কলাম

নেতৃত্বে জননেত্রী শেখ হাসিনা : প্রসঙ্গ জনপ্রিয়তা

ড. অরুণ কুমার গোস্বামী
পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবী মহলের সাম্প্রতিকতম উপলব্ধি হলো তাদের দেশের (পাকিস্তান) উচিত বাংলাদেশকে অনুসরণ করা। যেখানে রাষ্ট্র থাকবে ধর্ম থেকে আলাদা এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সব মানুষকে সমান গুরুত্ব দেয়া হবে।
বাংলাদেশের এই অভাবনীয় উন্নতি সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কারণে। পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবীদের এমন উপলব্ধি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আমরা যারা বাংলাদেশে আছি তারা জানি, নিজের মাতৃভূমির উন্নতিতে অনেক বাংলাদেশিই খুশি হতে পারছে না। স্বাধীন বাংলাদেশে অবস্থানকারী পাকিস্তানি আদর্শের অনুসারীদের পরিবর্তিত হওয়া এখন সময়ের দাবি। নয় কি? পাশাপাশি, যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে সেই মহান আদর্শের নাম ব্যবহার করে যারা প্রতারণা ও জালিয়াতি করেছে এবং এখনো করছে তাদের চিহ্নিত করাও এখন সময়ের প্রয়োজন। এ ধরনের বাংলাদেশিরা বাংলাদেশে বসবাসকারী ছদ্মবেশী পাকিস্তানি। এদের অন্তরে পাকিস্তান, বাইরে বাংলাদেশ।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ছদ্মবেশী ও প্রকাশ্য পাকিস্তানপ্রেমীদের জন্য সাম্প্রতিক একটি জরিপের ফলাফল উল্লেখ করা যেতে পারে। এই জরিপে দেখা যাচ্ছে দেশের ৬৬ শতাংশ নাগরিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ দলটির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন দেশের শতকরা ৬৪ জন নাগরিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনস্থ ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট-এর পক্ষে সেন্টার ফর ইনসাইটস ইন সার্ভে রিসার্চ এবং ক্রিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কর্তৃক সম্পন্নকৃত ঘধঃরড়হধষ ঝঁৎাবু ড়ভ ইধহমষধফবংযর চঁনষরপ ঙঢ়রহরড়হ শীর্ষক এই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে এ মাসের (সেপ্টেম্বর ২০১৮) ৫ তারিখে। এবছরেরই এপ্রিল ১০ থেকে ২১ মে পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশের ৮টি বিভাগ এবং ৬৪টি জেলায় মাল্টিস্টেজ স্ট্রাটিফাইড নমুনার ভিত্তিতে ইন-পার্সন, ইন-হোম সাক্ষাতকারের মাধ্যমে এই জরিপটি করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে শেখ হাসিনার প্রতি এদেশের মানুষের এই সমর্থনের কারণ কী? এর উত্তর যদি হয় ‘দেশের উন্নয়ন এবং জনগণের কল্যাণ’ তাহলে সাথে সাথে আর একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে তা হলো এই অবিস্মরণীয় উন্নয়নই বা তিনি কিভাবে সম্ভব করে তুলেছেন? ষড়যন্ত্র এবং জীবনের ঝুঁকি সত্ত্বেও তিনি কিভাবে বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলছেন?
বাবা-মা, ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, গুণগ্রাহী সবাইকে রেখে বোন শেখ রেহানাসহ গিয়েছিলেন জার্মানিতে। কিছুদিন পরেই জানতে পারেন যাদের তিনি রেখে গিয়েছিলেন তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সমগ্র বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির জন্য এক শোকাবহ দিন। এদিন শুধু ক্ষমতা নয় সমগ্র বাংলাদেশটাকেই পাকিস্তানিকরণের প্রচেষ্টা শুরু হয়। তারপর তিনি যাতে দেশে ফিরতে না পারেন তার জন্য সেসময়ের সামরিক একনায়ক জিয়াউর রহমান সব ধরনের চেষ্টা করেছে। ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ স্বদেশে তিনি যেদিন দিল্লি থেকে ফিরে এসেছিলেন সেসময় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ছাত্র ছিলাম। সংগঠনের পক্ষ থেকে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল। পরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের পাশে মিরপুর রোডে তাঁকে নেতাকর্মীদের নিয়ে মিলাদ পড়তে হয়েছে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকাকালে প্রায় ২২ বার তাঁকে হত্যার চেষ্টা ও ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।
অতএব, শেখ হাসিনা অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এই পর্যন্ত এসেছেন এবং দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর জন্য এ বিষয়টি ‘আসলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন’ এমন ছিল না। প্রসঙ্গক্রমে, এই ‘আসা, দেখা এবং জয় করা’ প্রবাদতুল্য কথাটির উৎপত্তির অনুসন্ধানে কিছুটা ব্যাপৃত হওয়া যেতে পারে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিফোর্ড অ্যান্ডো (২০০০) বলছেন (বর্তমানে তুরস্কে অবস্থিত) ‘জাইল’ নামক স্থানে সংঘটিত একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে জয়লাভের পর রোম সম্রাট জুলিয়াস সিজার খ্রিস্টপূর্ব ৪৭ অব্দে রোমান সিনেটের নিকট প্রেরিত এক পত্রে ভিনি, ভিডি, ভিসি বাগধারাটি ব্যবহার করেছিলেন। এর অর্থ হচ্ছে আমি এলাম, দেখলাম এবং জয় করলাম। ‘জাইল’ নামক স্থানে ৪৭ খ্রিস্টপূর্বের আগস্টের ২ তারিখে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এটি ছিল জুলিয়াস সিজারের মাত্র পাঁচ দিনের একটি যুদ্ধাভিযান। জুলিয়াস সিজারের সামরিক ক্যারিয়ারে এটি ছিল একটি মাইলফলক। অন্য জায়গায় বলা হচ্ছে, ১৫০ বছর পরে এই যুদ্ধ জয়ের উদযাপন উপলক্ষে গ্রিক জীবনী লেখক, পুরোহিত, দার্শনিক এবং প্রাবন্ধিক প্লুটার্ক (৪৬ খ্রিস্টাব্দ- ১২০ খ্রিস্টাব্দ) রোমের আমানটিয়াসের নিকট একটি লেখায় বিখ্যাত এই ল্যাটিন শব্দমালা ‘ভিনি, ভিডি, ভিসি’ ব্যবহার করেছিলেন।
দেশের উন্নয়ন ও দেশের জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে দেশরতœ শেখ হাসিনার সফলতা কিন্তু জুলিয়াস সিজারের মতো মাত্র ৫ দিনের কোনো বিষয় নয়। দেশ ও জনগণের উন্নয়নে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সফলতার পিছনে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা কাজ করেছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন ও যৌবনের সবকিছু ত্যাগ করেছেন, কারাবরণ করেছেন, ফাঁসির দ-প্রাপ্ত হয়েছেন। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছেন, বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার দেশ, আমি বাঙালি। ফাঁসি দেয়া হলে মৃতদেহটা প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার অনুরোধ করেছেন তিনি পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের। বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির প্রতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণেই জনগণ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে আপন ইচ্ছায় রাজপথে বেরিয়ে আসত। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আন্তরিকতার প্রতিও এদেশের জনগণের আস্থা প্রমাণিত হয়েছে। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে আইআরআই-এর জরিপের ফলাফলে। তবে ষড়যন্ত্র এখনো বর্তমান সরকার তথা শেখ হাসিনার পিছু ছাড়েনি।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশের রাজনীতির খবর যারা রাখেন তারা নিশ্চই এটি স্বীকার করবেন যে, বর্তমান সরকারের সফলতায় ঈর্ষান্বিত একটি মহল ক্ষমতার লোভে নানা ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এই ষড়যন্ত্রের সাথে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া বার্নিকাটও সম্পৃক্ত।
২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৪ তারিখে বার্নিকাট ঢাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে যোগদান করেছিলেন। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরে এ বছরের আগস্ট মাসের ৩১ তারিখে তাঁর ওয়াশিংটনে রিপোর্ট করার কথা ছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর সাথে বিদায়ী সাক্ষাতের পাশাপাশি বার্নিকাট অন্যদের কাছ থেকেও বিদায় নিয়েছিলেন। ড. ইউনূসের সঙ্গে বার্নিকাট ‘আমেরিকান কাবে’ প্রায় দুই ঘণ্টার ’বিদায়ী সাক্ষাত’ করেছিলেন। এমনকি বার্নিকাটের স্থলাভিষিক্ত হওয়া কূটনীতিকের নামও যথারীতি ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি হচ্ছেন রবার্ট মিলার। কিন্তু হঠাৎ করেই বার্নিকাটের ঢাকার দায়িত্বে থাকার মেয়াদ ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।
সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিগত ৬ মাস যাবৎ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। ইতঃপূর্বে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে বার্নিকাট বিরূপ মন্তব্য করেছেন, ‘ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি ম্যানুয়েল’ ভঙ্গ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সেক্রেটারি ড. বদিউল আলম মজুমদারের মোহাম্মদপুরস্থ বাসভবনে গিয়েছিলেন নৈশভোজের দাওয়াত খেতে। সেখানে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা বার্নিকাটের গাড়িতে আক্রমণ করে। তবে বার্নিকাট অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছেন। কতটুকু সিরিয়াস হলে নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে আক্রমণের মুখে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা অব্যাহত রাখতে পারে, এসব ঘটনা তারই প্রমাণ!
