প্রতিবেদন

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : স্বাধীন মতপ্রকাশ হরণের জন্য নয়, ডিজিটাল অপরাধ দমনের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণীত হয়েছে

গণমাধ্যম কিংবা সাংবাদিকদের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার হরণের জন্য নয়, ডিজিটাল অপরাধ দমনের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণীত হয়েছে জানিয়ে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সাংবাদিকদের একটি অংশ এবং সুশীলসমাজের কেউ কেউ দেশ ও সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের কথা বিবেচনা না করেই ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীস্বার্থে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরোধিতা করছেন।
প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা শেখ হাসিনা গত ২০ সেপ্টেম্বর ১০ম জাতীয় সংসদের ২২তম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে একথা বলেন। ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এ সময় স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ কেউ ব্যক্তিস্বার্থ থেকে মতামত দিয়ে এ আইনের বিরোধিতা করছেন। কিন্তু সমগ্র দেশ ও সমাজের স্বার্থে এটি যে গুরুত্বপূর্ণ তা তারা ভাবেননি। কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, সাংবাদিক, সম্পাদক ডিজিটাল আইনের বিরোধিতা করছেন। তারা বলছেন, এ আইন প্রণয়নের ফলে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ হয়ে যাবে। কিন্তু শেখ হাসিনা বলেন, তাদের কণ্ঠ তো রোধ হয়নি। কণ্ঠ রোধ হলে তো তারা এই যে মতামত দিচ্ছেন, তা-ও তো দিতে পারতেন না।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দুশ্চিন্তার কিছু নেই উল্লেখ করে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, দেশের স্বার্থেই ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন প্রণয়ন করেছে সরকার।
এই বিল নিয়ে সাংবাদিকদের এত উদ্বেগ কেন প্রশ্ন তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ, জাতি ও শিশুদের কল্যাণে আমরা এ আইন প্রণয়ন করেছি। মানুষকে অবশ্যই নিরাপত্তা দিতে হবে। সমাজকে রা করতে হবে। সংসারকে বাঁচাতে হবে। প্রতিটি মানুষের চরিত্র রা করতে হবে। সেদিক বিবেচনা করেই
আমরা এই ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল পাস করেছি।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সমালোচকদের উদ্দেশে সংসদ নেতা বলেন, এই আইন নিয়ে যারা অনেক সমালোচনা করছেন, তাদের বলব এই দেশে তো বহু ঘটনা ঘটে গেছে। অতীতের বিষয়গুলো আপনারা একটু চিন্তা করে দেখুন। তখন কেমন ছিল, এখন কেমন আছে? এখনতো সবই উন্মুক্ত। যে যার মতো লিখে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে এত উন্নয়ন, বিশ্ববাসীর চোখেও যা আজ দৃশ্যমান। সারাবিশ্বে বাংলাদেশ সমাদৃত হচ্ছে। বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কিছু পত্রিকার অহেতুক সরকারের সমালোচনার মনোভাব পরিহার করার এবং বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গঠনমূলক সমালোচনা হোক, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এমনভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা হয় যে, এই সরকার খুবই খারাপ কাজ করছে। কী খারাপ কাজটা করলাম, সেটাই আমার প্রশ্ন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা কোনো কিছু ভালো দেখতে পায় না, তারাই সব খারাপ দেখবে। এটাই তাদের চরিত্র। কিছু কিছু মানুষের চরিত্রই হচ্ছে তাদের কিছুই ভালো লাগে না। এটা এক ধরনের মানসিক অসুস্থতাও। এই অসুস্থতায় যারা ভুগছেন, তাদের জন্য আমার বলার কিছু নেই।
তিনি বলেন, আমি দেশকে ভালোবাসি, দেশকে জানি-চিনি। এই দেশ আমার, এই দেশ আমার বাবা স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। এই দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যই তিনি সারাজীবন জেল খেটেছেন। সারাজীবন কষ্ট শিকার করেছেন। দেশের উন্নয়ন করতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু পারেননি। তাকে হত্যা করা হয়েছে।
সরকার গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করতে কাজ করছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা সুযোগসন্ধানী তথাকথিত সুশীলদের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। গণতন্ত্র আছে বলেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের সব প্রত্যাশাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ মতায় আসার পর দেশের মানুষ আবার সুশাসন পেতে শুরু করলো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বে আজ উন্নয়নের রোল মডেল বাংলাদেশ। সারা বিশ্বে জঙ্গি-সন্ত্রাস বড় সমস্যা। তারপরও আমরা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে এ সমস্যা মোকাবিলা করেছি। মাদকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছি এবং নিচ্ছি। ফলে অনেক পরিবার ধ্বংসের হাত থেকে রা পাচ্ছে।
দেশের উত্তর জনপদে এখন আর কঙ্কালসার মানুষের দেখা মেলে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে খাদ্যের নিশ্চয়তার পাশাপাশি চিকিৎসাখাতে ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়েছে। গড় আয়ু এখন ৬৪ বছর থেকে ৭১ বছর বয়সে পৌঁছেছে। বিভিন্ন েেত্রর উন্নয়নের উদাহরণ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, মাত্র ৩ হাজার মেগাওয়াট থেকে আজকে ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে এই খাতের বিপুল উন্নয়ন করেছি। সব শিল্প-কারখানা যাতে চালু থাকতে পারে তার জন্য ব্যবস্থা নিয়েছি। সড়ক, নৌ ও বিমান সব েেত্রই উন্নয়ন হয়েছে।
‘বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের একটি দেশ’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড গঠন এবং জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রায় সরকারের বিভিন্ন পদপে তুলে ধরেন। শেখ হাসিনা বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা ভোগ বিলাসের জন্য নয়। এটা নীতির প্রশ্ন, আমাদের নীতি হচ্ছে জনগণের জন্য রাজনীতি করা এবং তৃণমূল থেকে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। তাই আজ মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে দশম জাতীয় সংসদের প্রশংসা করে বলেন, দশম জাতীয় সংসদে অশালীন কথা ছিল না, আজে-বাজে মন্তব্যও ছিল না। সুন্দর একটি পরিবেশ ছিল। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের এখন সংসদের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে সরকার ও বিরোধী দলের পারস্পরিক সহযোগিতার কারণে।