কলাম

‘জাতীয় ঐক্য সমাবেশ’ নিয়ে একটি হিসাব-নিকাশ

আবদুল গাফফার চৌধুরী : সম্পূর্ণ অনুমানের ওপর নির্ভর করে কিছু লিখতে চাই না। তাই ঢাকায় ২২ সেপ্টেম্বরের ‘জাতীয় ঐক্য সমাবেশ’ কতটা সফল হয়েছে এবং তাতে বিএনপি জোট ও যুক্তফ্রন্টের মধ্যে কতটা গিঁট বাঁধা হয়েছে সে সম্পর্কে সব খবর পুরোপুরি না জানা পর্যন্ত কিছু লিখতে চাই না। জানার সঙ্গে সঙ্গেই লিখবÑ আমার কলামের পাঠকদের এই আশ্বাস দিয়ে রাখতে পারি। তবে দেশের রাজনীতি ধীর লয়ে হলেও কোনদিকে ঘুরছে সে সম্পর্কে সম্ভবত কিছু আলোচনা করতে পারি।
কিছুদিন আগে ঢাকার একটি কাগজে খবরের হেডিং দেখেছি, ‘বিএনপি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনে নেবে’। এই ভবিষ্যদ্বাণীটা আমি বহু আগে করেছি। লিখেছিলাম, প্রত্য অথবা প্রচ্ছন্ন যেভাবেই হোক বিএনপি ও যুক্তফ্রন্টের মধ্যে একটা সমঝোতা না হয়ে উপায় নেই। জামায়াতিরা সঙ্গে থাকলে যুক্তফ্রন্ট বিএনপিকে জাতীয় ঐক্যে ডাকবে না বলে ড. কামাল হোসেন যে কথা বলেছেন, তা সম্পূর্ণ বোগাস কথা। এই লব্ধপ্রতিষ্ঠ আইনজীবী নিজেও জানেন, নির্বাচনে স্বনামে আসার নিবন্ধন জামায়াতের নেই। তারা নির্বাচনে আসবে বিএনপির মনোনয়নে এবং বিএনপির প্রার্থী পরিচয়ে। সুতরাং বিএনপি যদি যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে কণ্ঠিবদলের সময় বলে, জামায়াত আমাদের সঙ্গে নেই, তাহলেই ড. কামাল হোসেনের শর্ত পূর্ণ হয়ে যাবে এবং বিএনপির ‘গণতান্ত্রিক সংগ্রামে’ নেতৃত্ব দিতে তিনি এগিয়ে যেতে পারবেন। জনগণকে বোকা বানানোর এর চাইতে বড় কৌশল আর কী হতে পারে!
ডা. বদরুদ্দোজা অসুস্থতার জন্য যুক্তফ্রন্টের ৫ দফা কর্মসূচি ও ৯ দফা ল্য ঘোষণার সভায় আসেননি বলা হয়েছে। পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনেও আসেননি। তিনি অসুস্থ হতে পারেন, কিন্তু তার পুত্র এবং সাধারণ সম্পাদকও কি অসুস্থ? আমার তো মনে হয়, এটাও একটা রাজনৈতিক নাটক।
২২ সেপ্টেম্বরের ‘সমাবেশে’ তিনি এসেছেন। এখন বুঝতে হবে রিহার্সাল রুমেই নাটকটির যবনিকা টানা হয়েছে। বিএনপি ও যুক্তফ্রন্টের জোটেই তার আসার কথা। কারণ এরাই তার ন্যাচারাল এলাই। বিএনপি ও যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলোর মধ্যে কোনো নীতি ও ল্যগত ঐক্য নেই কিন্তু একটি কমন ইস্যুতো আছে। সেটি হলো হাসিনা-বধ।
সুতরাং ডা. বি. চৌধুরী বড়শি গেলার আগে যতই পানিতে একটু ঝাঁপাঝাপি করে নিজের গুরুত্ব বাড়ান এবং নিজের নেতৃত্বের ভিত্তি শক্ত করুন, তিনি যুগল ফ্রন্টেই থাকবেন। যুক্তফ্রন্টের কোনো দফাতে তার অসম্মতি বা পুত্রের সঙ্গে মনোমালিন্য এগুলো রাজনৈতিক রূপক গল্প মাত্র। রাজনৈতিক নেতারা যেকোনো সময় অভিনয়ে পারদর্শী এটা তার প্রমাণ।
বিএনপি ও যুক্তফ্রন্টের মধ্যে যদি নির্বাচনি ঐক্য হয় তাহলে আমি সবচেয়ে খুশি হব। এই ঐক্য নিশ্চিত করবে যে, বিএনপি মুখে নির্বাচন বর্জনের যত কথাই বলুক, ড. কামাল হোসেনের জামার ঘুঁটি ধরে নির্বাচনে আসবেন। এটা হবে তাদের মুখরার শ্রেষ্ঠ উপায়। এজন্যই আগেভাগেই বলা হয়েছে, ‘বিএনপি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনে নিতে রাজি।’
লন্ডনের বাংলা কাগজগুলো খবর দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরার সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের ভারপ্রাপ্ত নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং তার নির্দেশ নিয়েছেন। তারেক রহমান বলেছেন, খালেদা জিয়া জেলে থাকলেও বিএনপিকে নির্বাচনে যেতে হবে। তবে দলনেত্রীর মুক্তির জন্য আন্দোলনও চালিয়ে যেতে হবে।
