রাজনীতি

খালেদা জিয়া- যিনি অসুস্থতার কারণে কোর্টে যেতে পারেন না তিনি দেশ চালাবেন কিভাবে?

হাফিজ আহমেদ
দেশের অনেক সাধারণ মানুষের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থতার ভান করছেন। তাই সরকার কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সুপ্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে উন্নতমানের আধুনিক চিকিৎসা দিতে চাইলেও তিনি তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, তার দুর্নীতির কাহিনি আছে। অসুস্থতার ভান করে কোর্টে হাজিরা দেন না। হাজিরা দিলেই ধরা খাবে। সে জন্যই হাজিরা দেয় না, এটা হলো বাস্তবতা।
গণভবনে আওয়ামী লীগের এক বিশেষ বর্ধিত সভায় সম্প্রতি এ কথা বলেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়াÑ যিনি অসুস্থতার কারণে কোর্টে যেতে পারেন না তিনি দেশ চালাবেন কিভাবে?
সম্প্রতি জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার অন্যতম আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্নার পে আংশিক যুক্তিতর্ক হয়। এরপর বিচারক কয়েকটি তারিখ রাখলেও খালেদা জিয়াকে হাজির করা হয়নি। খালেদা জিয়ার এই অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে ওই সন্দেহ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তারিখ নির্ধারণ হলেই খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে স্যা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এজেন্টরা বাংলাদেশে আসবেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
সরকারপ্রধান বলেন, অসুখ তো তার আছেই। হার্টের অপারেশন করে আসছে, অনেক কিছু করে আসছে। মতায় থাকতে আমেরিকায় গিয়ে চিকিৎসা করে আসছে, সৌদিতে চিকিৎসা আমরা দেখেছি। কিন্তু কোর্টে হাজিরা দিতে পারবে না, এমন তো অবস্থা না। কিন্তু সেটা করছে। কেন? কারণ, আমেরিকার এফবিআইয়ের লোকজন স্যা দেয়ার জন্য বসে আছে। তারিখ পেলেই তারা চলে আসবে।
শেখ হাসিনা বলেন, শাস্তি হয়েছে, জেলে গেছে। এখানে তো আমাদের কোনো দায় নেই। ১০ বছর ধরে মামলা চলেছে। বিএনপির যারা আইনজীবী… এত জাঁদরেল-জাঁদরেল আইনজীবী, তারা কী করল? তারা তো ব্যর্থ হয়েছে। খালেদা জিয়া দুর্নীতি করেনি, এটা তো তারা প্রমাণ করতে পারেনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এভাবে কেউ এতিমের টাকা চুরি করে খেতে পারে? এটা কেউ পারে না। অথচ এতিমখানার জন্য টাকা এনে, সেই টাকা কিভাবে নয়ছয় করেছে, আপনারা সেটা দেখেছেন।
বর্ধিত সভায় উপস্থিত আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, আমরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বিশ্ব সমর্থন অর্জন করেছি। এই সমর্থন নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।
আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের আগামী সাধারণ নির্বাচনের জন্য ভোট চাইতে এখন থেকেই মানুষের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগই দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে, তাদের কল্যাণের জন্য কাজ করে। মানুষ কিন্তু ভুলে যায়। এ জন্য আমাদের উন্নয়ন দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে, তাদের বোঝাতে হবে, তাদের কাছে বারবার যেতে হবে।
সরকারপ্রধান বলেন, সামনে নির্বাচন। এই নির্বাচন কঠিন হবে। নির্বাচনে জয়ী না হলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার থেমে যাবে। দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাবে। সামাজিক নিরাপত্তার জন্য যেসব কর্মসূচি চলছে, তা বন্ধ হয়ে যাবে। উন্নয়নকাজ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই সব দ্বন্দ্ব নিরসন করে স্থানীয়ভাবে দলের জন্য কাজ করতে হবে।
খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের পর বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, কারাবন্দি বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ। দ্রুত চিকিৎসা করা না হলে তিনি পঙ্গু হয়ে যেতে পারেন, দৃষ্টিহীন হয়ে যেতে পারেন। সরকার চায় তিনি পঙ্গু হয়ে যান, দৃষ্টিহীন হয়ে যান।
নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা রাজনীতি করি। আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারি, কিন্তু শত্র“ তো নই। সরকার যেভাবে খালেদা জিয়ার সঙ্গে আচরণ করছে তা কোনোভাবে আশা করা যায় না। খালেদা জিয়াকে আপনারা ভয় পান বলেই এসব করছেন। কারণ তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী। তাকে মুক্ত করে আনার জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় না হলে আমরা অন্য পন্থায় যাবো। আর সে পন্থা হবে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক আন্দোলন।
নজরুল ইসলাম আরো বলেন, আমরা খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই। তাকে মুক্ত করার জন্য যা করা প্রয়োজন আমাদের তাই করতে হবে। তিনি বলেন, দেশের সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে সরকার। গণতন্ত্র শেষ, বিচার বিভাগ শেষ, পার্লামেন্ট আগে থেকেই নেই। শেয়ারবাজার, ব্যাংক লুট করেছে। এসবের বিরুদ্ধে বেগম খালেদা জিয়া আন্দোলন করছিলেন বলেই তাকে কারাগারে বন্দি করা হয়েছে। একটি পরিত্যক্ত কারাগারে বন্দি তিনি। সে কারাগারে আর কোনো কয়েদি নেই। তিনি অসুস্থ। তাকে বিশেষায়িত হাসপাতালে নেয়ার সুপারিশ করেছিল ডাক্তারেরা। কিন্তু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়নি। চিকিৎসা দেয়া হয়নি।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে নজরুল ইসলাম বলেন, আমাদের শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আমরা আইয়ুব খান এবং ইয়াহিয়া খানের পতন ঘটিয়েছি। কিন্তু আজ আমাদের প্রতিপ শক্তিশালী। যারা ১৯৭৫ সালে গণতন্ত্র হরণ করেছিল এবং ১৯৮২ সালে যারা গণতন্ত্র হরণ করেছিল তারা এক হয়েছে। তাদের পতন ঘটাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী যে মন্তব্যই করুন আর নজরুল ইসলাম যা-ই বলুন, বাস্তবতা হলো খালেদা জিয়া অসুস্থ। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ দেশে-বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে আসছেন। ৭৫ বছর বয়সী একজন মানুষ অসুস্থ হতেই পারেন। সে জন্য তার চিকিৎসা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকার ও বিএনপিÑ উভয় পক্ষকেই আন্তরিক হতে হবে।
এদিকে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও তার চিকিৎসাকেন্দ্রিক আলোচনায় বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে অসুস্থতার জন্য খালেদা জিয়া কোর্টেই যেতে পারেন না, তাহলে তিনি দেশ চালাবেন কিভাবে? এটিও একটি সত্য কথা। বয়সের ভারে ন্যুব্জ খালেদা জিয়া এখনও বিএনপিপ্রধান। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তিনিই হবেন প্রধানমন্ত্রী। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে দেশ চালাবেন কিভাবে?
শাসকদল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছেন, বিএনপির সবকিছুই খালেদা জিয়াকে ঘিরে। অথচ খালেদা জিয়া অসুস্থতার জন্য কোর্টেই যেতে পারেন না। এই তিনিই যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান, তাহলে দেশে নেতৃত্বের যে সংকট তৈরি হবে তা দেশকেই সামাল দিতে হবে। এমনকি দেশের আমজনতা হিসেবে চিহ্নিত অনেক সাধারণ মানুষকেই এখন এই কথাটিই বলতে শোনা যাচ্ছে যে, অসুস্থ খালেদা জিয়ার পক্ষে আর দেশ চালানো সম্ভব নয়।