছে অনুযোগ জানাচ্ছেন, সেটাও অস্বাভাবিক। তারা সরকারের সঙ্গে, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যুক্তিযুক্ত কিছু প্রস্তাব থেকে থাকলে সেসব আলোচনা করতে পারেন। পৃথিবীর অন্য দেশে কোনো বিরোধী দলকে বিদেশী কূটনীতিকদের কাছে নিজ দেশের সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে কখনও দেখা যায়নি। এমনকি, পাকিস্তানে নানারকম অরাজনৈতিক কা-কারখানা ঘটার পরও সেদেশের রাজনীতিকরা আদালতে গেছেন অথবা জনসভায় জনগণকে অন্যায় সম্পর্কে জানিয়েছেন, কিন্তু বিদেশি কূটনীতিকদের কছে যাননি।
জনগণ যদি ২০০৯-এর ২৪, ২৫ ফেব্রুয়ারির বিডিআর বিদ্রোহ এবং ২০০৪-এর ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলা এ দুটি জাতিবিরোধী চরম বর্বর ঘটনার কথা স্মরণ করে, তাহলে প্রথমটিকে মুক্তিযুদ্ধপন্থি সরকার পতনের ল্েয প্রথম বিশাল মাপের একটি রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ বলে গণ্য করতে হবে। তখন জনগণের মনে প্রশ্ন উঠেছিল, কেন এ ঘটনায় ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হলো, যারা ছিল মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অথবা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী। দ্বিতীয়, এর ফলে যদি সরকার পতন হতো তাহলে মুক্তিযুদ্ধপন্থি মহাজোটের পতনের প্রধান সুবিধাভোগী কে বা কারা হতো? অবশ্যই খালেদা-তারেকের বিএনপি এবং তাদের মিত্র যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াত। এটিকে একটি গণহত্যা গণ্য করা যায়, যার পরিকল্পকদের অনেকে বিচারের বাইরে থেকে গেছে। যারাই করুক তারা গণতন্ত্রের শত্রু, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
তৃতীয়, ২০০৪-এর ২১ আগস্টে আরেকটি গণহত্যার পরিকল্পনা, যেটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দলনেত্রী শেখ হাসিনা ও অন্য প্রধান নেতা-নেত্রীদের হত্যা করে দেশ থেকে আওয়ামী লীগ নির্মূল করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ যারা এ পরিকল্পনার পরিকল্পক ও বাস্তবায়নকারী তারা গণতন্ত্রবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা অবশ্যই এ পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন আর তার পুত্র তারেক, যুদ্ধাপরাধী মুজাহিদ, বাবর, ডিজিএফআই, এনএসআই, হরকাতুল জিহাদ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। একটি রাজনৈতিক দল যখন অপর একটি দলকে হত্যার মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করতে চায়, তারা গণতন্ত্রকে কেয়ার করে না, তা প্রমাণিত হয়। এর আগে-পরে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে বহু নেতাকর্মী হত্যা করা হয়েছে। যার বলি হয়েছেন শাহ কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টার, মমতাজ উদ্দীন, হুমায়ুন কবির বালুসহ বিশ হাজারের বেশি নেতাকর্মী ও সমর্থক। বিএনপি দলটি দুই চরম গণতন্ত্রবিরোধী স্বৈরতন্ত্রী নেত্রী ও নেতার নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়ায় এটিকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল গণ্য করা যায় না। খালেদা জিয়া আদালতকে অসম্মানিত করে বলেছেন, তিনি এখানে আসবেন না, এ আদালতে ন্যায়বিচার পাবেন না, আদালত যা ইচ্ছা তাকে শাস্তি দিয়ে দিক। অত বড় স্বৈরাচার পিনোচেটও এমন কথা বলার কল্পনা করেননি। এরশাদও এমন দাম্ভিক বক্তব্য দেননি। আইন ও আদালতের প্রতি সামান্য সম্মানবোধ থাকলে এমন মন্তব্য করা যেত না। খালেদা জিয়ার এ জ্ঞান ও বোধ নেই। কারান্তরীণ হয়েও দাম্ভিকতা, আইন-আদালত, গণতন্ত্রকে উড়িয়ে দেয়া তার মন্তব্য কি আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হবার নয়?
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা সংঘটিত হতে দেয়ার দায়ে হত্যা মামলা হতে পারে বলে অভিজ্ঞজনেরা মনে করেন। তাছাড়া তার আইন-আদালতকে অবজ্ঞা করে বক্তব্য দেয়ার দায়ে আদালত অবমাননার মামলাও হতে পারে। তার বক্তব্য এই নির্দেশ করে যে, এখনও খালেদা জিয়া ধরাকে সরা জ্ঞান করেন এবং নিজেকে রাষ্ট্র, সংসদ, সরকার, আইন-আদালত, সর্বোপরি জনগণের অনেক ওপরে অবস্থানকারী হিসেবে মনে করেন এবং বিশ্বাস করেন জনমানুষের তৈরি আইন-আদালত তাকে বিচার করার মতা রাখে না।