অর্থনীতি

ডিএসই’র কৌশলগত অংশীদার চীনা কোম্পানি : বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে নতুন সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
চীন এখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কৌশলগত অংশীদার। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড কৌশলগত অংশীদারের কাছে শেয়ার হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ ডিমিউচুয়াইজেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচনা করেছে। ব্লক অ্যাকাউন্টে থাকা ২৫ শতাংশ শেয়ারের দাম হিসেবে ১০ সেপ্টেম্বর প্রায় ৯৬২ কোটি টাকা বুঝে পেয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর শেনঝেন সাংহাই কনসোর্টিয়ামের অনুকূলে শেয়ার হস্তান্তর করেছে ডিএসই।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে চীন বড় অংকের বিনিয়োগ করায় অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের পুঁজিবাজারে নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ডিএসইতে এই প্রথম কোনো বিদেশি রাষ্ট্র বড় বিনিয়োগ নিয়ে আসায় আশা করা যায়, শিগগিরই অন্যান্য দেশ বিশেষ করে ভারত বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য আসবে।
বিদেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে আসায় ইতোমধ্যেই বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পুরনো বিনিয়োগকারীরা ফিরে আসছেন। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও নড়েচড়ে বসেছেন। মোট কথা ডিএসসিতে বিদেশি বিনিয়োগ আসায় পুঁজিবাজারে সময়ে সময়ে যে অস্থিরতা দেখা দেয়, তার অনেকটা নিরসন হবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে ডিএসই। সেখানে এক্সচেঞ্জটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ছাড়াও চীনা কনসোর্টিয়ামের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। স্বাগত বক্তব্যে ডিএসই চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল হাশেম বলেন, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দুটি স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে এ কৌশলগত অংশীদারিত্ব ডিএসইকে একটি আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজার হওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এ এম মাজেদুর রহমান জানান, কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে পাওয়া ৯৬২ কোটি টাকার মধ্যে স্ট্যাম্প ডিউটি হিসেবে ১৫ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে জমা হচ্ছে। বাকি ৯৪৭ কোটি টাকার মালিক ডিএসইর সদস্যগণ। দ্রুতই এ অর্থ তাদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হবে।
কনসোর্টিয়ামের প্রতিনিধি হিসেবে এরই মধ্যে ডিএসইর পর্ষদে যোগ দিয়েছেন শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জের টেকনোলজি ম্যানেজমেন্ট কমিটির উপ-মহাপরিচালক শি ওয়েনহাই।
অর্থনৈতিক ও পুঁজিবাজার সম্পর্কিত বিষয়গুলোয় দুই দেশের সম্পর্কের নানা দিক উল্লেখ করার পাশাপাশি তিনি বলেন, কনসোর্টিয়াম ডিএসইর কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কি ভূমিকা রাখতে চায় তার বিস্তারিত শেয়ার ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বর্তমানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ে গভীর গবেষণা ও পর্যবেণ করছে কনসোর্টিয়াম। এর আলোকে পারস্পরিক সহযোগিতা ও পরামর্শের ভিত্তিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবেন তারা।
চীনা কনসোর্টিয়ামের অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বমানের তথ্যপ্রবাহ, ফাইলিং ও ডিসকোজার নিশ্চিত করা, স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেডিং সিস্টেম থেকে শুরু করে সার্বিক প্রযুক্তি অবকাঠামোর উন্নয়ন, কার্যকর সার্ভিল্যান্স সিস্টেম প্রবর্তন এবং আধুনিক ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মতো মানবসম্পদ উন্নয়ন তাদের প্রাথমিক অগ্রাধিকার। এছাড়া ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজ ও অন্যান্য পণ্যের প্রচলন, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবসা উন্নয়ন, তালিকাভুক্তি ও বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়গুলোতেও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখবে কনসোর্টিয়াম।
‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সম্ভাবনা অপার, তবে চ্যালেঞ্জও অনেক’ উল্লেখ করে কনসোর্টিয়ামের আরেক প্রতিনিধি লিউ ফুঝং জানান, চীনের তহবিল ব্যবস্থাপকরা বাংলাদেশের বাজারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এেেত্র সেতুবন্ধনের জন্য প্রাথমিক গ্রাউন্ড ওয়ার্কগুলো করছে কনসোর্টিয়াম।
কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রতিটি ধাপে সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য দুই দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপসহ সব পকে ধন্যবাদ জানান বক্তারা।
অনুষ্ঠানে ডিএসইর পর্ষদ সদস্যদের মধ্যে বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান মিয়া, শরীফ আতাউর রহমান, রকিবুর রহমান, মিনহাজ মান্নান ইমন, হানিফ ভুইয়া উপস্থিত ছিলেন। চীনা প্রতিনিধিদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট বিভাগের উপ পরিচালক ইয়াং জিনঝং ও লি কিংইয়ু।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১৪ মে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ডিএসইর ২৫ শতাংশ শেয়ার কিনতে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বার করে শেনঝেন-সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের সম্মিলিত কনসোর্টিয়াম। গত ২৬ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ডিএসইর কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চীনা কনসোর্টিয়ামকে নন রেসিডেন্ট ইনভেস্টরস টাকা অ্যাকাউন্টের (নিটা) মাধ্যমে বাংলাদেশে টাকা পাঠানোর অনুমতি দেয়। এরপর গত ৩ সেপ্টেম্বর ব্যাংকিং চ্যানেলে সব অর্থ ডিএসইর অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার পর ১১ সেপ্টেম্বর কনসোর্টিয়ামের বিও হিসাবে ২৫ শতাংশ শেয়ার জমা করে ডিএসই। এদিকে, ডিএসইর শেয়ার বিক্রি করে পাওয়া ৯৪৭ কোটি টাকার ওপর উদ্ভূত মূলধনি মুনাফায় ১৫ শতাংশ হারে ১৪২ কোটি টাকার ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স দিতে হবে ডিএসইর শেয়ারহোল্ডারদের।
প্রসঙ্গত, এ বছরের ৬ ফেব্র“য়ারি কৌশলগত অংশীদারদের প্রস্তাব সম্বলিত টেন্ডার বক্স উন্মোচন করে ডিএসই। দরপত্র প্রক্রিয়ায় কৌশলগত অংশীদারের জন্য সংরতি ডিএসইর ১৮০ কোটি ৩৭ লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ শেয়ারের এক-চতুর্থাংশ বা ৪৫ কোটি ৯ লাখ ৪৪ হাজার ১২৫টি শেয়ার কিনতে দুটি কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব জমা হয়। এর মধ্যে শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের চীনা কনসোর্টিয়াম ডিএসইর প্রতি শেয়ারের জন্য ২২ টাকা হারে ৯৯২ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব করে। এর বাইরে তারা ডিএসইকে বিনামূল্যে বিভিন্ন কারিগরী ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, যার মূল্য উল্লে­খ করা হয় ৩০৮ কোটি টাকা। তবে মধ্যবর্তী সময়ে সর্বশেষ হিসাব বছরের জন্য বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশ দেয়ায় ডিএসইর প্রতিটি শেয়ারের ভ্যালুয়েশন ১ টাকা কমে যায়, যা চূড়ান্ত শেয়ার ক্রয় চুক্তিতে (এসপিএ) সমন্বয় করা হয়।
চীনা কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাবিত কারিগরি সহায়তার জন্য ১০ বছরের লাইসেন্স এবং ৩ বছরের ট্রেনিং ও কনসাল্টিং সার্ভিস সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেবে কনসোর্টিয়াম। এর বাইরে আরো বেশ কিছু নতুন পণ্য প্রচলন ও বাজার উন্নয়নে পদপে নেয়ারও প্রস্তাব দিয়েছে চীনা এ প্রতিষ্ঠানটি।