মার্কিন দূতাবাসের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘটনায় বাংলাদেশ পুলিশের তৎপরতার প্রশংসা করা হয়েছে। ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট যখন অজ্ঞাতনামা পাবলিকের ধাওয়া খেলেন, তার মাত্র কয়েকদিন পর প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ঢাকাস্থ প্রতিনিধি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা বরিশালে এক সফরে যেয়ে জনগণের কাছ থেকে বিপুলভাবে সম্বর্ধিত ও আপ্যায়িত হয়েছেন। সফরের সময় হাইকমিশনার বলেছেন, ‘নির্বাচন বাংলাদেশের একটি অভ্যন্তরীণ ব্যাপার!’
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকাকালে দেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর থেকে সবকিছু পাল্টে যেতে থাকে। এরপরে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্য জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর বেশকিছু উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছিল। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়ন এবং তা অব্যাহত রাখার বিষয়টি বাধা-বিপত্তির ‘দুর্গম গিরি’ অতিক্রম করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে চলেছে। সরকারের ৩ বছর পূর্তিতে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ বিষয়টির উল্লেখ লক্ষ্য করা যেতে পারে। শেখ হাসিনা বলেছেন, বিপুল জনসংখ্যার এদেশে সম্পদের পরিমাণ সীমিত। দীর্ঘকাল দেশে কোনো আর্থসামাজিক উন্নয়ন হয়নি। বহু সমস্যা পুঞ্জীভূত হয়ে পাহাড়-সমান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মোকাবিলা করতে হয়েছে অভ্যন্তরীণ বিরুদ্ধ পরিবেশ। বৈশ্বিক বৈরি অর্থনৈতিক অবস্থাও উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বারবার। কিন্তু সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের সর্বজনীন রোল মডেল। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বব্যাংক মডেল হিসেবে বিশ্বব্যাপী উপস্থাপন করছে।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল সেই সময় থেকে বর্তমানের অর্থাৎ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। ‘আজকের বাংলাদেশ আত্মপ্রত্যয়ী বাংলাদেশ।’
বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭.১১%। আগামীতে এই হার ৮% এ পৌঁছাবে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বলে আশা করছে সরকার। অর্থনীতি ও সামাজিক সূচকের অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। দারিদ্র্যের হার ২০০৫-০৬ সালে ছিল ৪১.৫ শতাংশ। এখন তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২২ শতাংশ। অতি দারিদ্র্যের হার ২৪.২৩ থেকে ১২ শতাংশে নেমেছে। ২০২১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৫-১৬ শতাংশে এবং অতি দারিদ্র্যের ৭-৮ শতাংশে নামিয়ে আনা বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। দেশের অর্থনীতি এখন শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
