কলাম

বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্যের প্রশ্নে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে যুক্তফ্রন্টের চাপে ফের সংকটে দ্বিধাবিভক্ত বিএনপি

মেহেদী হাসান
একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্যের প্রশ্নে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে যুক্তফ্রন্টের চাপে ফের সংকটে বিএনপি। এতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে বিএনপি। বিকল্পধারা সভাপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাতে বিএনপির যুক্ত হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে জামায়াত। বি. চৌধুরী, ড. কামাল ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার সাফ কথা, এই ঐক্যে জামায়াত থাকতে পারবে না। বিএনপি এখনও এ ব্যাপারে ‘হ্যাঁ’ ‘না’ কোনটিই বলছে না। বিএনপিও মনে-প্রাণে এই ঐক্য চায়, তবে জামায়াতের সঙ্গত্যাগের জন্য প্রকাশ্য শর্ত নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছেন দলটির নীতিনির্ধারক মহল।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট শরিক জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার কথা বলার পাশাপাশি আরও দুটি ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছেন ঐক্যের অন্য উদ্যোক্তারা। বি. চৌধুরীর বিকল্পধারা, আ.স.ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট আগামী নির্বাচনে বিএনপির কাছে ১৫০টি আসনে ছাড় চায়। তারা বলছেন, রাজনীতিতে ভারসাম্য আনতে এবং আগামীতে সরকার গঠন করতে পারলে মতার ভারসাম্য সৃষ্টির ল্েযই তারা আসনের এই সমতা চান।
দ্বিতীয় ইস্যুটি হচ্ছে বর্তমান সরকার বিদায় নিলে নতুন সরকার এসেও যেন স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, বিএনপির কাছে সেই প্রতিশ্রুতি চান অন্যরা। প্রতিশ্রুতি মিললে প্রয়োজনে বিএনপির সাথে লিখিত চুক্তির কথাও ভাবছেন তারা। এ ল্েয তারা উদাহরণ হিসেবে সামনে আনছেন মালয়েশিয়ায় ড. মাহাথির মোহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির কথা। বি. চৌধুরী ইতোমধ্যে মাহাথির-ইব্রাহিমের ওই চুক্তির কপি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।
১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসকাবে নাগরিক ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ইভিএম বর্জন, জাতীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক জোট’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনেই উল্লেখিত দুটি ইস্যুতে এবং জামায়াতকে ছাড়ার কথা বলেন ড. কামালসহ যুক্তফ্রন্টের অন্য নেতারা। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কার্যত এই তিনটি ইস্যুতে মিটমাট হচ্ছে না বলেই বিএনপির সঙ্গে অন্যদের জোড়া লাগছে-লাগছে করেও লাগছে না। বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপ করলে তারা জানান, নিরপে সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিই এখন তাদের কাছে অগ্রাধিকার। তাদের মতে, অন্য ইস্যুকে সামনে এনে ঐক্যের উদ্যোগ যেন বিফলে না যায়।
যুক্তফ্রন্ট চেয়ারম্যান ও বিকল্পধারা সভাপতি অধ্যাপক বি. চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের এক কথা- জামায়াতসহ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কোনো দল বা শক্তি এই ঐক্যে থাকবে না। আমরা চাই ভারসাম্যের রাজনীতি। এজন্য বলছি শুধু বিএনপি কেন, আওয়ামী লীগও যেন ১৫০ আসনের বেশি না পায়। আমরা রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর, মন্ত্রিসভায় এবং সংসদ, বিচারবিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যেও ভারসাম্য দেখতে চাই।
জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া’র আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও ভারসাম্যপূর্ণ মতার ল্েয আমরা শুরু থেকেই জনগণের তথা জাতীয় ঐক্যের কথা বলে আসছি। দলমত নির্বিশেষে এই ঐক্য হতে হবে। এখানে কোনো সাম্প্রদায়িক শক্তি থাকবে না। ঐক্য হতে হবে দেশ ও জনগণের স্বার্থে। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়তে হলে এর ভিত্তি কী হবে, সেই ব্যাপারে ১২ সেপ্টেম্বরের আলোচনা সভায় জেএসডি সভাপতি আ স ম রব বলেছেন, এ সরকারের পতনের জন্য আমরা ঐক্য চাই। তবে আবারও যেন স্বৈরতন্ত্র সৃষ্টি হতে না পারে, সেটাও আমাদের দেখতে হবে।
যুক্তফ্রন্ট নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ‘এরশাদের পতনের পর থেকে আমরা দেখে আসছি যে মতায় গেছে সে-ই স্বৈরাচার হয়েছে। এক স্বৈরাচার গেলে আরেক স্বৈরাচার আসবেÑ এটা বন্ধ করতে হবে। বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাবে ধান, এটা চলতে দেয়া যায় না। রাজনীতি ও মতার ভারসাম্য সৃষ্টি করতে হবে। আমরা স্বৈরাচার ও স্বৈরতন্ত্রমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চাই।’
ঐক্যের ল্েয বিএনপি সাতটি দফা দিয়েছে উল্লেখ করে মান্না বলেন, আমরা যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের কথা বলছি সেখানে জামায়াত থাকতে পারবে না।
জামায়াত নিয়ে আপত্তিসহ অন্যান্য বিষয় প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য চাই। কারাগারে যাবার আগে আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ার ডাক দিয়েছেন। আমাদের প থেকে আমরা বারবার বলেছি, খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে হবে, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মামলা প্রত্যাহার করতে হবে, নিরপে সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙ্গে দিতে হবে, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে এবং নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। বাংলাদেশকে ও দেশের মানুষকে আজকের দুঃশাসন থেকে মুক্ত করা জরুরি। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রা করা জরুরি। এগুলোর ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব।
বিএনপি মহাসচিব অনেক সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করলেও জামায়াত প্রশ্নে কোনো কথা বলেননি। জামায়াত এখন বিএনপির জন্য উভয় সংকটের নাম। বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্য প্রশ্নে জামায়াতকে নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে বিএনপি। তাদের কিছু নেতা এমন মন্তব্যও করেছেন, জাতীয় ঐকমত্যজাতীয় যা কিছুই ঘটুক, জামায়াতকে ছেড়ে দেয়া বিএনপির উচিত হবে না। কারণ জামায়াতের যে ফিক্সড ভোটব্যাংক আছে, জাতীয় ঐকমত্যের ভোটের চেয়ে জামায়াতের ভোটের ওজন অনেক বেশি। জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে যুক্তফ্রন্ট নেতাদের ১৫০ আসন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বদেশ খবরকে বলেন, বিকল্প ধারা, জাসদ (রব) ও কাদের সিদ্দিকীর তিনটি নিশ্চিত আসনের বিপরীতে ১৫০টি আসন দাবি করাটা কোনোভাবেই যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য নয়। বিএনপির ওই নেতা আরো বলেন, জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে এটিও একটি বড় বাধা।