ফিচার

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি

আশরাফ উদ্দীন আহমদ
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসটি তৎকালীন পূর্ববাংলার নদীবেষ্টিত গ্রামীণ পটভূমিকায় রচিত। উপন্যাসটি লেখার সময় মানিকের বয়স ছিল আনুমানিক ২৬ থেকে ২৭ বছর। ১৯৩৬ সালে পদ্মানদীর মাঝি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
মানিকের চিত্তের গভীরে জেগেছিল চেনা-জানা চাষি মাঝি কুলি মজুরের ঋজু সহজ জীবন রূপায়ণের সুতীব্র আকাক্সক্ষা। পদ্মানদীর মাঝিতে তার সেই কাক্সিক্ষত অভিপ্রায় সর্বপ্রথম রোপিত হলো বিশ্বস্ততার সাথে, সমাজের তথাকথিত নিচুতলার দিনহীন শ্রমজীবী মানুষ, যারা রাত্রিদিন ভূতের মতো পরিশ্রম করে, জীবনকে জীবনের কাছে বর্গা দেয়, জগতে বাঁচার জন্য কিছু পাওয়ার চেয়ে জীবনকে বাঁচিয়ে রাখাই হয়তো বড় কথা, কিন্তু তারপরও দুমুঠো অন্ন জোটে না, যা জোটে তাকে কি আর জোটা বলে, পরণে এতটুকু কাপড় জোটে না, যা আছে তা হয়তো লজ্জা নিবারণের জন্য, থাকার বা ঘুমোবার জন্য কুটির জোটে না, তাদের সম্পর্কে মানিকের আশৈশব অর্জিত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ই এই উপন্যাসে বিন্যস্ত হলো এক শিল্পিত আধারে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম প্রধান রচনা পদ্মানদীর মাঝি। বলা যায়, সর্ববৃহৎ আঞ্চলিক জীবনভিত্তিক উপন্যাস, পূর্ববঙ্গের পদ্মানদীকেন্দ্রিক ধীবর সম্প্রদায়ের জীবনচিত্র আচার-আচরণ চিত্রায়িত হয়েছে এই উপন্যাসের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে সমালোচক ও প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, পদ্মানদীর মাঝিতে মানিক সর্বপ্রথম বাংলাদেশের নদী-সমুদ্রের সমন্বয় এঁকে তার প্রোপটে পূর্ব বাংলার মানুষ ও তার মনকে স্বভাব-সৌন্দর্যে রূপায়িত করেছেন। জীবনে যারা বাঁচার জন্য মৃত্যুর সঙ্গে তীব্র পাঞ্জা কষে তারা প্রতিদানে দুমুঠো অন্নও পায় না, পরণবাস যাদের ছিন্ন, ঘরে যাদের আলো জ্বলে না, মাছ ধরা জীবিকা হলেও যাদের ভাগ্যে জোটে না একমুঠো ভাত, সেইসব মানুষ মানিকের উপন্যাসে মিছিল করে এলো। মানিক সেখানে হয়ে গেলেন সেসব মানুষের প্রতিনিধি, যারা একটু আশ্রয় পেলো, ভালোবাসার খানিক ছোঁয়া পেলো, এর চেয়ে তাদের আর কি বা চাওয়া-পাওয়ার আছে!