লি কুয়ান ইউর রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে সিঙ্গাপুর ১৯৬৫ সালের ৫১৬ মার্কিন ডলার মাথাপিছু আয় থেকে আজ ৫৬ হাজার ২৮৪ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেশে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৫৪৩ ডলারের মাথাপিছু আয়ের দেশটির মাথাপিছু আয় এখন প্রায় ১ হাজার ৮০০ ডলার। ২০০৫-০৬ সালে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ছিল সাড়ে ৪১ শতাংশ। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৪ শতাংশে। অতি দারিদ্র্যর হার ছিল ২৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ শতাংশে। আর্থসামাজিক উন্নয়নের এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে একটি রোল মডেল হিসেবে গণ্য করা যায়। পাশাপাশি এই
ধারা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য।
লি কুয়ান ইউ’র সিঙ্গাপুর প্রথমে ১৯৬৩ সালে যুক্তরাজ্য থেকে, পরে ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া থেকে স্বাধীন হবার সময়ে এমন কোনো মডেল ছিল না যা লি পরবর্তীকালে তৈরি করেছিলেন। ১৯৫০ এবং ১৯৬০এর দিকে লি শ্রীলঙ্কা থেকে জ্যামাইকা পর্যন্ত সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশসমূহে ভ্রমণ করে সাফল্যের কাহিনি অনুসন্ধান করেছেন। সৌভাগ্যবশত তিনি ভিন্ন মডেল অনুসরণ করেছিলেন। তিনি নেদারল্যান্ডসের নগর পরিকল্পনা এবং ভূমি উদ্ধার, এবং রাজকীয় ডাচ শেল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং উপযুক্ত কৌশল-প্রণয়ন সম্পর্কে অধ্যয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। কৌতুক করে বলা হয় সিঙ্গাপুর হচ্ছে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে ভালোভাবে পরিচালিত একটি কোম্পানি। এটি এমন কেন (?), এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে লি।
নেতৃত্ব সম্পর্কে লি বলছেন, সর্বাধিক দক্ষ নেতা হচ্ছেন তিনি যাকে মানুষ ভয় পায়। (ঞযব সড়ংঃ বভভরপরবহঃ ষবধফবৎ রং ধ ভবধৎবফ ষবধফবৎ.) ইনসেনটিভস-এর গুরুত্ব সম্পর্কে লি কুয়ান ইউ বলছেন, একটি সংগঠন, করপোরেশন অথবা একটি দেশের দীর্ঘ-মেয়াদি সফলতার ক্ষেত্রে একক নির্ধারক উপাদান হচ্ছে সঠিক ইনসেনটিভস প্রদান করা। নেতৃত্বের ভূমিকার কারণেই জনগণ সিস্টেমে কড়াকড়িভাবে কাজ করবে, এবং সেহেতু মানুষের পক্ষে যতটুকু সম্ভব ততটুকু কঠিন করুন। (চঁঃঃরহম ঃযব ৎরমযঃ রহপবহঃরাবং রহ ঢ়ষধপব রং ঞঐঊ ংরহমষব সড়ংঃ রসঢ়ড়ৎঃধহঃ ভধপঃড়ৎ ফবঃবৎসরহরহম ঃযব ষড়হম-ঃবৎস ংঁপপবংং ড়ভ ধহ ড়ৎমধহরুধঃরড়হ, পড়ৎঢ়ড়ৎধঃরড়হ, ড়ৎ ধ পড়ঁহঃৎু. ওঃ রং ঃযব ষবধফবৎংযরঢ়’ং ৎড়ষব ঃড় ধংংঁসব ঃযধঃ ঢ়বড়ঢ়ষব রিষষ মধসব ঃযব ংুংঃবস ৎঁঃযষবংংষু, ধহফ ঃযবৎবভড়ৎব সধশব রঃ ধং যধৎফ ধং যঁসধহষু ঢ়ড়ংংরনষব ঃড় ফড় ঃযধঃ.)
