সাহিত্য

পথের পাঁচালী : পথের নয়, জীবনের কাহিনি

ড. ফজলুল হক সৈকত : সমকালের জীবনছবি আর প্রকৃতির নিবিড় পর্যবেণের রূপকার হিসেবে বাংলাসাহিত্যে অনন্য স্থান অধিকার করে আছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম: ১২ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪; মৃত্যু: ১ সেপ্টেম্বর ১৯৫০)। ইউরোপ-আমেরিকার নবজীবন-চেতনার প্রবাহে, বিশেষত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে সামাজিক ও নৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের প্রবল হাওয়ায়, ভারতে নাগরিকজীবনে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে বিভূতির সৃষ্টিশীল মনোভূমিতে খানিকটা চিন্তার ছায়ার আভাস প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। এছাড়া তখন পৃথিবীজুড়ে কার্ল মার্কসের বৈপ্লবিক সাম্যনীতি আর ফ্রয়েডের জটিল মনোসমীণতত্ত্ব ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করছিল। এমনতরো পরিবেশে ও সামাজিক রূপান্তরের সময় ক্রম-নগরায়নের ফলে গ্রামের গুরুত্ব যখন ভয়ানকভাবে কমতে বসেছে, তখন গ্রামকেই প্রধান কেন্দ্রস্থল বিবেচনায় রেখে বিভূতিভূষণ সাহিত্যচর্চার গুরুভার বইতে আরম্ভ করলেন। অবসাদ আর কান্তি থেকে নিজেকে ও অপরকে বাঁচাবার জন্য; কিংবা জীবনকে সাদাপথে দাঁড়াতে দিতে খটকা-লাগার প্রবল প্রবাহের মধ্যে খানিকটা খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নেবার বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও উদারতায় অবগাহনের নেশায় বিভূতির কথামালা যেন সাজিয়ে তুলেছে শিল্পের অপার বাগান। অথবা বলা চলে সৌন্দর্যের সুবিশাল উদ্যানেই তৈরি হয়েছে এই ফিকশন নির্মাতার চিন্তাভুবনের সুরম্য সব ঘরবাড়ি।
ব্যক্তিগত জীবনে শিকতা পেশায় নিয়োজিত, কথক ও পুরোহিতপুত্র এই প্রকৃতিপ্রেমিক মধুর ও কাব্যধর্মী ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন। শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের (১৮৭৬-১৯৩৮) পরবর্তীকালে বাঙালি ঔপন্যাসিকদের মধ্যে বিভূতিভূষণের পাঠকপ্রিয়তা অসাধারণ। বাংলা উপন্যাসের গতানুগতিকতার মধ্যে তার মৌলিকতা ও নবীনতা সমকালে ও উত্তরকালে এক বিস্ময়কর ঘটনা।
স্বপ্নলোকের নির্জন অনুভবের রূপকার বিভূতির সবচেয়ে পাঠকপ্রিয় ও দর্শকপ্রিয় সৃষ্টি সম্ভবত পথের পাঁচালী (প্রকাশকাল: ১৯২৯)। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬) জীবন-জিজ্ঞাসা কিংবা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৮-১৯৭১) জগৎ-ভাবনার সীমানা-প্রাচীরের অনেক দূরে এই বন্দ্যোপাধ্যায়ের, প্রায় সমকালের তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের একজন, নির্মাণ-অঞ্চল গড়ে উঠলো নিবিড় পর্যবেণ আর প্রকাশের শৈল্পিক প্রবণতার আবেগ ও উপলব্ধির ভিন্নতায়। কেবল প্রকৃতির ফ্রেমে-আঁটা ছবি কথামালায় সাজিয়ে তোলা তার ল্য ছিল না; প্রকৃতির রূপ ও রসের পাশাপাশি জীবনের চরম সত্যকেই তিনি তার সমূহ রচনার আরাধ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