নদীমাতৃক পূর্ববাংলার নিম্নবিত্ত অন্ত্যজশ্রেণির একেবারে কাছাকাছি আসার সুযোগ মানিক সম্ভবত বাল্যকাল থেকেই পেয়েছেন, ঘুরে বেড়িয়েছেন মাঝি-মাল্লা-জেলেদের সঙ্গে। পদ্মানদীর মাঝিতে জেলে-মাঝি-মাল্লাদের এই গোষ্ঠী জীবনের একান্ত বাস্তবনিষ্ঠ প্রতিচ্ছবি নিরূপণ করেছেন তিনি। সেই গোষ্ঠীজীবনের রূপায়ণে পদ্মাপ্রকৃতির অপরিহার্য ভূমিকার কথা উপন্যাসে অঙ্কিত হয়েছে। কিন্তু এ ছাড়াও ধীবরপল্লী কেতুপুরের গ্রামীণ সমাজের বিভিন্ন
ঘটনা-উপঘটনা ও চিত্রের মধ্য দিয়েও গোষ্ঠী জীবনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে; সারারাত্রি হাড়ভাঙা-রাত্রিজাগা পরিশ্রমের পর জেলেরা পদ্মা থেকে যে মাছ ধরে আনে, বাজারে গিয়ে তার উপযুক্ত মূল্য পায় না তারা, ব্যাপারী আর চড়া সুদের মহাজনরা রক্তচু বের করে বসে থাকে, আর তাই তাদের ভাগ্যে জোটে শুধু বঞ্চনা, অভাব পায়ে-পায়ে এগিয়ে আসে, জীবনটাকে অতিষ্ঠ করে মারে দারিদ্র্য।
কেতুপুরের ধীবর সম্প্রদায় জীবিকার জন্য পদ্মানদীর ওপর পুরোদস্তুর নির্ভরশীল, তারপরও প্রত্যেকের জীবিকার্জনের আলাদা-আলাদা উপায় আছে, আর্থিক শ্রেণিবিচারে তারা কেউ কেউ বিভক্ত, কুবের-গণেশের সঙ্গে ধনঞ্জয়ের রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য, যেমন, ধনঞ্জয়ের নৌকা-জাল আছে, কিন্তু কুবের বা গণেশ পুরোপুরি ফকির। প্রতি রাত্রে যত মাছ ধরে তার অর্ধেকেই ধনঞ্জয় দাবি করে আর অর্ধেক কুবের-গণেশের, তাই তাদের সংসারে কষ্ট-অভাব আর দরিদ্রতা চেপে বসে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এমনই একজন সাহিত্যিক, জীবনকে বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করে, তার ভেতর দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছেন উপন্যাসের নান্দনিক সাফল্য। এ প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক অরুণ কুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, মানিক দুঃখী আর সাহসী সাহিত্যিক, জীবনকে বাস্তব ভূমিতে দেখেছেন, বাস্তবের অন্তরালে ঝাঁপ দিয়ে জীবনের কঠিন এবং নির্মম জটিলতাকে ধরতে চেয়েছেন, অভ্যস্ত বাঁধাধরা জীবনপ্রণালি শৃঙ্খলের মধ্যে নয়, দুর্দমনীয় জীবন-প্রবাহের মধ্যে জীবনের রহস্যসন্ধান করেছেন মানিক, যেখানে মানুষ জীবন-প্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে গিয়ে সনাতন বিশ্বাস বা আশ্রয়কে ফেলে যায়। মানিক দুঃসাহসিক, জীবনের কঠিন জটিলতা ও গভীরতা অন্বেষণে সদা তৎপর, আর সে কারণে আপাত সিদ্ধিকে পেছনে ফেলে সত্যকে জানার তাগিদে এগিয়ে চলেন। কেতুপুরের ধীবরসম্প্রদায়ের মধ্যে অদ্ভূত সংস্কার বিরাজমান, হিন্দু-মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনযাপনে যতই অবাধ বা সহজ হোক না কেন, ভেতরে তারা অবচেতন মনে লালন করে সংস্কার, হয়তোবা সেটাই কুসংস্কার, কিন্তু তাই বলে সেখানে সাম্প্রাদায়িক সম্প্রীতির েেত্র এতটুকু কালো দাগ পড়ে না, সবাই সবার জন্য, সবার জন্য সবাই, এই মন্ত্রে দীতি হয়ে সবাই আপন যেন।
মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত হোসেন মিঞা বৃষ্টিমুখর রাত্রে কুবেরের গৃহে আশ্রয় নেয় এবং রাত্রিযাপন করে, এতে কারো আপত্তি ঠেকে না।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসটি প্রকাশকালের দিক থেকে চতুর্থ মুদ্রিত গ্রন্থ, সামষ্টিক জনজীবনের চিত্র নিয়ে পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসেই শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও সংগ্রামের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে নিঃসন্দেহে। কেন্দ্রীয় চরিত্রেরা পদ্মাতীরের মাঝি সম্প্রদায়, কেতুপুর একটি দারিদ্র্যপীড়িত গ্রাম, এই গ্রামেই তাদের বসবাস আজন্ম এবং তাদের জীবন জীবিকা এই পদ্মানদীতেই মাছধরা ও মাঝিগিরি করা, সমস্ত বর্ষাকালটা ওরা অপরিসীম কষ্ট সহ্য করে ইলিশ মাছের জন্য পদ্মার বুকে চষে বেড়ায়, শীত মৌসুমে খেয়া পারাপার এবং লোকের মালামাল বহনের কাজ করে, তাই পদ্মা তাদের জননীর মতো, কখনো সে ভালোবাসে উজাড় করে, আবার কখনোবা সব ছিনিয়ে নিঃস্ব করে ছাড়ে, তারপরও পদ্মা হলো তাদের জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।
পদ্মা যেমন তার এক তীর ভাঙে আর অন্য তীর গড়ে তোলে, এদের জীবনেও তেমনি ভাঙা-গড়ার নিত্য লীলা চলে। কেতুপুর থেকে ময়নাদ্বীপ এই ভাঙা-গড়ার লীলারঙ্গভূমি, কুবের-কপিলা-মালা রাসু-গণেশ-নকুল-বুড়া পীতম মাঝি-আমিনুদ্দিÑ এরা সব- সবাই এই বিশাল জীবননাট্যের একেকজন কুশীলব, মুখে হাসি না এলেও কৃত্রিমভাবে হেসে ওঠে, চোখে আনন্দ, ঠোঁটের অজানা স্বপ্নের ঝিলিক, হয়তো এটাই জীবনমঞ্চের নিয়ম, তাই ওরা কখনো সেই নিয়মের হেরফের করে না।
রহস্যময়ী পদ্মার মতো রহস্যময় চরিত্র হোসেন মিঞা যেন বা এদের নিয়তিসদৃশ নিয়ামক অথবা ভাগ্যবিধাতা, তার ওপরেই নির্ভর করে কতগুলো জীবন ঘুরপাক খাচ্ছে, হয়তো তামাম কেতুপুর তারই রাজত্ব, সে আসলে এই সমস্ত রুগè-হতশ্রী জীবগুলোকে নিয়ে খেলছে নিজের স্বার্থে পাশার গুটির মতো।
এ সমস্ত ছোট ছোট প্রান্তিক মানুষদের জীবনকথা, দৈনন্দিন দুঃখ-দুর্দশার ছবি অঙ্কিত হয়েছে উপন্যাসের প্রথমদিকে, যেখানে অর্থাভাবে তাদের জীবনকে নানা দিক থেকে বিপন্ন করেছে। এরই মধ্যে রঙের মেলার বিবরণ উন্মোচিত করে গোষ্ঠীজীবনের আরেক দিগন্ত, উৎসব-পার্বণকে আশ্রয় করে এদের আনন্দলাভের প্রয়াস, লোকবিশ্বাস ও লোকসংস্কারের উল্লেখের মধ্য দিয়েও গোষ্ঠীচেতনা ব্যক্ত হয়েছে।
উপন্যাসে গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের একটা প্রশংসনীয় ছবি ফুটেছে রাসুর জন্য হোসেন মিঞার বিচার সংক্রান্ত সভার বর্ণনায়। ময়নাদ্বীপ থেকে রাসুর পালিয়ে আসার ঘটনাকে অবলম্বন করেই কেতুপুরের মাঝি-মাল্লাদের গোষ্ঠীজীবন আলোড়িত হয়ে উঠেছিল, বিচার সভায় সেই আলোড়নেরই চূড়ান্ত প্রকাশ। এই সভার বর্ণনায়, চরিত্রের সমাবেশে মাঝিকে গোষ্ঠীবদ্ধ রূপটি স্পর্শ করেছে, পীতম মাঝি-নকুল-বাসু আমিনুদ্দী-কুবের- এদের সবারই সেই একই ধরনের ভীত অসহায় নিরুপায় অথচ অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিুব্ধ মানসিকতা এদের চরিত্রের গোষ্ঠীগত প্রোপটকে সজীব করেছে।