কিভাবে সিঙ্গাপুর স্টাইলে সামর্থ্যরে মধ্যে গৃহায়ণ এবং বিশাল পেনশন ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দরকার সে সম্বন্ধে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রফেসর জোসেফ স্টিগলিৎস ২০১৩ সালে প্রবন্ধ প্রকাশ করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। এছাড়া ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের র‌্যাঙ্ক অনুযায়ী, লি কুয়ান ইউ সিঙ্গাপুরকে টোকিওর পরে, বিশ্বের দ্বিতীয় নিরাপদতম নগরীতে পরিণত করেছিলেন। লি’র মতে এর মূলে আছে ‘আইনশৃঙ্খলা’। তবে লি একটু ঘুরিয়ে বলতেন এবং বুঝতেন। বলতেন ‘প্রথম হচ্ছে শৃঙ্খলা, তারপরে হচ্ছে আইন’ ঙৎফবৎ ভরৎংঃ, ঃযবহ ষধ.ি অবশ্য লি’র মতে শৃঙ্খলা বা অর্ডার হচ্ছে জনগণের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক প্রেডিক্ট্যবিলিটি। ক্যামব্রিজে আইনের ডিগ্রি প্রাপ্ত লি তার রাজনৈতিক জগতে ভবিষ্যতে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে এমন কোনো ব্যক্তিকে আতঙ্কিত করা বা বশে আনার পদক্ষেপ নিতে পিছ পা হতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন যে একটি জটিল বিশ্বে কেউ স্ব-বিরোধিতার ভয়ে ভীত থাকতে পারে না। তার একটি স্মরণীয় কথা হচ্ছে ‘ও ধষধিুং ঃৎরবফ ঃড় নব পড়ৎৎবপঃ, হড়ঃ ঢ়ড়ষরঃরপধষষু পড়ৎৎবপঃ.’
বাংলাদেশও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের আর কোনো দেশ উন্নতির এমন অসাধ্য সাধন করতে পারেনি, যেমন পেরেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতাও এক সময় অসাধ্য ছিল কিন্তু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তা সম্ভব হয়েছে। একটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে, নিম্ন মধ্যম আয়ের পথ পেরিয়ে, বাংলাদেশ এখন ‘উন্নয়নশীল’ রাষ্ট্রের মর্যাদায় আসীন। উন্নত বাংলাদেশে পরিণত হবার দিকে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলার কা-ারি দেশরতœ শেখ হাসিনা।
উপসাগরীয় দেশগুলো সর্বদা সমর-সজ্জিত এবং জঙ্গিবাদের সূতিকাগার, আই এস জঙ্গি তৎপরতায় জর্জরিত এবং সামরিক অভ্যুত্থান এবং তেলের মূল্য পতনের কাছে এগুলো ভঙ্গুর। আফ্রিকাও নানা ধরনের উপজাতীয় সংঘাতে ক্ষত-বিক্ষত। ঔপনিবেশিক শোষণের ক্ষতি সারিয়ে তুলতে আরো অর্ধ-শতাব্দী দরকার হবে আফ্রিকার। উপমহাদেশের মধ্যে পাকিস্তান জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হচ্ছে। ভারত সবেমাত্র ঊর্ধ্বমুখী যাত্রা শুরু করেছে।
আর্থসামাজিক উন্নয়নের অনেক সূচকে বাংলাদেশ ভারতকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। কারণ শুধুমাত্র গড় মাথাপিছু আয়ই একটি দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, স্যানিটেশন প্রভৃতির নিশ্চয়তা দিতে পারে না। বাংলাদেশ এসব সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও এটি বলেছেন। অপর দিকে, বিংশ শতাব্দীব্যাপী শ্রীলংকা ছিল আর্থসামাজিক উন্নতিতে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে। কিন্তু জাতিগত দাঙ্গার ক্ষত এবং অন্যান্য কারণে দেশটি বাংলাদেশের পিছনে পড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান জঙ্গিবাদী কর্মকা- দ্বারা ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ার পথে রয়েছে। পাকিস্তানিরা এখন বাংলাদেশের মতো হতে চায়। আন্তর্জাতিক মহল চেষ্টা করছে এই দুটি রাষ্ট্রকে সুষ্ঠু পথে ফিরিয়ে আনতে। দারিদ্র্যের অভিশাপ ও ভূমিকম্পের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আর একটি ল্যান্ড-লকড দেশ নেপালের আরো সময় প্রয়োজন হবে। নেপাল ও ভূটান অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের উন্নতি এখন বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। বাংলাদেশের এই অভাবনীয় অগ্রগতির মূল কারণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব। লি কুয়ান ইউ ধারাবাহিকভাবে তিন দশক সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে উন্নতির শীর্ষে তাঁর দেশকে পৌঁছে দিয়েছেন। বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য ধারাবাহিকভাবে জননেত্রী শেখ হাসিনার আরো কয়েক মেয়াদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকা প্রয়োজন।
লেখক : চেয়ারম্যান
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ও পরিচালক
সাউথ এশিয়ান স্টাডি সার্কেল
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়