রাজনীতি

নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ ॥ নেত্রীর মুক্তি প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় নেতাদের দুষছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা : বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও সিদ্ধান্তহীনতায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বিএনপির ভোটের রাজনীতি

তারেক জোয়ারদার : দুর্নীতির দায়ে পাঁচ বছরের সাজা পেয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জেলে গেছেন প্রায় আট মাস। এখনো তিনি জামিন পাননি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তার কারামুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ। অথচ খালেদা জিয়া জেলে গেলে বিএনপি নেতারা তৃণমূল নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করেন এই বলে যে, আইনি প্রক্রিয়ায় শিগগিরই খালেদা জিয়ার জামিন হবে। তাই এ নিয়ে কঠোর আন্দোলনের কোনো প্রয়োজন নেই।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এখনও খালেদা জিয়ার জামিন হয়নি এবং তাঁর কারামুক্তির বিষয়টিও অনেকটা অনিশ্চিত। খালেদা জিয়া এখন জেলেই আছেন।
অনেকেই বলছেন, খালেদা জিয়া সেফ হোমে আছেন। দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে তিনি ইচ্ছে করেই সেন্ট্রাল জেলের মতো সেফ হোমে চলে গেছেন। আবার অনেকে বলছেন, জাতীয় ঐক্যের মতো কোনো একটি জোট গঠনের জন্যই খালেদা জিয়া পরিকল্পিতভাবে জেলে গেছেন। জাতীয় ঐক্য গঠিত হয়েছে। এখন এর ওপর ভর করেই খালেদা জিয়া জেল থেকে বের হয়ে আবার ক্ষমতার মসনদে গিয়ে বসবেন।
বাস্তবতা হচ্ছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্প ধারার সভাপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাতে বিএনপির যুক্ত হওয়ার পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে জামায়াত। বি. চৌধুরী, ড. কামাল ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার সাফ কথাÑ এই ঐক্যে জামায়াত থাকতে পারবে না। তবে বিএনপি এ ব্যাপারে সরাসরি হ্যাঁ অথবা না কোনোটিই বলতে পারছে না। বিএনপিও মনে-প্রাণে এই ঐক্য চায়, তবে জামায়াতের সঙ্গত্যাগের জন্য ঐক্যের অন্য উদ্যোক্তাদের প্রকাশ্য শর্ত নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছে দলটির নীতিনির্ধারক মহল।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট শরিক জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার কথা বলার পাশাপাশি আরও দুটি ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছেন ঐক্যের অন্য উদ্যোক্তারা। বদরুদ্দোজা চৌধুরী, আ স ম আবদুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট আগামী নির্বাচনে বিএনপির কাছে ১৫০টি আসনে ছাড় চায়। তারা বলছেন, রাজনীতিতে ভারসাম্য আনতে এবং আগামীতে সরকার গঠন করতে পারলে মতার ভারসাম্য সৃষ্টির ল্েযই তারা আসনের এই সমতা চান। বি. চৌধুরী স্পষ্ট করে ১৫০ আসনের কথা বললেও মান্না অবশ্য এটাকে কিছুটা রয়েসয়ে বলছেন ‘হয়ত বাস্তবসম্মত নয়’। আর রব এ প্রশ্নে তার অবস্থান এখনও স্পষ্ট করেননি।
দ্বিতীয় ইস্যুটি হচ্ছে বর্তমান সরকার বিদায় নিলে নতুন সরকার এসেও যেন স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, বিএনপির কাছে সেই প্রতিশ্রুতি চান অন্যরা। প্রতিশ্রুতি মিললে প্রয়োজনে বিএনপির সাথে লিখিত চুক্তির কথাও ভাবছেন তারা। এ ল্েয তারা উদাহরণ হিসেবে সামনে আনছেন মালয়েশিয়ায় ড. মাহাথির মোহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির কথা।
সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনেই উল্লেখিত দুটি ইস্যুতে এবং জামায়াতকে ছাড়ার কথা বলেন ড. কামালসহ অন্যরা। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কার্যত এই ৩টি ইস্যুতে মিটমাট হচ্ছে না বলেই বিএনপির সঙ্গে অন্যদের জোড়া লাগছে-লাগছে করেও লাগছে না। আর বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানান, নিরপে সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিই এখন তাদের কাছে অগ্রাধিকার। তাদের মতে, অন্য ইস্যুকে সামনে এনে ঐক্যের উদ্যোগ যেন বিফলে না যায়।
জাতীয় ঐক্যের নেতা আ স ম আবদুর রব বলেন, এ সরকারের পতনের জন্য আমরা ঐক্য চাই। তবে আবারও যেন স্বৈরতন্ত্র সৃষ্টি হতে না পারেÑ সেটাও আমাদের দেখতে হবে।
যুক্তফ্রন্ট নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এরশাদের পতনের পর থেকে আমরা দেখে আসছি, যে মতায় গেছে, সে-ই স্বৈরাচার হয়েছে। এক স্বৈরাচার গেলে আরেক স্বৈরাচার আসবেÑ এটা বন্ধ করতে হবে। রাজনীতি ও মতার ভারসাম্য সৃষ্টি করতে হবে। আমরা স্বৈরাচার ও স্বৈরতন্ত্রমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চাই।
ঐক্যের ল্েয বিএনপি ৭টি দফা দিয়েছে উল্লেখ করে মান্না বলেন, আমরা যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের কথা বলছি সেখানে জামায়াত থাকতে পারবে না।
ঐক্যের অন্য উদ্যোক্তাদের জামায়াত নিয়ে আপত্তিসহ অন্যান্য বিষয় প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য চাই। কারাগারে যাওয়ার আগে আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ার ডাক দিয়েছেন। আমাদের প থেকে আমরা বারবার বলেছি খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে হবে, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে, নিরপে সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙ্গে দিতে হবে, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে এবং নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে মোতায়েন করতে হবেÑ এসব কমন ইস্যুর ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য হওয়া উচিত।
কিন্তু সেই জাতীয় ঐক্য নিয়েই এখন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে আছে বিএনপি। বিএনপির একটি পক্ষ চাচ্ছে জাতীয় ঐক্যের প্রধান হোক বদরুদ্দোজা চৌধুরী। আরেক পক্ষ চাচ্ছে জাতীয় ঐক্যের প্রধান হোক ড. কামাল হোসেন। তৃতীয় আরেকটি পক্ষ বলছে ঐক্য- ফৈক্যের দরকার নেই। এখন দরকার আন্দোলন। খালেদা জিয়ার কারামুক্তির জন্য কঠোর আন্দোলন।
খালেদা জিয়ার কারামুক্তি নিয়ে বিএনপির আন্দোলন এখন রহস্যের ঘেরাটোপে বাধা। বিএনপি আসলে খালেদা জিয়ার কারামুক্তি চায় কি না সেটিও একটি বড় প্রশ্ন। খালেদা জিয়া জেলেই থাকুকÑ এই পক্ষটি বিএনপিতে যেমন সক্রিয়, তেমনি আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়ে জনগণের মাঝে আসুকÑ এমন পক্ষও বিএনপিতে সক্রিয়।
খালেদা জিয়ার জেলে থাকা এবং না থাকা নিয়ে বিএনপিতে নেতায় নেতায় যে দ্বন্দ্ব কাজ করছে, তা সংক্রমিত হয়েছে পুরো বিএনপিতে। বিএনপির একটি পক্ষ চাচ্ছে খালেদা জিয়াকে জেলে রেখেই বিএনপি নির্বাচনে যাক। আরেকটি পক্ষ চাচ্ছে আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারপর নির্বাচন।
নির্বাচন আগে না খালেদা জিয়ার মুক্তি আগেÑ এই বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর সিদ্ধান্তহীনতায় এখন দুলছে বিএনপি। এই দোলাচল ভোটের রাজনীতিতে দলটিকে ক্রমেই পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।