প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও রেল সংযোগের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি : ভারত-বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে অঙ্গীকারবদ্ধ দুই দেশের সরকার

মেজবাহউদ্দিন সাকিল : ভারত ও বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধুত্বকে আরো নিবিড় করার অংশ হিসেবে ১০ সেপ্টেম্বর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি এবং আখাউড়া-আগরতলা রেল প্রকল্পের বাংলাদেশ অংশের কাজের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে সরাসরি অনুষ্ঠানটি প্রচার করা হয়। এ অনুষ্ঠানে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ব্যাপারে একমত হয় দুই দেশ। ভিডিও কনফারেন্সে হাসিনা-মোদির সঙ্গে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও অংশ নেন।
ভিডিও কনফারেন্সে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একই আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আজ থেকে আমরা আরও কাছে এলাম; আমাদের সম্পর্ক আরো গভীর হলো। উভয় নেতা প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে আমাদের সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক বিশ্বে একটি রোল মডেল। বহু বছর ধরে পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধাবোধ এবং সুনামের কারণে আমাদের সম্পর্ক পরিপক্বতা পেয়েছে। এই সুসম্পর্ক আমাদের দৃঢ় আস্থার সঙ্গে পারস্পরিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে। বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমর্থন ও
সহযোগিতা মাইলফলক হয়ে থাকবে। ভারত থেকে অতিরিক্ত আরো ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি আমাদের উন্নয়নে সহযোগিতা করবে। এতে দুই দেশই লাভবান হলো।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার গণভবন থেকে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিল্লি থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি বিষয়ক প্রকল্প, রেলওয়ের কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশন পুনর্বাসন ও আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েল গেজ রেল সংযোগ (বাংলাদেশ অংশ) প্রকল্পের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন।
বাংলাদেশের মানুষকে বাংলায় শুভেচ্ছা জানান নরেন্দ্র মোদি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সুদৃঢ় সম্পর্ক থাকবে বলে জানান তিনি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও নরেন্দ্র মোদিকে শুভেচ্ছা জানান।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, সকলকে বিশেষভাবে বাংলাদেশের ভাই ও বোনেরা নমস্কার গ্রহণ করুন। নতুন প্রকল্পের উদ্বোধন আমাদের দুই দেশের সম্পর্কের নতুন মাত্রা; যা ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় হবে। আমাদের দুই দেশের সম্পর্কের বন্ধন কোনো প্রটোকল মানে না। সম্পর্ক সর্বোচ্চ মানে থাকবে। রেললাইন প্রকল্পের মাধ্যমে এ সম্পর্ক আরও গভীর হোক।
শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ২০ হাজার মেগাওয়াট। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের আরও ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিতে চেয়েছেন। আশা করি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাতে কোনো আপত্তি করবেন না।
শেখ হাসিনা আরো বলেন, বাংলাদেশে প্রতিটি সেক্টরে দ্রুত উন্নয়ন হচ্ছে। আমরা ২০৪১ সাল পর্যন্ত উন্নয়নের ল্যমাত্রা স্থির করে এগিয়ে যাচ্ছি। সে হিসাবে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে। এ বিদ্যুৎ পেলে বাংলাদেশের অনেক সাফল্যগাথার সঙ্গে ভারতের অবদান থাকবে। ভারতের কাছ থেকে নতুন নতুন সহযোগিতার ফলে নতুন নতুন বাতায়ন খুলে যাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্ব অটল থাকবে। এই সহযোগিতার কারণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীসহ সব সংসদ সদস্যকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকার ও সেদেশের জনগণের গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে আমরা সবসময়ই কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। এটি আমাদের সম্পর্কের েেত্র চিরদিনই একটি মাইলফলক হিসেবে বজায় থাকবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যবসাবাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যোগাযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন েেত্র আমাদের দুই দেশের মধ্যে প্রভূত অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ব্লু ইকোনমি, সামুদ্রিক সহযোগিতা, পারমাণবিক শক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, মহাকাশ গবেষণার মতো নতুন নতুন ত্রেগুলোতেও আমরা কাজ শুরু করেছি। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মালামাল পরিবহনের জন্য আমরা ১৯৬৫-পূর্ব রেল সংযোগ পুনরায় চালু করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আমি আশা করি, আমরা শিগগিরই লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় ভারতীয় অর্থায়নে যৌথভাবে ঢাকা ও টঙ্গীর মধ্যে তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়েল গেজ রেললাইন এবং টঙ্গী ও জয়দেবপুরের মধ্যে ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণের ভিত্তিফলক স্থাপন করতে পারবো।
বিদ্যুৎ উন্নয়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ খাত আমাদের দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপীয় সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ভারত থেকে আরও ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। ঢাকায় গণভবন থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, রেলপথ মন্ত্রী মুজিবুল হক, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। নতুন ৫০০ মেগাওয়াট যুক্ত হওয়ার পর ভারত থেকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৬৬০ মেগাওয়াটে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বাংলাদেশকে আরও ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিতে আমরা প্রস্তুত আছি। কেন্দ্রীয় সরকার অনুমতি দিলে আমরা দেব। আগামী জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনার জয় কামনা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তিনি সে সময়ে বাংলাদেশ সফরে আসবেন।
এ সময় ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেবের সঙ্গে বেশ কিছুণ কথোপকথন হয় শেখ হাসিনার। পরস্পরের কুশল বিনিময় ছাড়াও একে অপরকে দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
শেখ হাসিনা মমতাকে বলেন, বাংলাদেশে আবার আসুন বেড়াতে, সেটাই চাই। মমতা বলেন, নিশ্চয় আসব, আপনি জিতুন, নিশ্চয় আসব। মমতা আবার বলেন, আমরা একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করতে চাই। কারণ বাংলাদেশ ভালো থাকলে আমরা ভালো থাকি। আমরা ভালো থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে। সুতরাং দুইদেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাক। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে গানের কয়েকটি লাইনও গেয়ে শোনান মমতা। গানটি ছিল, আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী/ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে/তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।
ত্রিপুরার নতুন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব দায়িত্ব পেয়ে জানিয়েছিলেন তিনি বিদেশ সফরে গেলে প্রথমে বাংলাদেশে আসবেন। বিপ্লবের পূর্বপুরুষ বাংলাদেশের চাঁদপুরের কচুয়া থেকে ত্রিপুরায় গিয়েছিলেন। আর এ কারণে বাংলাদেশের প্রতি তার এক ধরনের টান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিপ্লবকে বলেন, বাংলাদেশে কবে আসবেন?
বিপ্লব বলেন, আসব আপনার কাছে। আমি বলেছিলাম প্রথম আসব আপনার কাছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি আপনার অপোয় আছি।
বিপ্লব বলেন, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আর্থিক যোগসূত্র রয়েছে; যা বহুকাল ধরে চলছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদির স্বপ্ন নর্থ ইস্টকে অষ্টলক্ষ্মীতে তৈরির প্রকল্প বল পাবে। এতে নর্থ ইস্টের জনগণের উন্নয়নের নতুন দিশা পাবে। ত্রিপুরা-আখাউড়া সীমান্তে লোড আনলোডিংয়ে যে বাড়তি খরচ দিতে হয়, তাতে দুই দেশই আর্থিকভাবে লাভবান হবে।
ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা পূরণের জন্য ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা করেছে এবং আশা করছে এ প্রক্রিয়ায় ভারত তাদের পাশে থাকবে। ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্ব চিরস্থায়ী হোক আমরা সেটাই চাই। যার ফলে দুদেশ একসঙ্গে কাজ করে দুদেশের জনগণের উন্নতি সাধন করতে পারবে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার ভাষণে ১৯৬৫ সালের পূর্বে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে বিদ্যমান রেল যোগাযোগ পুনঃস্থাপনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিকল্পনার প্রশংসা করে বলেন, আখাউড়া-আগরতলা রেল কানেকটিভিটির কাজ পুরো হলে আমাদের আন্তঃদেশীয় সংযোগের েেত্র আরেকটি যোগসূত্র স্থাপিত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য যে মহৎ ল্য নির্ধারণ করেছেন-২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তোলা, তার ল্য সফল করার েেত্র আমাদের সহযোগিতা করতে পারাটা একটি গর্বের বিষয়। আমি বিশ্বাস করি যেভাবে আমরা আমাদের সম্পর্ককে দৃঢ় করবো এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে হৃদ্যতা শক্তিশালী করবো, সেভাবেই আমরা সমৃদ্ধির নবদিগন্ত উন্মোচন করতে সম হব।
এরপর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলায় বলেন, আজ থেকে আমরা আরো কাছে এলাম, আমাদের সম্পর্ক আরো গভীর হলো।