কলাম

আওয়ামী লীগ মতায় এলে কৃষি উৎপাদন বাড়ে

ড. জাহাঙ্গীর আলম
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ ছিল একটি খাদ্য ঘাটতির দেশ। ব্রিটিশ আমলে গঠিত বিভিন্ন কৃষি কমিশনের প্রদত্ত প্রতিবেদনের তথ্য থেকে এখানকার চরম খাদ্য ঘাটতির চিত্রই ফুটে ওঠে। পাকিস্তান আমলেও পূর্ববঙ্গের খাদ্য উৎপাদনের চিত্র তেমন সুখকর ছিল না। এ অঞ্চলে প্রতি বছর গড়ে খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ লাখ টন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে প্রথম পাঁচ বছর খাদ্য আমদানি করতে হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টন। ওই সময় থেকেই উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গ্রহণ করা হয় কৃষি উন্নয়নের নানামুখী পদপে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষির উৎপাদন উৎসাহিত করার জন্য ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেন। আধুনিক কৃষি উপকরণÑ যেমন, রাসায়নিক সার, পোকার ওষুধ ও পানি সেচের যন্ত্রপাতি বিতরণের ব্যবস্থা করেন নামমাত্র মূল্যে। স্থাপন করেন বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মসূচিকে সম্প্রসারিত করে পৌঁছে দেন কৃষকের দোরগোড়ায়। চাকরিেেত্র কৃষি গ্র্যাজুয়েটদেরকে অন্যান্য টেকনিক্যাল গ্র্যাজুয়েটদের (ডাক্তার, প্রকৌশলী) সমান বেতন ও পদপর্যাদা নিশ্চিত করেন। তাতে উৎসাহিত হয় কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণের কাজ। অপরদিকে কৃষি উৎপাদনে উপকরণ ভর্তুকি ও পণ্যের মূল্য সমর্থনের কারণে উৎসাহিত হয় কৃষক। ফলে কৃষিতে আধুনিক চাষাবাদের নিবিড়তা বেড়ে যায় ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
এর পর রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে কৃষিতে সরকারি সমর্থন হ্রাস পায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে গত ১০ বছর ধরে ক্রমাগতভাবে কৃষিখাতে নীতিগত সমর্থন বাড়ানো হয়। ফলে কৃষির সকল েেত্র বৃদ্ধি পেয়েছে প্রবৃদ্ধির হার। খাদ্যশস্যের েেত্র এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল খুবই ল্যণীয়। ১৯৭২ সালে এদেশে খাদ্যশস্যের মোট উৎপাদন ছিল এক কোটি টন। বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি টনেরও উপরে। এ সময় উৎপাদন বৃদ্ধির গড় হার ছিল বার্ষিক তিন শতাংশের বেশি। বর্তমানে চাল উৎপাদনের েেত্র বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন ও উন্নয়নে বাংলাদেশের স্থান হলো সবার উপরে। তা ছাড়া পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের স্থান দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, মৎস্য উৎপাদনে চতুর্থ, আম উৎপাদনে সপ্তম ও আলু উৎপাদনে অষ্টম বলে বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়। একটি সহযোগী দৈনিক কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরে চাল, গম ও ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে ৪৮ লাখ ৭২ হাজার মেট্রিক টন, শাক সবজির উৎপাদন বেড়েছে ৩২ লাখ ৯৭ হাজার মেট্রিক টন, তেলের উৎপাদন বেড়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ও ডালের উৎপাদন বেড়েছে ২ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চার গুণ, গম দুই গুণ, ভুট্টা ১০ গুণ ও সবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ গুণ। খাদ্যশস্য, মৎস্য ও মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ম্ভর, আলু উৎপাদনে উদ্বৃত্ত। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার মূল্যের আলু রপ্তানি হয়েছে। মাছ রপ্তানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চিরকালের দুর্ভি, মঙ্গা আর ুধার দেশে এখন ঈর্ষণীয় উন্নতি হয়েছে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের েেত্র। বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি গ্রহণের ফলেই এই উন্নতি সম্ভব হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ মতায় এসে কৃষির উন্নয়নে নানা পদপে গ্রহণ করে। জমির সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখন সারের জন্য কৃষককে ধরনা দিতে হয় না। কৃষকদের কাছেই পৌঁছে যায় সার। আওয়ামী লীগ সরকার সেই ব্যবস্থা করেছে। তিনি বলেন, খাদ্যের জন্য যেন আর কোনো দিন বাংলাদেশকে কারো কাছে হাত পাততে না হয় সেটা নিশ্চিত করাই তার সরকারের ল্য।
