কলাম

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিনে…

আব্দুস সালাম বাচ্চু : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
আপনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আশা করি, এ লেখাটা আপনার দৃষ্টিগোচর হবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন সামনে রেখে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আমি সাপ্তাহিক ‘স্বদেশ খবর’ পত্রিকায় একটি কলাম লিখেছিলাম। লেখার শিরোনাম ছিলÑ ‘বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও বুধবার’। দ্বিতীয় লেখার শিরোনাম ছিল, ‘বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার সাথে নিজের একাত্মতা ও কিছু স্মৃতিকথা’। দ্বিতীয় লেখাটি ছাপা হয়েছিল গত ১৩ আগস্ট। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার জন্মদিন। আপনার জন্মদিন সামনে রেখে আজ আবারও লিখছি।
আপনার হয়ত স্মরণে থাকবে, ২০০৪ সালের অক্টোবরের এক সন্ধ্যায় ধানমন্ডি ৩ নম্বর সড়কে আওয়ামী লীগ অফিসে নিজ হাতে আমার গ্রন্থনায় তৈরি ঐতিহাসিক বুধবার ও একটি ক্যালেন্ডার আপনাকে দিয়েছিলাম। এ বিষয়টি নিয়ে আমি আপনার সঙ্গে মোট তিনবার মোবাইল ফোনে কথাও বলেছি। যখন আমার তৈরি ‘ক্যালেন্ডার ও বুধবার’ লেখার কথা উল্লেখ করে ফোনে আমার পরিচয় দিতাম, ‘আমি আব্দুস সালাম বাচ্চু বলছি’Ñ প্রতিবারই আপনি বলতেন, ‘আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি’। আমি ভীষণ আনন্দিত হই এই কারণে যে, আপনি একজন সুন্দর মনের বড় মাপের মানুষ বলে আমার মতো সামান্য সতীর্থকেও দীর্ঘদিন মনে রেখেছেন।
এই অবসরে আপনাকে জানাতে চাই, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে যখন হানাদার পাক সেনারা বঙ্গবন্ধুকে আটক করে পাকিস্তান নিয়ে যায় সেই দিন তাঁর জন্য আমি দু’টি রোজা মানত করেছিলাম। বঙ্গবন্ধু যদি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন, আমি তাঁর জন্য দু’টি রোজা রাখব। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এলে আমি দু’টি রোজা আদায় করেছি। আমার ধারণা, আল্লাহপাক বঙ্গবন্ধুকে সৃষ্টিই করেছিলেন বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টি করার জন্য। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপারটি হলো এই যে, ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিবসটি আল্লাহর অসীম রহমতে বুধবার হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনটি বুধবার না হয়ে অন্য কোনো বারও তো হতে পারত! আমার ধারণা, আল্লাহপাক বঙ্গবন্ধুকে সৃষ্টি করেন বাংলাদেশ নামের বদ্বীপকে স্বাধীন করার জন্য। বঙ্গবন্ধু অসম্ভবকে সম্ভব করে দিয়েছেন। একদিন গভীর রাতে, আমার মনে কৌতূহল জাগেÑ বঙ্গবন্ধু ও বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ-দৌলার জন্মদিনটি কোন বার ছিল? এ তথ্য জানার জন্যই আমি দীর্ঘ পরিশ্রম শেষে সাড়ে তিনশ’ বছরের ক্যালেন্ডার তৈরি করি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ও আমাকে অনেক চড়াই-উতরাই পার হতে হচ্ছে। আপনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, আমি মনে করি, অল্প কথাতে বিস্তারিত বুঝতে আপনার কষ্ট হবে না। অনেক কথাই বলার ছিল, কিন্তু কিছু সীমাবদ্ধতার জন্য আমি তা উল্লেখ করতে পারছি না। আমার দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আমার নামে একাধিকবার মিথ্যা মামলা দিয়েছিল কোনো এক ব্যক্তি। আমি প্রায় দুই মাস বাড়িছাড়া ছিলাম। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যক্তি আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সাক্ষ্যপ্রমাণে ব্যর্থ হন।