আমরা পুতুল নাচের ইতিকথাতেও গ্রামসমাজের চমৎকার একটা ছবি দেখি, কিন্তু সেখানকার মানুষের দুঃখকষ্ট-সংকট-সমস্যা সবই আলোচ্য উপন্যাসের তুলনায় অনেক-অনেক বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। পদ্মানদীর মাঝিতে সাধারণ মানুষের চরিত্র- ব্যক্তিত্ববোধের পাশাপাশি অবস্থা সবই সংকটারূঢ়। মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের কাহিনি হয়েছে গতিশীল, আরো আছে নর-নারীর চরিত্রের সঙ্গে পটপরিবেশের প্রগাঢ় সংযোগ। পদ্মার মতো এক দুরন্ত নদীর উত্তাল প্রতিকূল পটভূমিতে সেই জীবন বিন্যস্ত হওয়ায় তার কঠিন সংগ্রামী রূপেরও ইঙ্গিত মিলেছে নামকরণের মধ্য দিয়ে। তবে পদ্মানদীর মাঝি নামের ভেতরে মাঝির জীবন কথার আভাস থাকলেও সেই জীবন সমগ্র মাঝি গোষ্ঠীর, না নিছক কোনো ব্যক্তির, নাকি উভয়েরইÑ উপন্যাসের মধ্যে প্রবেশ করলে অনুভব করা যায় যে, এই উপন্যাসের পদ্মানদীর তীরভূমিকে ছুঁয়ে যে জীবন বিন্যস্ত হয়েছে, তা একাধারে গোষ্ঠী ও ব্যক্তির উভয়েরই, গোষ্ঠীজীবনের শরিক সেই জীবনের প্রতিনিধি। উপন্যাসের গোড়ায় কয়েকজন জেলের মাছ ধরার সংঘবদ্ধ প্রাণান্ত প্রয়াস ও তারপর মাছের বাজারে তাদের বঞ্চিত হওয়ার পুরো ছবিটাই গোষ্ঠীজীবনের। এখানে গরিবের মধ্যে গরিব, ছোটলোকের মধ্যে আরো বেশি ছোটলোক যে কুবেরকে দেখি, সে পুরোপুরি ধীবর গোষ্ঠীভুক্ত, এই গোষ্ঠী থেকে তার তেমন কোনো স্বতন্ত্র পরিচয় তখনো ফুটে ওঠেনি।
পুতুল নাচের ইতিকথা ও পদ্মানদীর মাঝি, দুটো উপন্যাসই খুব কাছাকাছি সময়ে লেখা। মানিকের প্রথম পর্বের উপন্যাসের বাস্তবতাবোধের এক পূর্ণাঙ্গ রূপ, প্রথমটিতে নায়কের জীবন অভিজ্ঞতায় ও আত্মভাবনায় আধুনিক মধ্যবিত্ত মানসিকতার আত্মখ-িত, বিকারগ্রস্ত ও অস্থির যে রূপ দেখতে পাই, তা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক চিত্ররূপ ফুটে ওঠে সমাজের আরেক শ্রেণির দরিদ্র শ্রমজীবী মাঝি-মাল্লা জেলের একান্ত সজীব জীবন আলেখ্য পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসে।
পদ্মানদীর পটপরিবেশ এবং এর ব্যাপ্তি অনেক বেশি প্রসারিত, কেবল কেতুপুরের গ্রামই সংশ্লিষ্ট নয়, এখানে আছে মালা ও কপিলার বাপের বাড়ির গ্রাম চরডাঙা এবং কপিলার শ্বশুরবাড়ির গ্রাম। উপন্যাসের নামের ভেতর দিয়ে যে নদীনির্ভর জেলে-মাঝি-মাল্লাদের জীবিকা বা জীবনাশ্রয়ী বড় মাপের এক বহুবর্ণ আখ্যানের প্রত্যাশা জেগে ওঠে, আসলে তা পূরণের কোনো দায়িত্ব মানিক কখনো অনুভব করেননি। বৃহদায়ক আঞ্চলিক কোনো রচনার পরিকল্পনা সম্ভবত লেখকের মনে ছিল না, যদি থাকতো পদ্মানদীর এক মাঝির জীবনে শেষ অবধি পদ্মার আঞ্চলিক সীমাকে ছাড়িয়ে বিপুল সমুদ্রের আহ্বানই মুখ্য হয়ে উঠতো না। আঞ্চলিকতার পরিচিত সীমারেখা দূর অজানা সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে মুছে হারিয়ে যেতো না।
তবে স্বীকার করতেই হয় উপন্যাসের প্রথম দিকে আঞ্চলিকতার একটি বস্তুনিষ্ঠ আঙ্গিক চোখে পড়ে। পদ্মানদীর তীরবর্তী গ্রাম-জীবনের এক সুনির্দিষ্ট পটবিন্যাস, সেখানকার গোষ্ঠীবদ্ধ মাঝি-জেলেদের জীবিকার কঠিন সংগ্রামের বর্ণনা-প্রকৃতি এবং মানুষের সহযোগ বা সংঘাতের চিত্ররূপ, আঞ্চলিক ব্যুহবদ্ধ নরনারীর আচার-আচরণ কাম-ভালোবাসা, পূর্ববঙ্গীয় সংলাপের মাটি-ঘেঁষা বাস্তবতা- উপন্যাসের প্রথম তিনটে পরিচ্ছেদকে আঞ্চলিকতার সজীব লণে চিহ্নিত করেছে।