বিএনপি যে নির্বাচনে যাবে সেকথা আমি বহু আগ থেকে বলে আসছি। এটা কোনো গণক ঠাকুরের গণনা নয়, একজন সাংবাদিকের রাজনীতি বিশ্লেষণ। বিএনপি জানে, সরকারকে তাদের দাবি মানতে বাধ্য করার মতো আন্দোলন চালানোর রাজনৈতিক শক্তি তাদের নেই। আগের মতো সন্ত্রাস করতে গেলে সরকার এবং জনগণের মিলিত প্রচ- মার তারা খাবেন। বিদেশে বিপুল অর্থব্যয়ে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে যে বিশাল প্রোপাগান্ডা অভিযান চলছে তাতে তাদের অর্থয়ই হচ্ছে মাত্র, প্রভাবশালী দেশগুলোকে প্রভাবিত করা যাচ্ছে না। স্বয়ং দলের মহাসচিব বিদেশে গিয়ে চুনোপুঁটিদের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন, গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের দেখা পাননি। এখন দেশে ফিরে এই সফরের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য সাফল্যের ঢোলক পেটালে তো চলবে না। একুশ শতকের মানুষের সদাসতর্ক চোখে ধুলা নিপে কষ্টকর। পশ্চিম গোলার্ধের সামান্য খবরও পূর্ব গোলার্ধে এসে পৌঁছতে কয়েক সেকেন্ড লাগে। আগে কিছু লোক হজে যাওয়ার নাম করে বোম্বাই (বর্তমানে মুম্বাই) পর্যন্ত গিয়ে গ্রামে ফিরে এসে বলত তারা হজ করে এসেছে। তাদের বলা হতো ‘বোম্বাইয়া হাজী’। এখন বোম্বাইয়া হাজী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
যাহোক বিএনপি নেতাদের এই ‘বোম্বাইয়া হজের’ পর এখন সামনে দুটো পথ খোলা। নির্বাচন-বর্জন দ্বারা খালেদা-তারেক নেতৃত্বের যুগের অবসান মেনে নেয়া অথবা নির্বাচনে গিয়ে একানব্বইয়ের মতো অভাবিত জয়লাভ, অথবা জয়লাভ না করলে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল গঠন। তাহলে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব বহাল থাকবে এবং তারেক রহমানেরও দেশে ফেরার একটা সম্ভাবনা থাকবে।
সম্ভবত এসব চিন্তাভাবনা থেকেই খালেদা এবং তারেক, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনে তার ফ্রন্টের সঙ্গে প্রত্য বা পরো ঐক্য গড়ে নির্বাচনে যাওয়ার কথা ভাবছেন। মির্জা ফখরুল নাকি তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডন-বৈঠকে সেরকম নির্দেশই পেয়েছেন। ড. কামাল হোসেন যিনি দু’দিন আগেও তারেক রহমানের নাম শুনলে ছিঃ ছিঃ করে উঠতেন, তিনি তার অতীতের নির্বাচনি পরাজয়গুলোর কথা স্মরণ করে এই শেষ বয়সে শেষ নির্বাচনি যুদ্ধে জয়ী হওয়ার আশায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দলের সঙ্গে তার ‘পবিত্র হাত’ মেলাতে হয়ত রাজি হয়েছেন। গরজ বড় বালাই। শুনেছি, বিপদে পড়লে বাঘে আর মোষে একত্রে জলপান করে। আর এ তো কামাল হোসেন আর তারেক রহমানের কথা।
শিগগিরই আভাস পাওয়া যাবে দুই জোটের মিতালি কতদূর এগোবে। যুক্তফ্রন্টের ঘোষিত কর্মসূচি আসলে বিএনপি’র কর্মসূচিরই পুনরাবৃত্তি। টার্গেট শেখ হাসিনা। সুতরাং এই ঐক্য হবে ম্যারেজ অব কনভিনিয়েন্স। কমন এনেমি বধ করা গেলে এবং না গেলেও এই ম্যারেজ টিকবে না। পিতৃবন্ধু এবং নিজ দলের রাষ্ট্রপতি ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে পর্যন্ত যে তারেক রহমান সহ্য করেননি, বরং বঙ্গভবন থেকে অপমান করে বের করে দিয়েছিলেন, তিনি নির্বাচনের পর ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব সহ্য করবেন, এটা কোনো পাগলেও বিশ্বাস করবে কি?