গত ৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন (খামারবাড়ি) চত্বরে অনুষ্ঠিত ইনস্টিটিউশনের ৬ষ্ঠ জাতীয় কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক সেমিনারের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এই কথা বলেন।
এদেশের কৃষি উন্নয়নের মূল অনুঘটক হলো কৃষক। তাদেরকে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয়ভাবে সহায়তা করে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী ও গবেষকগণ। আগামীতে স্থায়ী কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য ইতোমধ্যেই যেমন তাদের অনুকূলে অনেক কিছু করা হয়েছে, তেমনি করণীয় আছে আরও অনেক কিছু। এেেত্র কৃষি গবেষকদের চাকরির মান উন্নয়ন ও দ্রুত পদোন্নতির বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন অনেকেই আছেন যাদেরকে একই পদে থাকতে হয় বছরের পর বছর। পদ খালি থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি দেয়া হয় না শীর্ষ গবেষণা পদগুলোতে। তা ছাড়া কৃষি সম্প্রসারণের বিভিন্ন শাখায়ও অনেক পরিচালক/ মহাপরিচালক ভারপ্রাপ্ত। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পরেও তাদেরকে ভারমুক্ত করে স্থায়ী নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয় না। তাদেরকে দাবিয়ে রাখার জন্যই একটি মহলের এই অপচেষ্টা বলে অনেকে মনে করেন। কৃষি গবেষণার েেত্র এখনো পেনশন স্কিম চালু হয়নি। কেবল বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বারি, গাজীপুর) ছাড়া অন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অবসর সুবিধাদি এখনো মান্ধাতা আমলের। এমতাবস্থায় গবেষণার েেত্র ভালো মেধা আকর্ষণ করা খুবই দুঃসাধ্য।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মতা গ্রহণের পর ২০০৯ সালে ঘোষণা দিয়েছিলেন গবেষকদের অবসর গ্রহণের বয়স ৬৫ করার। কিন্তু বিভিন্ন অজুহাতে আজও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বায়ত্তশাসিত। বোর্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অটোনোমাস পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইনসিটো পদোন্নতি, পেনশন সুবিধা ও অবসরের বয়স ৬৫ করা সম্ভব হলেও অটোনোমাস পাবলিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেন তা সম্ভব হয় না সে প্রশ্ন অনেকের।
কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের নেতৃবৃন্দ বলছেন, দেশের কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষিবিদদের অবদান অনেক। তারা দেশকে দিয়েছেন অনেক বেশি, কিন্তু তাদের প্রাপ্তি খুবই কম। বর্তমানে দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়ছে কিন্তু বাজারের অব্যবস্থার কারণে কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক। উত্তরবঙ্গের কোনো কোনো স্থানে কাকরল ও করলা ২/৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় খামার প্রান্তে। মূলার দাম পায় না বলে েেতই তা ফেলে রাখেন অনেক কৃষক।
আমাদের একটি কৃষি বিপণন অধিদপ্তর আছে খামারবাড়িতে। বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলে এর প্রতিনিধি আছে। কিন্তু তাদের প্রভাব তেমন চোখে পড়ে না। এ বিভাগের একটি বড় দায়িত্ব হওয়া উচিত পণ্যমূল্য বিশ্লেষণ, বাজারে হস্তপে ও মার্কেট রেগুলেশন। এ কাজটি সুষ্ঠুভাবে করার জন্য প্রশিণপ্রাপ্ত কৃষিবিদ হলেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। অথচ কৃষি বিপণন বিভাগে তাদেরই বড় অভাব।
বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে এখন কৃষিবিদদের অবস্থান সর্বত্র। সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সচিব এখন একজন কৃষিবিদ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেও নিয়োগ দেয়া হয়েছে একজন অত্যন্ত যোগ্য ও মেধাবী কৃষিবিদকে। এখন একটি বিশেষ ক্যাডার থেকে নিয়োগ দেয়া হয় সদস্য (কৃষি)। কৃষি বিষয়ে পড়াশোনা ও বাস্তব জ্ঞান যাদের খুবই অপ্রতুল। এখন কৃষি পরিকল্পনায় যে বিনিয়োগের আভাস দেয়া হয়, বাস্তবে বছরওয়ারি বরাদ্দে তার প্রতিফলন ঘটে না। বছরওয়ারি বরাদ্দে যে অর্থের সংস্থান রাখা হয় বছর শেষে তা খরচ হয় না। উদাহরণস্বরূপ কৃষি ভর্তুকির কথা বলা যায়। গত চার বছর ধরে কৃষি ভর্তুকির জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ৬ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ হয় না। দেশের মোট বাজেট বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু কৃষি ভর্তুকির হিস্যা হ্রাস পেয়েছে সাত থেকে দুই শতাংশে।
সম্প্রতি কৃষকদের কাছ থেকে ধান চাল সংগ্রহের েেত্র সরকারি ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয় উৎপাদন খরচের ওপর ছয় থেকে ১০ শতাংশ লাভ দিয়ে। ভারতে এবার তা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ শতাংশ লাভ দিয়ে। আমাদের দেশে ধান চাল সংগ্রহ করা হয় মোট উৎপাদনের তিন থেকে চার শতাংশ। ভারতে তা ১৫ শতাংশ। আমরা শুধু ধান ও গম সংগ্রহ করি। ভারতে সরকারের সংগ্রহের তালিকায় রয়েছে ২৩টি ফসল। নিম্নতম মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২৩টি ফসলের। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই কৃষি মূল্য কমিশন রয়েছে। তারা উৎপাদন খরচ নির্ধারণ করেন, কৃষিপণ্যের নিম্নতম মূল্য নির্ধারণের জন্য সুপারিশ করেন এবং আমদানি রপ্তানির বিষয়ে পরামর্শ দেন।
আমাদের দেশে একটি কৃষি মূল্যকমিশন গঠনের জন্য প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হচ্ছে ১৯৯৯ সাল থেকে। এখনো এর বাস্তবায়ন নেই।
আওয়ামী লীগ সরকার মতায় এলে দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়ে। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বেশি পায় কৃষক। দেশ খাদ্যে স্বয়ম্ভর হয়। এ কথাটি যেমন সত্য তার বিপরীতে খাদ্য আমদানি বৃদ্ধির কথাটাও সত্য। আমাদের দেশে খাদ্য আমদানির গড়পড়তা পরিমাণ ২০ থেকে ৩০ লাখ টন। কিন্তু ১৯৯৮-৯৯ সালে এর পরিমাণ ছিল ৫৪ লাখ ৯১ হাজার টন, ২০১০-১১ সালে ছিল ৫৩ লাখ ১৩ হাজার টন, ২০১৪-১৫ সালে ছিল ৫৩ লাখ ৩১ হাজার টন, ২০১৬-১৭ সালে ছিল ৫৮ লাখ ২৩ হাজার টন এবং সর্বশেষ ২০১৭-১৮ সালে ছিল ৯৭ লাখ ৭৪ হাজার টন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সরকার কৃষিখাতে প্রবৃদ্ধির যাত্রা শুরু করেছিল সাত শতাংশ দিয়ে। এখন তা নেমে এসেছে তিন শতাংশে। শস্য কৃষি খাতে গত তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে মাত্র এক শতাংশের কাছাকাছি।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন সত্যিকার কৃষকদরদী নেতা ছিলেন। তিনি তাঁর বক্তৃতায় প্রায়ই বলতেন, আমার কৃষকের যেন কষ্ট না হয়।
কৃষকের কষ্ট লাঘবে তাঁরই সুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুবই আন্তরিক হবেন এটাই স্বাভাবিক। এ ল্েয কৃষকদের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আরও বেশি নীতিগত সমর্থন দেয়া দরকার। কৃষকদের সার্বিক কর্মকা-ে যারা স্থানীয় ও কেন্দ্রীয়ভাবে সহায়তা করে সেই কৃষিবিদদের কাজের পরিবেশ আরও উন্নত ও মসৃণ করা দরকার।
লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