অর্থনীতি

সরকারের নানামুখী উদ্যোগে ক্রমেই রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ‘রেমিট্যান্স’ প্রবাহ বেড়েছে। চলতি বছরের মে মাসে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে ১৪৮ কোটি ২৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা একক মাস হিসাবে গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং ২০১৭ সালের মে মাসে পাঠানো রেমিট্যান্সের চেয়ে ২১ কোটি ৫২ লাখ ৪০ হাজার ডলার বেশি। গত বছর মে মাসে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন ১২৬ কোটি ৭৬ লাখ ডলার।
এদিকে, এই বছরের এপ্রিল মাসে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে ১৩৩ কোটি ১৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
২০১৭-১৮ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ১ হাজার ৩৫৭ কোটি ৫১ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের পুরো সময়ে রেমিট্যান্স আসে ১ হাজার ১৫৫ কোটি ৪৮ লাখ ৪০ হাজার ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রবাসীরা মে মাসে বেসরকারি ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে ১০৯ কোটি ৭৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংক- অগ্রণী, জনতা, রূপালী, সোনালী, বেসিক ও বিডিবিএল-এর মাধ্যমে এসেছে ৩৫ কোটি ৯৬ লাখ ডলার এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ১ কোটি ২২ লাখ ৭০ হাজার ডলার। এর পর থেকে প্রতি মাসেই রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে ১৪ কোটি ৩২ লাখ ৩০ হাজার, জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে ৮ কোটি ৬৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার, রূপালী ব্যাংকের মাধ্যমে ১ কোটি ৮৮ লাখ ৩০ হাজার ডলার, সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে ১ কোটি ৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার ও বেসিক ব্যাংকের মাধ্যমে ২ লাখ ২০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
এছাড়া, প্রবাসীরা বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ১ কোটি ৩৪ লাখ ১০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।
প্রবাসীরা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাইয়ে পাঠিয়েছেন ১১৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। আগস্টে পাঠান ১৪১ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। সেপ্টেম্বরে ৮৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলার, অক্টোবরে ১১৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার ও নভেম্বর মাসে ১২১ কোটি ৪৭ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।
গত মে মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। বিশেষায়িত দুটি ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ১ কোটি ২২ লাখ ডলার। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ১০৯ কোটি ৭৫ লাখ ডলার এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এক কোটি ৩৪ লাখ ডলার এসেছে।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ২৮ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৮ কোটি ৭৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
দেশের অর্থনীতিতে অক্সিজেনের মতো ভূমিকা রাখছে রেমিট্যান্স। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়নের অন্যতম নিয়ামক এই রেমিট্যান্স। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সে প্রবাহ কিছুটা কমছে। গত ও চলতি অর্থবছরে প্রতিমাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে। দেশের অর্থনীতির অন্যতম গতিসঞ্চারক এই রেমিট্যান্সকে ৫টি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে হুন্ডি ও মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক মন্দা বাংলাদেশের রেমিট্যান্সে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৫২০ কোটি ৮১ লাখ ডলার। যেখানে গত অর্থবছরে একই সময়ে রেমিট্যান্স আসে ৬১৭ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স কমেছে ১৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় রেমিট্যান্স আয় কমে আড়াই শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ১ হাজার ৫৩১ ডলার থেকে কমে গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স আসে ১ হাজার ৪৯৩ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স আয় বাড়ে ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
একক অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ দেড় হাজার কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসার পর থেকে তা ক্রমশ কমে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্টরা। রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উদ্বিগ্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত ১৪ নভেম্বর রেমিট্যান্স আহরণকারী ৩০ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে হুন্ডিকে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মত দেন ব্যাংকাররা।
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বিষয়ে বলেন, একটি মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসেসের মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স আসছে। এটি হুন্ডি। এতে ছোট অঙ্কের ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার রেমিট্যান্স ব্যাংকের মাধ্যমে আসা বন্ধ হয়ে গেছে। দেশে টাকা এলেও বৈদেশিক মুদ্রা আসছে না। বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানানো হয়েছে।
নতুন শ্রমবাজার খুঁজে না পাওয়ায় এখনো মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত বাজারগুলোই বাংলাদেশিদের গন্তব্য। কিন্তু সেখানে তেলের দাম কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক মন্দায় বিপাকে আছেন প্রবাসীরা। আগে বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকরা মূল কাজের বাইরে ওভারটাইম ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতেন। কেউ কেউ ছোটখাটো ব্যবসাবাণিজ্য করতেন। এসব থেকে মূল কাজের বেতনের তুলনায় আরও ২ থেকে ৩ গুণ আয় হতো। এখন ওই সব উৎস বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তাদের আয় কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, প্রবাসী আয় কমছে কারণ বাংলাদেশের শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। এর বাইরে নতুন বাজার খোঁজা উচিত। আর দ লোক পাঠানোর দিকে নজর দেয়া উচিত।
এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া বন্ধ রেখেছে বিভিন্ন দেশ। অনেক দেশ কঠিন শর্তে কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে। কিছু দিন আগে শ্রমিক রপ্তানির পরিমাণ কমে যায়, যার প্রভাব এখন পড়ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমিক রপ্তানি বেড়েছে। এর প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগবে বলে জানান রেমিট্যান্স আহরণকারী ব্যাংকগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
প্রবাসী শ্রমিকদের বেতন নির্ভর করে দতার ওপর। বাংলাদেশের যত মানুষ বিদেশে যান তার অর্ধেকের বেশি অদ। অদতার কারণে বেতন বাড়ছে না শ্রমিকদের। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে শ্রমিকদের পাড়ি জমানো ক্রমাগত বাড়লেও এসব শ্রমিকের অর্ধেকই অদ। আর এই অদক্ষ শ্রমিকের কারণেই রেমিট্যান্স প্রবাহ সবসময়ই সীমিত থাকে।