যাহোক, এগুলো অনেক পরের কথা, পরে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা মনে করেই যুক্তফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী হঠাৎ প্রকৃত অসুস্থতা অথবা রাজনৈতিক অসুস্থতায় ভুগছেন কি না আমি জানি না। তবে তার রোগ সারাবার জন্য বিএনপি নেতারা তার বাসায় যে গেলেন তাতে তাজ্জব হওয়ার কিছু নেই। খবর বেরিয়েছে, তারেক রহমানও নাকি লন্ডন থেকে ডা. বদরুদ্দোজার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করেছেন। কি কথা হয়েছে, তা জানা যায়নি। তবে দুষ্টু লোকেরা প্রচার করছে, ডা. চৌধুরীকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে, আগামী নির্বাচনে জয়ী হলে এবং ডা. চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হলে তাকে আবার বঙ্গভবন থেকে পুলিশ পাহারায় বেরিয়ে আসতে হবে না।
২২ সেপ্টেম্বরের সমাবেশে প্রকৃত জনতার কতটা সমাবেশ ঘটেছে আর জামায়াতিরা মসজিদ আর মাদ্রাসা থেকে এসে মহানগর নাট্যমঞ্চ কতটা ভরিয়েছে, সে খবর জানার জন্য অপো করতে হবে। শহীদ সাংবাদিক খোন্দকার আবু তালেব আজ বেঁচে নেই। তিনি বেঁচে থাকলে সভাস্থলের প্রতি ইঞ্চি জমি মেপে সঙ্গে সঙ্গে সেই খবর বের করে দিতেন। আইয়ুব-মোনায়েমের জনসভা সম্পর্কে এরকম হিসাব (কতটা জনতা আর কতটা সাদা পোশাক পরা পুলিশ) তিনি বহুবার দিয়েছেন।
বর্তমানে খালেদা-তারেকের নেতৃত্বাধীন বিএনপিই দেশের সবচেয়ে বড় বিরোধী দল। তাদের জোটও বড়। এই জোটকে বলা হয় ২০ দলীয় জোট। এই দলের নেত্রী খালেদা জিয়া তিন তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে ড. কামাল হোসেন প্রত্যেকটি নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীÑ এমনকি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও। এই অবস্থায় বিএনপি ও যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনি জোট বাঁধলে সেই জোটে বড় দল হিসাবে খালেদা জিয়া অথবা তারেক রহমানেরই নেতা হওয়ার কথা। তারা সেটা স্বেচ্ছায় ড. কামাল হোসেনকে ছেড়ে দিতে রাজিÑ এই খবরটা পাঠ করার পর স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জেগেছে, এটা কি বিএনপির মহত্ত্ব, না কোনো রাজনৈতিক অপকৌশল?
অতীত থেকে একটা উদাহরণ টানি। পাকিস্তান আমলে এক সময় জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র তেরো জন। ইসকান্দার মির্জা তখন দেশের প্রেসিডেন্ট। তার দল রিপাবলিকান পার্টির সদস্যরা ছিলেন বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। এই অবস্থায় রিপাবলিকান পার্টি জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব মেনে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রীর পদ দিয়ে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠনে রাজি হয়। তখন সন্দেহবাদীরা বলেছিল ‘ডালমে কুছ কালা হ্যায়’। কিছুদিনের মধ্যেই পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট ব্যবস্থা এবং পূর্ব পাকিস্তানে প্যারিটি সিস্টেম তাকে দিয়ে মানিয়ে নেয়ার পর সরকার গঠনের মাত্র তেরো মাসের মাথায় প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মির্জা শহীদ সাহেবকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। রিপাবলিকান পার্টি তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। অনেকের ধারণা, ড. কামাল হোসেন তার কৈশোরকাল থেকেই ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতির ভাবশিষ্য। শহীদ সাহেবের জীবন থেকেই তার শিাগ্রহণ উচিত বলে অনেকে মনে করেন।
২২ সেপ্টেম্বরের সমাবেশ সফল না বিফলÑ সেই আলোচনায় যেতে চাই না। ডা. বদরুদ্দোজার গোঁসা ভেঙেছে কি না এবং বিএনপি নেতারা সমাবেশে এসে ড. কামাল হোসেনের গলায় নেতৃত্বের মালা সত্যি সত্যি পরিয়ে দিয়েছে কি না সে খবর নিশ্চয়ই জানা যাবে। আমার ধারণা, সেই মালা তিনি পরবেন এবং গাইবেন, ‘এই মণিহার আমায় নাহি সাজে/একে পরতে গেলে বাঁধে, ছিঁড়তে গেলে লাগে।’
আমার কামনা, দুই জোটের মধ্যে ঐক্য হোক। তাতে সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের ধুয়া তোলার আর সুযোগ থাকবে না। আওয়ামী লীগকে বহু ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হবে না। আর নির্বাচনের আগে এই সত্যটাই স্পষ্ট হবে, এই তথাকথিত জাতীয় ঐক্য প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে জনতার ঐক্য অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।