সাতটি পরিচ্ছদে বিন্যস্ত পদ্মানদীর মাঝিÑ এর মূল ঘটনাংশ এ রকমÑ পদ্মাতীরবর্তী কেতুপুর গ্রামের জেলেপাড়ার পরিবার-পরিজনসহ কুবের মাঝির বসবাস। তার জীবনযাপন হতদশাগ্রস্ত। স্ত্রী মালা আজন্ম পঙ্গু একজন নারী। পুত্র-কন্যাবেষ্টিত সংসারের একমাত্র উপায় করার মানুষ কুবের। সে একজন সহজ-সরল ও ভগবাননির্ভর এবং একরোখা জেদী মানুষ। নিজের কোনো নৌকা নেই, পরের নৌকায় কাজ করে জীবন অতিবাহিত করে, স্বপ্ন আছে, সাধ আছে কিন্তু সে নিরুপায়। তার মতোই কেতুপুরবাসী আরো অনেকে জীবন নির্বাহ করে।
কুবেরের শুধুমাত্র ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ নয়, তার ব্যক্তিগত জীবনাচারণের কাহিনিও কেন যেন উপন্যাসে একটু কমই প্রকাশিত হয়েছে, (যদিও কুবের-কপিলা আখ্যান অধিকতর গুরুত্ব পাওয়ার কারণ মানিকের বিশেষ মনোবৈজ্ঞানিক অভিপ্রায় এবং ফ্রয়েডীয় মনঃসমীণতাত্ত্বিক সংস্কার) হোসেন মিঞার সঙ্গে তার সম্পর্ক, হোসেন মিঞার নৌকায় তার মাঝিগিরি পেশা, তার ময়নাদ্বীপ অভিজ্ঞতা এবং সর্বোপরি কপিলার প্রতি তার অবৈধ প্রণয়বাসনাÑ সব কিছুর মধ্য দিয়ে যেন গোষ্ঠীজীবনকে দূরে রেখে কুবেরের ব্যক্তি জীবনকথাই অনেক বেশি রেখাপাত হয়েছে। বলা যায় এই জীবনকথার অর্থ নিছকই একজন শ্রমজীবী মানুষের গোটা জীবন কাহিনি নয়।
কুবেরের জীবনের নানান অংশ, কুবেরের অসহায় এবং নিষ্ক্রিয় জীবনে সক্রিয়তার আভাস নিয়ে আসে কপিলা। কপিলা সে আরেক রহস্যময়ী নারী, যদিও মালা এবং কপিলা দুজনাই দুটি প্রতীকী চরিত্র, মালা বরাবরই স্থির-অচল, কপিলা অস্থির-জঙ্গম। মালা ঘরোয়া জীবনে অভ্যস্ত এবং সে সামাজিক কিন্তু কপিলা অসামাজিক এবং এই দুয়ের মাঝখানে কুবের। কুবের পদ্মানদীর দ জেলে, তার স্ত্রী মালা কিন্তু শারীরিকভাবে পঙ্গু, সেটাও কোনো দোষ নয়, মালার ত্বকের মাদকতায় কুবের আকৃষ্ট, ওর কাছে মালার রঙ কালো নয়, সে যেন সোনায় রাঙানো তামাটে একটা আবরণে আচ্ছাদিত মালা।
পঙ্গু মালার প্রতি বরাবরই কুবেরের যে অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং সেই সঙ্গে একরকম গভীর মমতা বা নিষ্ঠা আছে, তাতে মালার মায়ের প্রশংসা ঝরে পড়ে, শাশুড়ির কথা শুনে বিগলিত কুবের, কেউই যদি মালাকে অসম্মান করে কুবের তা অবশ্যই সহ্য করতে পারবে না কখনো।
তারপরও পাঠক ল্য করবে, মালার এই শারীরিক পঙ্গুত্বের সুযোগেই কুবের-কপিলার অবৈধ ভালোবাসা, মালার ছোটবোন চঞ্চলা কপিলার সঙ্গে কুবেরের পরিচয় ছিল শ্যালিকা হিসাবে। সবচেয়ে বড় কথা, সে এখন যুবতি এবং বিবাহিতা কিন্তু স্বামীপরিত্যক্তা। পাঠককে আবারো স্মরণ রাখতে হবে যে, মালা বা কপিলাকে প্রতীকী চরিত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা গেলেও স্বীকার করতেই হবে, তারা কেউই টাইপ চরিত্র নয়, তাদের ব্যক্তিত্বের রক্ত-মাংসময়তা আমাদের ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতাকে এমনভাবে আক্রমণ করে যে মালা অথবা কপিলার সামান্যতম অভিব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যও আমাদের দৃষ্টি ও শ্রুতিতে এড়ায় না। তাই বলা যেতে পারে, মালা-কপিলা দুজনেই যেন পদ্মারই প্রতীক-পদ্মাবর্তী, টুকরো-টাকরা বিভিন্ন খ- চিত্র উপন্যাসে উঠে এসেছে উভয়ের কাহিনিমালা।