প্রতিবেদন

ছাত্রনেতাদের সঙ্গে ভিসির মিটিং ॥ মার্চে ডাকসু নির্বাচন : নির্বাচনি উত্তাপে সরব ঢাবি ক্যাম্পাস

সাবিনা ইয়াছমিন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান আগামী বছরের মার্চে ডাকসু নির্বাচনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর উপাচার্য কার্যালয় সংলগ্ন একটি কে ডাকসু নির্বাচন বিষয়ে পরিবেশ পরিষদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। বৈঠকে ঢাবির সকল ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন।
উপাচার্য বলেন, ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ চলছে। আশা করি অক্টোবরের মধ্যে খসড়া ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা সম্ভব হবে।
বৈঠকে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ল্েয সহাবস্থান ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানায় ছাত্রসংগঠনগুলো। এসময় উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য (শিা) অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ, কোষাধ্য অধ্যাপক কামাল উদ্দীন, ঢাবি শিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল, প্রক্টর অধ্যাপক গোলাম রব্বানী।
ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস, সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসান, ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ আবুল বাশার সিদ্দিক, ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি জিএম জিলানী শুভ,
সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
দীর্ঘদিন পর এই আলোচনায় অংশ নিতে ক্যাম্পাসে আসেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসান ও ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার। তাদেরকে সভাস্থলে নিয়ে যান বিএনপিপন্থি শিকদের সংগঠন ঢাবি সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম, যুগ্ম-আহ্বায়ক অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান প্রমুখ। দুপুর পৌনে ১২টা থেকে প্রায় বিকেল চারটা পর্যন্ত আলোচনা চলে। আলোচনা শেষে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ এক সঙ্গে বের হয়ে আসেন। পরে গাড়িতে ওঠার আগে ছাত্রদল সভাপতি রাজিব আহসানকে জড়িয়ে ধরেন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িতে করে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন ছাত্রদল নেতারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস বলেন, বৈঠকে আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন দেয়ার দাবি জানিয়েছি। তবে আমরা টাইমফ্রেম বেঁধে দিইনি। সামনে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনের আগে সুষ্ঠুভাবে ডাকসু নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব নয়। তবে যদি হয়, আমরা সাধুবাদ জানাব।
সভা শেষে ছাত্রদলের সভাপতি রাজীব আহসান বলেন, ডাকসু নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক সহাবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাম্পাস ও মধুর ক্যান্টিনে রাজনীতি করার যে স্বাভাবিক পরিবেশ তা নিশ্চিত করতে হবে। হলগুলোতে সাধারণ শিার্থীদের থাকার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। মেধার ভিত্তিতে শিার্থীদের সিট বণ্টন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে। প্রশাসনের কাছে আমরা একটি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের দাবি জানিয়েছি।
ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বলেন, আমরা ডিসেম্বরের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের সুস্পষ্ট তারিখ চেয়েছি।
ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ভিসির ঘোষণায় ছাত্রনেতাদের মতো ঢাবি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৭ বছরে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে মাত্র ৭ বার। অষ্টমবারের ডাকসু নির্বাচনের জন্য এখন ঢাবির শিক্ষার্থীরা মুখিয়ে আছেন। ভিসির আশ্বাসে তারা আশায় বুক বাঁধছেন যে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই অনুষ্ঠিত হবে ডাকসু নির্বাচন।
২০১২ সালে ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে উচ্চ আদালতে একটি রিট হয়েছিল। এরপর প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ একটি সমাবেশে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তারপরও কিছু হয়নি। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালে। ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হন যথাক্রমে আমান উল্লাহ আমান এবং খায়রুল কবির খোকন। এরপর ২৮ বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু ডাকসু নির্বাচন আর হয়নি।
আমরা যদি পেছনে ফিরে তাকাই তাহলে দেখবো, ডাকসুতে এসেছেন এমন সব উজ্জ্বল নত্র যারা পরবর্তীতে রাজনীতির আকাশকে আলোকিত করেছেন। ১৯২২-২৩ শিাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) সৃষ্টি হয়। মোট ৩৬ বার এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ডাকসুর প্রথম ভিপি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। ১৯২৮-২৯ সেশনে ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হন এ এম আজহারুল ইসলাম ও এস চক্রবর্তী, ১৯২৯-৩২ সময়কালে রমণী কান্ত ভট্টাচার্য ও কাজী রহমত আলী ও আতাউর রহমান, ১৯৪৭-৪৮ সেশনে অরবিন্দ বোস ও গোলাম আযম, ১৯৫৩-৫৪ সালে এস এ বারী এটি ও জুলমত আলী খান, ফরিদ আহমেদ। এরপর ভিপি ও জিএস নির্বাচিতদের মধ্যে যথাক্রমে রয়েছেন নিরোদ বিহারী নাগ ও আব্দুর রব চৌধুরী, একরামুল হক ও শাহ আলী হোসেন, বদরুল আলম ও মো. ফজলী হোসেন, আবুল হোসেন ও এটিএম মেহেদী, আমিনুল ইসলাম তুলা ও আশরাফ উদ্দিন মকবুল, বেগম জাহানারা আখতার ও অমূল্য কুমার, এস এম রফিকুল হক ও এনায়েতুর রহমান, শ্যামা প্রসাদ ঘোষ ও কে এম ওবায়েদুর রহমান, রাশেদ খান মেনন ও মতিয়া চৌধুরী, বোরহান উদ্দিন ও আসাফুদ্দৌলা, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী ও শফি আহমেদ, মাহফুজা খানম ও মোরশেদ আলী, তোফায়েল আহমেদ ও নাজিম কামরান চৌধুরী, আ স ম আব্দুর রব ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন।
১৯৭০ সালের ডাকসু নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের সহযোগী ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ ডাকসু নির্বাচনে জয় পায়নি। ১৯৭২-৭৩ সময়কালে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে দায়িত্ব পালন করেন ছাত্র ইউনিয়নের মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও মাহবুব জামান। ১৯৭৩ সালের নির্বাচন ভন্ডুল হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৯, ১৯৮০ ও ১৯৮২ সালে ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। প্রথম ২ নির্বাচনে যথাক্রমে জাসদ-ছাত্রলীগের এবং বাসদ-ছাত্রলীগের প্রার্থী হয়ে ভিপি ও জিএস পদে জিতেছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না ও আখতারুজ্জামান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যে কম আলোচনা-সমালোচনা হয়নি। বিগত ২৮ বছরে যদি ২৮টি ডাকসু নির্বাচন হতো তাহলে অন্তত শুধু ডাকসুর মাধ্যমেই ৫৬ জন নেতা পাওয়া যেত। এছাড়া বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ২ জন করে প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি পাওয়া যেতো।
যা-ই হোক, যে কারণেই হোক, বহুদিন ডাকসু নির্বাচন বন্ধ থাকার পর এখন নির্বাচনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, মার্চে ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও নতুন নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে।