প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটসহ বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে

মেজবাহউদ্দিন সাকিল
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। এই নিয়ে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৪তম অধিবেশন থেকে টানা ১০ বার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দিলেন। শেখ হাসিনার এই রেকর্ড বিশ্বের অন্য কোনো সরকার বা রাষ্ট্র প্রধানের নেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে গিয়ে ফার্নান্দা এসপিনোসা গার্সেসকে ৪র্থ নারী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন জানান এবং জাতিসংঘের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার সুরার যেকোনো প্রচেষ্টায় অকুণ্ঠ সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন।
তিনি একইসঙ্গে বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন প্রতিষ্ঠার ল্েয সাহসী ও দৃঢ় নেতৃত্ব প্রদানের জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টনিও গুটেরেজকেও ধন্যবাদ জানান।
প্রধানমন্ত্রী ৭৩তম সাধারণ অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ‘মেকিং দ্য ইউনাইটেড নেশন্স রিলেভেন্ট টু অল পিপল : গ্লোবাল লিডারশিপ অ্যান্ড শেয়ারড রেসপন্সিবিলিটিজ ফর পিসফুল, ইক্যুইটেবল অ্যান্ড সাসটেইনেবল সোসাইটিজ’ উল্লেখ করে বলেন, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য আমাকে অতীতের কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতির পাতায় নিয়ে গেছে। তিনি এ সময় ব্যক্তিগত স্মৃতি রোমন্থনে ৪৪ বছর আগে এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁর বাবা এবং বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলায় প্রদত্ত ভাষণটি স্মরণ করেন।
সেই ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, মানবজাতির অস্তিত্ব রার জন্য শান্তি একান্ত দরকার। এই শান্তির মধ্যে সারা বিশ্বের সকল নর-নারীর গভীর আশা-আকাক্সা মূর্ত হয়ে রয়েছে। এই দুঃখ-দুর্দশা-সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে জাতিসংঘ মানুষের ভবিষ্যৎ আশা-আকাক্সক্ষার কেন্দ্রস্থল।
বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের পর একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশকে গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশের মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরে আসে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের জনগণের, মাত্র সাড়ে তিন বছর তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকেরা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। একইসঙ্গে তারা আমার মা, ৩ ভাই এবং পরিবারের অন্য সদস্যসহ ১৮ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ৭৩তম অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে অবিলম্বে মিয়ানমারের সঙ্গে জাতিসংঘের চুক্তি বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটসহ বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেহেতু রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার উদ্ভব হয়েছে মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও হতে হবে মিয়ানমারে। জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের যে চুক্তি হয়েছে আমরা তারও আশু বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা দেখতে চাই। আমরা দ্রুত রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ মানবিক কারণে মিয়ানমারের ১১ লাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় প্রদান করেছে, যারা এখন অনেকটা মানবেতর জীবনযাপন করছে। বাংলাদেশ সাধ্যমতো তাদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং শিশুদের যতেœর ব্যবস্থা করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় প্রথম থেকেই আমরা তাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিক চুক্তি স্বারিত হয়েছে। তবে মিয়ানমার মৌখিকভাবে সবসময়ই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে বলে অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বব্যাপী বিপুলসংখ্যক নিপীড়িত ও রোহিঙ্গার মতো নিজ গৃহ থেকে বিতাড়িত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আমার হৃদয়কে ব্যথিত করে। এ জাতীয় ঘটনাকে অগ্রাহ্য করে শান্তিপূর্ণ, ন্যায্য ও টেকসই সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আমাদের দেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছিল মিয়ানমারের ঘটনা সে কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়। ১৯৭১ সালে ৯ মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানিরা ৩০ লাখ নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করেছিল। ২ লাখ নারী পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এক কোটি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ওপর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের যে বিবরণ জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাতে আমরা হতভম্ব।
‘একজন মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুঃখ-দুর্দশাকে আমরা যেমন অগ্রাহ্য করতে পারি না, তেমনি পারি না নিশ্চুপ থাকতে’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আশা করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে জাতিসংঘ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ওপর ঘটে যাওয়া অত্যাচার ও অবিচারের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যতদিন তাদের নিজ দেশে ফেরত যেতে না পারবেন, ততদিন সাময়িকভাবে তারা যাতে মানসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে বসবাস করতে পারেন, সে জন্য শিা, স্বাস্থ্যসহ সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রেখে আমরা নতুন আবাসন নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ওআইসিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা যারা এেেত্র সহানুভুতি দেখিয়েছেন এবং সাহায্য ও সহযোগিতা করে চলেছেন তাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানসম্মত পরিবেশে বসবাস নিশ্চিত করতে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের উদ্যোগে বাংলাদেশকে সহযোগিতার জন্যও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দুই.
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেয়া তাঁর ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য অংশ, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার সপে তাঁর অবস্থান, নারীর মতায়ন এবং জাতিসংঘ নির্ধারিত ল্যমাত্রা অর্জনে তাঁর দৃঢ় সংকল্প তুলে ধরেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ভ্রাতৃপ্রতিম ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন আজও অব্যাহত রয়েছে, যা আমাদের মর্মাহত করে। এ সমস্যার আশু নিষ্পত্তি প্রয়োজন। ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে আমরা ওআইসির মাধ্যমে ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানে কাজ করে যাব।
শেখ হাসিনা বলেন, মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে তিনটি মৌলিক উপাদান বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে, তা হলোÑ শান্তি, মানবতা ও উন্নয়ন। তাই মানবসমাজের কল্যাণে আমাদের মানবতার পে সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণকে সেবা প্রদান এবং তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করাই আমাদের মূল ল্য হওয়া উচিত। মানবতা ও সৌহার্দ্যই আমাদের টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সমস্যাসঙ্কুল এই পৃথিবীতে আমাদের সম্মিলিত স্বার্থ, সমন্বিত দায়িত্ব ও অংশীদারিত্বই মানবসভ্যতাকে রা করতে পারে।

তিন.
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেয়া তাঁর ভাষণে বলেন, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরা কার্যক্রমের অধীনে ৫৪টি মিশনে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১০ জন শান্তিরী প্রেরণের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি রায় বিশেষ অবদান রেখেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের ১৪৫ জন শান্তিরী জীবনদান করেছেন। বর্তমানে ১০টি মিশনে ১৪৪ জন নারীসহ বাংলাদেশের মোট ৭ হাজারেরও বেশি শান্তিরী নিযুক্ত রয়েছেন। আমাদের শান্তিরীগণ তাদের পেশাদারিত্ব, সাহস ও সাফল্যের জন্য ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন।

চার.
নিরাপদ, নিয়মিত ও নিয়মতান্ত্রিক অভিবাসন বিষয়ক গ্লোবাল কম্প্যাক্ট-এর মূল প্রবক্তা হিসেবে বাংলাদেশ আরও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং মানবাধিকারকেন্দ্রিক একটি কম্প্যাক্ট প্রত্যাশা করেছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রোপটে অভিবাসন বিষয়ক এই কম্প্যাক্ট অভিবাসীদের অধিকার রায় একটি ক্রমপরিবর্ধনশীল দলিল হিসেবে কাজ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। ‘বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদসহ সকল সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের ভূখ-ে প্রতিবেশী দেশগুলোর স্বার্থবিরোধী কোনো কার্যক্রম বা সন্ত্রাসী কর্মকা- আমরা পরিচালিত হতে দেব না। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে।
সহিংস উগ্রবাদ, মানবপাচার ও মাদক প্রতিরোধে আমাদের সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করার নীতি বিশেষ সুফল বয়ে এনেছে বলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গৃহীত গ্লোবাল কল টু অ্যাকশন অন দ্য ড্রাগ প্রবলেম-এর সঙ্গে বাংলাদেশ একাত্মতা ঘোষণা করেছে বলেও প্রধানমন্ত্রী জানান।

পাঁচ.
বাংলাদেশ সরকারের উন্নয়ন নীতিমালার সাফল্য তুলে ধরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৯ সাল থেকে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনকল্যাণমুখী উন্নয়ন নীতিমালা বাস্তবায়ন করে চলেছি। সরকারের সাড়ে ৯ বছরের শাসনে বাংলাদেশ আর্থসামাজিক েেত্র অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে আমরা জনগণের সকল প্রত্যাশা পূরণে সচেষ্ট রয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে বাংলাদেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের বিবেচনায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ৪৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। আমাদের মাথাপিছু আয় ২০০৬ সালের ৫৪৩ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮ সালে ১ হাজার ৭৫১ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার গত অর্থবছরে ছিল শতকরা ৭ দশমিক ৮৬ ভাগ। মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালের শতকরা ৪১ দশমিক ৫ ভাগ থেকে শতকরা ২১ দশমিক ৪ ভাগে হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে হতদরিদ্রের হার ২৪ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের বৈশ্বিক মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যাত্রা শুরু করেছে। স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণের এই যাত্রাপথ আমাদের টেকসই উন্নয়ন ল্যমাত্রার পরিকল্পনার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, যা আমাদের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সরকার টেকসই
উন্নয়ন ল্যমাত্রা বাস্তবায়নে পুরোপুরি
অঙ্গীকারবদ্ধ।
সরকার দেশে ১০০টি নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল সৃষ্টি করছে, যা প্রায় এক কোটি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রোপটে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপক ও অপরিসীম সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কর রেয়াত, দ্বৈতকর পরিহার, শুল্কছাড়সহ বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে।

ছয়.
জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের যৌথ উদ্যোগে ১১টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈশ্বিক নেতৃবৃন্দের কাছে পানির যথাযথ মূল্যায়ন, ব্যবস্থাপনা এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে জরুরি পদপে গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, সকলের জন্য সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং এ বিষয়ক টেকসই উন্নয়ন ল্যমাত্রা-৬ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ইতোমধ্যে, বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ স্যানিটেশন এবং ৮৮ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির সুবিধা পাচ্ছেন।
সরকারের দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম পদপে, সামাজিক নিরাপত্তাবলয় কর্মসূচির উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ৬৫ লাখ বয়স্ক নারী-পুরুষ, বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা নারী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন। সরকার উদ্ভাবিত দারিদ্র্য বিমোচনের আর্থসামাজিক পদপেসমূহ বহুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ুদ্র সঞ্চয় ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। গৃহহীন নাগরিকমুক্ত বাংলাদেশ সৃষ্টির ল্য নিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্প গ্রহণ করা
হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ায় লক্ষ্যে তাঁর সরকারের নেয়া উল্লেখযোগ্য পদপেসমূহের উল্লেখ করে বলেন, আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে শহরের সুবিধাসমূহ পৌঁছে দেয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি।

সাত.
মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ভূখ-ে ১৬ কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস উল্লেখ করে জাতিসংঘে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা বিভিন্ন সামাজিক সূচকে প্রভূত অগ্রগতি অর্জন করেছি। মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি ১ লাখে ১৭০ এবং পাঁচ বছর বয়সের নিচে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৮-এ হ্রাস পেয়েছে। মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছরে উন্নীত হয়েছে। প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার কমিউনিটি কিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। ৩০ প্রকারের ওষুধ বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে।
২০১০ সাল থেকে প্রাক-প্রাথমিক হতে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হচ্ছে উল্লেখ করে শিার প্রসারে বাংলাদেশ সরকারের পদপেসমূহ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, চলতি বছর ৪ কোটি ৪২ লাখ ৪ হাজার ১৯৭ শিার্থীর মধ্যে ৩৫ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার ১৬২টি বই বিতরণ করা হয়েছে। দৃষ্টিহীনদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতির বই এবং ুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিার্থীদের মধ্যে তাদের মাতৃভাষার বই দেয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক হতে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ৩ লাখ শিার্থীর মধ্যে বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। ১ কোটি ৪০ লাখ প্রাথমিক শিার্থীর মায়েদের কাছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বৃত্তির টাকা পৌঁছে যাচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত হয়েছে। শিার হার গত সাড়ে ৯ বছরে ৪৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৭২ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের অভাবনীয় উন্নয়নের অন্যতম নিয়ামক হলো নারীর মতায়ন ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ। নারীশিার উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের মাধ্যমে নারীর মতায়ন আমরা নিশ্চিত করেছি। সরকারি শিা প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনাবেতনে লেখাপড়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়ে ও ছেলে শিার্থীর অনুপাত ৫৩:৪৭, ২০০৯ সালের শুরুতে যা ছিল ৩৫:৬৫।
বাংলাদেশের কৃষি, সেবা ও শিল্পখাতে প্রায় ২ কোটি নারী কর্মরত রয়েছেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সর্ববৃহৎ উৎস তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪৫ লাখ কর্মীর ৮০ শতাংশই নারী। নারী উদ্যোক্তাদের জামানত ছাড়াই ৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জে ব্যাংকঋণের সুবিধা দেয়া হচ্ছে। ুদ্র উদ্যোক্তা তহবিলের ১০ শতাংশ এবং শিল্প প্লটের ১০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে নারীর রাজনৈতিক মতায়নের জন্য প্রতিটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ৩৩ শতাংশ আসন নারীর জন্য সংরতি রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের সংসদই সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র সংসদ যেখানে সংসদ নেতা, সংসদ উপনেতা, স্পিকার এবং বিরোধী দলীয় নেতা নারী। বর্তমান সংসদে ৭২ জন নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্য
রয়েছেন।

আট.
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে সর্বাধিক ঝুঁকির সম্মুখীন পৃথিবীর প্রথম ১০টি দেশের একটি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে আমরা আমাদের মোট দেশজ উৎপাদনের এক-শতাংশ ব্যয় করছি এবং জলবায়ুসহায়ক কৃষিব্যবস্থা প্রবর্তন করছি। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ এবং ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য-সুন্দরবন সংরণে ৫ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। সরকার উন্নয়ন কার্যক্রম এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সমতা সৃষ্টিতে গৃহীত পদপেসমূহকে একীভূত করে বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ শীর্ষক মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ একটি জলকেন্দ্রিক, বহুমুখী এবং টেকনো-ইকোনমিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বাংলাদেশই পৃথিবীর একমাত্র দেশ যে দীর্ঘ ৮২ বছর মেয়াদি এই পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

নয়.
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, অটিজম ও জন্মগত স্নায়ুরোগে আক্রান্ত শিশুদের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক েেত্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এ বিষয়ে কার্যক্রমকে জোরদার করতে এ সংক্রান্ত একটি সেল গঠনের প্রক্রিয়া চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এছাড়া অটিজম বিষয়ক জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি এবং জাতীয় অ্যাডভাইজরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সভাপতি এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অ্যাডভাইজরি প্যানেলের সদস্য সায়মা ওয়াজেদ হোসেন এ সংক্রান্ত বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার দণি এশিয়ার শুভেচ্ছা দূত নির্বাচিত হয়েছেন বলে ভাষণে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দশ.
ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণার মূল দর্শন জনকল্যাণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ মহাসচিব কর্তৃক হাই লেভেল প্যানেল অন ডিজিটাল কো-অপারেশন প্রতিষ্ঠাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎপেণের মধ্য দিয়ে আমরা মহাকাশ প্রযুক্তির জগতে প্রবেশ করেছি। বস্তুত এটি ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে স্যাটেলাইট ভূকেন্দ্র স্থাপন করার মাধ্যমে তিনি যে স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন এই স্যাটেলাইট উৎপেণের মধ্য দিয়ে তা বাস্তবায়িত হয়েছে।