এবার মূল বক্তব্যে আসি। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করেছিল বিএনপি। এর আগে ২০০৬ সালে বর্তমান মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের দল ওয়ার্কাস পার্টি ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিকে বিএনপির জোটে নেয়ার জন্য খালেদা জিয়ার মন্ত্রীরা অনেক তদবির করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত দু’টি দলই আওয়ামী লীগের সাথে জোট করে। জিয়া হত্যাকা-ের পর এরশাদ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন। ক্ষমতা দখল করার পর এরশাদ জিয়া পরিবারের নামে ক্যান্টনমেন্টে প্রায় ৯ বিঘার মতো সম্পত্তি দান করেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর, এমনকি বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ হত্যার পরও তাঁদের পরিবারের নামে কোনো রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী কাউকে ওই পরিমাণ সম্পত্তির এক শতাংশও দান করেননি।
১৯৭২ সালে পাকিস্তান কারাগার থেকে যখন বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে আসেন তার পূর্বে পাকিস্তানের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পেছনে আপনারও অবদান আছে’। বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন তার পূর্বে ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘প্লিজ পাকিস্তানের সাথে কিছু একটা লিংক রাখবেন।’ বঙ্গবন্ধু ভুট্টোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে গিয়ে এ কথার উত্তর আপনাকে জানাব।’ তাঁদের মধ্যকার কথোপকথনের এই বইটি আমার সযতœ সংগ্রহে আছে।
বঙ্গবন্ধু যদি তাঁর স্বার্থের জন্য প্রয়াত রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানের সাথে গোপনে হাত মেলাতেন তাহলে কোনোদিন বাংলাদেশের জন্ম হতো না। এই ধরনের প্রস্তাব গোপনে বঙ্গবন্ধুকে অনেক দেয়া হয়েছিল। তাহলে বঙ্গবন্ধুর দেশ-বিদেশে বাড়ি গাড়ির অভাব হতো না। তৎকালীন পাকিস্তান আমলে বাঙালি একজনই সর্বোচ্চ সেনা কর্মকর্তা ছিলেনÑ তার নাম মেজর জেনারেল মাজেদুল ইসলাম (মজিদ)। তিনি যদি পাকিস্তানি হতেন তাহলে অনেক পূর্বেই সেনাবাহিনীর প্রধান হতেন। পাকিস্তান আমলে ১০ ভাগ বাঙালিও তার নাম জানতো বলে আমার মনে হয় না। স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম সেনাপ্রধান হন মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ। তারপর হতে এই পর্যন্ত কতজন জেনারেল অবসর নিয়েছেন। ২০ ভাগ মানুষও তাদের নাম বলতে পারবে না। এই সমস্ত জেনারেল রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী যারা হয়েছেন বঙ্গবন্ধুর অবদানে হয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতারা পাঁচটি অসত্য কথা বললে বিএনপি নেতারা পঞ্চাশটি মিথ্যা বলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পাকিস্তানিরা আমাদের সবদিক দিয়ে নির্যাতন করত। পাকিস্তান আমলে বাঙালিদের শতকরা ৯০ ভাগ পিওন, চাপরাশি এবং সর্বোচ্চ কেরানির পদে চাকরি করতেন। পাকিস্তানিরা বেশিরভাগ সচিব, চেয়ারম্যান, ডাইরেক্টর ও জেনারেল ম্যানেজার পদে চাকরি পেতেন। সেই কাহিনি লিখে শেষ করা যাবে না। প্রায় ৭১ বছর পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছে। বার বার সেনাবাহিনী অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসে। বেশ কিছু ভদ্রবেশী বাঙালি ভাই পাকিস্তানের জন্য এখনও মায়াকান্না করে থাকেন। আমি বিনয়ের সাথে এরশাদ সাহেবকে প্রশ্ন করতে চাই, কী কারণে আপনি জিয়া পরিবারকে প্রায় ৯ বিঘা সম্পত্তি দান করেছেন? আপনি নিজেই নিজেকে আজ প্রশ্ন করুন। আওয়ামী লীগ মোট ৩ দফা ক্ষমতায় এসেছে। ইচ্ছা করলে এই সম্পত্তির ব্যাপারে আপনার বিরুদ্ধে মামলা দিতে পারতো। ২০০১ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে প্রথমে আপনার নামে মামলা দিয়ে আপনাকে কারাগারে বন্দি করেন। গত ২৩ জুন দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন-এ আপনি লেখেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তো কারাগারে চিকিৎসা পাচ্ছেন। সঙ্গে কাজের মেয়ে পেয়েছেন। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা কারাগারে গিয়ে দেখা করার সুযোগ পাচ্ছেন। অথচ আমি ৬ বছর কারাগারে থাকা অবস্থায় চিকিৎসা তো দূরে থাক চিকিৎসকের মুখ পর্যন্ত দেখিনি। খালেদা জিয়া তো চেয়েছিলেন আমি যেন কারাগারে মারা যাই। কিন্তু আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।’ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তারপর খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি যদি ভবিষ্যতে আবার ক্ষমতায় আসি এরশাদের বিরুদ্ধে জিয়া হত্যার বিচার করব।’
খালেদা জিয়া, আপনি ৩ বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তার মধ্যে একবার ১৩ দিন ক্ষমতায় ছিলেন। সেই সময় আপনি এরশাদের বিরুদ্ধে জিয়া হত্যার বিচার কেন করেননি? এরশাদ আওয়ামী লীগের সাথে জোট করাতে এখন আবার নতুন করে বলেন, এরশাদের বিরুদ্ধে জিয়া হত্যার বিচার করবেন। আপনার কথায় প্রমাণ হয় তাহলে জিয়া হত্যার পেছনে এরশাদ জড়িত ছিল। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাড়ি দিতে চেয়েছিলেন। শেখ হাসিনা জিয়াকে উত্তর দিয়েছিলেন, আমার আব্বার হত্যার পেছনে যেই ব্যক্তি জড়িত তার কাছ থেকে বাড়ি নেয়ার প্রশ্নই উঠে না। খালেদা জিয়া আপনি প্রধানমন্ত্রী হয়ে ক্যান্টনমেন্টে বাড়ি নেয়া আপনার মোটেই ঠিক হয়নি।
দেশের রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা এক সময় এরশাদকে বলতেন, ‘সে তো স্থির মনের মানুষ না’। তার কারণ এরশাদ একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য দেন। অনেকদিন পূর্বে আপনি বলেছেন, আপনার দল ৩০০ আসন হতে নির্বাচন করবে। গত ২৮ আগস্ট দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন-এ আপনি লেখেন, ‘আমাকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যেতে পারবে না।’ এরশাদ সাহেব, আল্লাহ যদি আমাকে সেই ক্ষমতা দিতেন তাহলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে আপনাকে দুই থেকে তিনটি প্রশ্ন করতাম। মনের কষ্টে লিখলাম, বেয়াদবি ক্ষমা করবেন। সবকিছু তো আর পত্রিকায় লেখা সম্ভব নয়। আমি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বলছি, আপনি যতদিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকবেন বা রাজনীতি করবেনÑ আপনার প্রয়োজনেই আপনাকে আওয়ামী লীগের সাথে জোটে থাকতে হবে। নিশ্চয়ই আপনার জানার কথা, ১৯৬৭ সালে শেখ হাসিনার বিয়ে হয় সেই সময় বঙ্গবন্ধু কারাগারে বন্দি। দুঃখের সীমা নেই। বঙ্গবন্ধুর এই রকম কী অপরাধ ছিল যে তাকে হত্যা করা হলো। সেই ইতিহাস রাত-দিন লিখলে শেষ হবে না। আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি জেনে বুঝে কোনো মোমিনকে হত্যা করে, তার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল থাকবে। তার ওপর আল্লাহর ক্রোধ ও লানত বর্ষিত হতে থাকবে। আল্লাহ তার জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন।’ (সূরা নিসা : ৯৩)
আবার প্রায়ত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে কেন্দ্র করে ১৯ বার ক্যু হয়েছে। ২০ বারের মাথায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে এই ধরনের কোনো নজির নেই।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
পরিশেষে আপনার প্রতি আমার বিনীত আরজ, জীবন সায়াহ্নে এসে শেষবারের মতো আরও একবার আপনার সাক্ষাৎ চাই। আশা করি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে নিয়ে আমার অতীত পরিশ্রমের প্রতিদান হিসেবে হলেও আপনি আমাকে আরেকবার সাক্ষাৎ দেবেন। আমার এ প্রত্যাশা যদি আপনি বা আপনার অফিস দয়া করে পূরণ করেন তাহলে আমার নিজের জন্ম ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নিয়ে গবেষণা করার দীর্ঘদিনের পরিশ্রম সার্থক হবে।