সমকালীন বৈশ্বিক ও দেশীয় রাজনৈতিক বা নতুন-গড়ে-ওঠা সামাজিক-পারিবারিক সমস্যা-সংকটকে পাশ কাটিয়ে তিনি হয়তো আমাদের চেনাজগতের চিরন্তন গল্পমালা পাঠককে শোনাতে চেয়েছেন; আর এমনটা সম্ভবত হতে পেরেছে তার নিবিড়-জাগা শিল্পপ্রতিভার বিশেষ অভিনিবেশের ফলে। উত্তরকালের পাঠকের কাছে সমকালের বিভূতির পরিচয় যেন দিনদিন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আর বিভূতির প্রয়োজনও যেন বেড়ে চলেছে।
বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালি যখন পৃথিবীর নানান মতবাদ আর পরিবর্তনের দোলায় দুলছিল, ঠিক সেই সময়ে ঝাঁঝালো জীবনবোধের বেড়াজাল থেকে মানুষের অনাড়ম্বর ঘরোয়া পরিবেশে, মুক্তির অবকাশে সাহিত্যকে স্থিতি দিতে প্রয়াসী হলেন বিভূতি। চিরায়ত গ্রামের পারিবারিক জীবনের সরল-সোজা গল্পগুলো, স্বাভাবিক ঘটনাগুলো তার বর্ণনায় যেন নতুন করে কিংবা বলা চলে পূর্ণরূপে প্রকাশের পথ পেল। শরৎচন্দ্রের সাহিত্যে বিবৃত গ্রাম আর বিভূতিভূষণের চিত্রিত গ্রাম আলাদা। বিভূতি মানুষের জীবনের সাথে প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্ক আর বেঁচে থাকার মধ্যকার সৌন্দর্য ও রসবোধকে ধরতে পেরেছেন অনুভবের মমতায়। বিভূতির গ্রাম যেন সারা পৃথিবীতে বিরাজমান স্রষ্টার হাতে গড়া সকল গ্রামের এক সংপে ছবি। জীবনের মূলধারাকেই বোধ করি তিনি রূপ দিতে চেয়েছিলেন তার সমূহ রচনাকর্মে। প্রসঙ্গত তার একটি বক্তব্য থেকে কিছুটা পাঠ নিতে পারি। ১৯৩৮ সালে রংপুর সারস্বত সম্মেলনে বিভূতির প্রদত্ত ভাষণের অংশবিশেষ : সাহিত্য আমাদের কল্পনা ও অনুভব-বৃত্তিকে উজ্জীবিত করে। কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পী যত কথা বলেন, তার মর্ম এই যে আমাদের ধরণী ভারি সুন্দর- একে বিচিত্র বললেই বা এর কতটুকু বোঝান হল! আমাদের এই দৃষ্টিটি বারে বারে ঝাপসা হয়ে আসে, প্রকৃতির বাইরেকার কাঠামোটাকে দেখে আমরা বারে বারে তাকে ‘রিয়ালিটি’ বলে ভুল করি, জীবন-নদীতে অন্ধ গতানুগতিকতার শেওলাদাম জমে, তখন আর স্রোত চলে না; তাইতো কবিকে, রসস্রষ্টাকে আমাদের বার বার দরকার- শুকনো মিথ্যা-বাস্তবের পাঁক থেকে আমাদের উদ্ধার করতে।
বিভূতির জীবনদৃষ্টি আলাদা; বিশ্বপ্লাবী বিপুল নাস্তির বিপরীতে মহাকালাশ্রয়ী চৈতন্যে তিনি তার পাঠককে হাজির করতে চান। ধন-মান-যশ-শক্তির ডামাডোলের আড়ালে জ্যোৎস্নাস্নাত রূপালি নদীর ধারে তিনি গড়তে চান শান্তির সুনিবিড় আবাস। পথের পাঁচালীতে জীবনের রোমান্স আছে; রয়েছে অপরাজিততেও। বিভূতি মানতেন ‘জীবন খুব বড় একটা রোমান্স- বেঁচে থেকে একে ভোগ করাই রোমান্স-অতি তুচ্ছতম, হীনতম একঘেয়ে জীবনও রোমান্স।’
বিভূতি নিয়মভাঙার শিল্পী নন; যেখানে যা যেমন আছে, তাকে ঠিক জায়গায় ঠিকঠিক রেখে বিবরণের রূপকার তিনি। শিল্পনির্মাণ ভুবনে তিনি জীবন-অন্বেষায় যাযাবর নন; নীড়াশ্রয়ী নির্বিবাদী সংসারী। প্রতিদিনের পথে পথে চেনা মানুষ ও তাদের আনন্দ-বেদনার ওপর প্রকৃতির যে নিবিড় সঞ্জীবনী ছায়া পড়ে, তাকে আমাদের কাছে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন বিভূতি। আমরা জানি, সকলের দেখার ও দেখাবার ভঙ্গি ও সামর্থ্য এক রকম নয়। তেমনই প্রকৃতির নিটোল সৌন্দর্য-স্পর্শও সকলে পায় না, বিভূতি পেয়েছিলেন। তার কথাসাহিত্য, ডায়েরি, ভ্রমণকাহিনিÑ সর্বত্রই এই অনুভবের প্রকাশ আছে।
সমকাল আর চলমানতায় মহাকালকে চিহ্নিত করতে গিয়ে অপু নামক এক শিশুচরিত্রের মনোজগতের বিপুল বিস্ময় আর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে মিশিয়ে কথানির্মাতা বিভূতি মানবসংসারের পাটাতনে নির্মাণ করেছেন অপরিসীম রহস্যের সংকেত। অপু-দুর্গাদের পরিবারের দারিদ্র্য, পাড়াগাঁয়ের মানুষের ঈর্ষা-দ্বন্দ্ব-কলহ, পরস্পরের প্রতি সমবেদনা, প্রকৃতির অপার রহস্যের দিকে শিশুমনের অসীম টান, অবহেলা আর অসহায়তার মধ্যে ইন্দির ঠাকরুণ ও দুর্গার মৃত্যু- সবই ঔপন্যাসিক তুলে ধরেছেন প্রসারিত দৃষ্টির আলোয়। পথের পাঁচালী মূলত বহু জীবনের, অনেক সংসারের এবং বিচিত্র মানুষের কাহিনির বিরাট ক্যানভাস। লেখক যেন কী এক অজানা পথের সন্ধানে ধেয়ে চলেছেন এবাড়ি-ওবাড়ি, এপাড়া-ওপাড়া; হরিহর আর সর্বজয়াদের লৌকিক জীবন সে পথের কাছে বোধকরি অতি তুচ্ছ- এমন এক পথ। সম্ভবত জীবনের খ-তা ও ুদ্রতাকে পেরিয়ে, জাগতিক কোলাহলকে অতিক্রম করে পথের দেবতার অপ্রতিরোধ্য আহ্বানে ছুটে চলেছেন তিনি। তাই এখানে প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতা মিলে-মিশে একাকার হয়ে আছে! বিভূতি একবার মোহিতলাল মজুমদারকে বলেছিলেন পথের পাঁচালীতে তিনি াধংঃহবংং ড়ভ ঝঢ়ধপব ধহফ চধংংরহম ঞরসব-এর বিরাট রহস্যকে অনুধাবন করতে চেয়েছেন।
গ্রন্থটিকে তিনটি অধ্যায়ে বিভাজন করা হয়েছে- প্রথম অধ্যায়ে অপুর জন্ম ও বেড়ে ওঠার পরিপ্রেতি এবং ইন্দির ঠাকরুণের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি প্রজন্মের ঐতিহ্যসমেত অবসান, দ্বিতীয় অধ্যায়ে অপুর মাধ্যমে জগতকে দেখার ও দেখাবার অনুভব, তৃতীয় অধ্যায়ে আরেক প্রজন্মের সব গল্প ও স্বপ্ন শেষের মাধ্যমে অপর এক অজানা প্রজন্মের দিকে ধাবমানতার ছবি। আর সেই প্রসারিত জীবনের ছবি সম্ভবত লেখক প্রকাশ করতে চেয়েছেন অপরাজিত উপন্যাসের ক্যানভাসে।
ইন্দির ঠাকরুণ ও দুর্গার জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে লেখক জীবনের এক এক পর্বের অবসানের ছবি এঁকেছেন; আর এসব ছবি মাড়িয়ে অপর পর্বের ছায়ানিবিড়তার দিকে এগিয়ে চলার গল্প সাজিয়েছেন। কাল থেকে কালান্তরে যাবার এই যে সত্য পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে তারই সাহিত্যিক সত্য বিভূতির কথামালা। দুর্গার মনে প্রকৃতির সৌন্দর্য ভোগের চাহিদা আর অপুর চোখে প্রকৃতির অধরা জগতের অপার বিস্ময় সৃষ্টি করে লেখক তৃপ্তি ও অতৃপ্তির, জানা ও অজানার ব্যাপকতাকে ধরতে চেয়েছেন শিল্পের ফ্রেমে। বর্তমান বিশ্বে মানুষ কেবল উপরে উঠতে চায়- সামনে যাবার কথা যেন তারা বেমালুম ভুলে বসে আছে। বিভূতি তার এই পাঁচালীতে আমাদের শৈশবের চেনাজগতের ছবির মধ্য দিয়ে সামনে এগোবার এক প্রাতিস্বিক স্বতন্ত্র চিন্তাভুবন তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।
উপন্যাসটি আরম্ভ হয়েছে এভাবে: ‘নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের একেবারে উত্তরপ্রান্তে হরিহর রায়ের ুদ্র কোঠাবাড়ি। হরিহর সাধারণ অবস্থার গৃহস্থ, পৈতৃক আমলের সামান্য জমিজমার আয় ও দু-চার ঘর শিষ্য-সেবকের বার্ষিকী প্রণামীর বন্দোবস্ত হইতে সাদাসিধাভাবে সংসার চালাইয়া থাকে।’ এই বাড়িকে ঘিরে হরিহর, তার জ্ঞাতি ভগিনী ইন্দির ঠাকরুণ, স্ত্রী সর্বজয়া, কন্যা দূর্গা ও পুত্র অপু এবং চারপাশের ও দূর গ্রামের প্রতিবেশী, আত্মীয় এবং পরিচিত-অপরিচিত মানুষ ও তাদের বিচরণভূমি নিয়ে গড়ে উঠেছে পুরো উপন্যাসের কাহিনি। গ্রাম্য সমাজের প্রথা-আচার, ঐতিহ্য-লোকবিশ্বাস, ছলচাতুরি, ঠগপ্রবণতা এবং স্বাভাবিক সরলতা এই গ্রন্থের পাতায় পাতায় চিত্রিত। সমকালীন সংসার যাত্রার সাথে লেখক কৌশলে পূর্বপুরুষের জীবনাচার ও সেই সময়কার সমাজ-ব্যবস্থা এবং ভবিষতের সম্ভাবনা ও সত্যাসত্যকে ক্যানভাসে স্থান দিয়েছেন; যেন এক সূক্ষ্ম সুতোয় গেঁথেছেন অতীত-বর্তমান-ভবিষতের এক নিবিড় মালা। আর এর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক, মানুষের প্রতি প্রকৃতির উপহার ও উপহাসের চিত্রাবলি। দুটি উদ্ধৃতি থেকে প্রকৃতির অকৃত্রিম শোভা এবং পাপের জন্য পানিশমেন্ট অব ন্যাচার সম্বন্ধে আমরা ধারণা পেতে পারি।
ক. বাঁশবনে হাওয়া লাগিয়া শির্শির শব্দ হইতেছে, আঁতুড়ঘরে আলো জ্বলিতেছে ও কাহারা কথাবার্তা কহিতেছে। দাওয়ায় জ্যোৎস্না পড়িয়াছে, ঠা-া হাওয়ায় একটু পরে সে ঘুমাইয়া পড়িল। (অপুর জন্মরাত্রিতে দূর্গার ঘুমের বিবরণ)
খ. গত বছর দেশের ঠাকুরঝি পুকুরের মাঠে প্রায় একই সময়ে যে ঘটনা ঘটিয়াছিল, যেন এক অদৃশ্য বিচারক এ বছর ইছামতীর নির্জন চরে তাহার বিচার নিষ্পন্ন করিলেন। মূর্খ বীরু রায় ঠেকিয়া শিখিলেন যে সে অদৃশ্য ধর্মাধিকরণের দ-কে ঠাকুরঝি পুকুরের শ্যামাঘাসের দামে প্রতারিত করিতে পারে না, অন্ধকারেও তাহা আপন পথ চিনিয়া লয়। (হরিহরের এক পূর্বপুরুষকৃত এক ব্রাক্ষ্মণ ও তার পুত্রের হত্যাকা-ের বিচার তারই পুত্রের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নিষ্পন্ন হওয়ার ঘটনা)
এছাড়া ‘সজনে গাছে রাতজাগা পাখির অদ্ভুত রব’, ‘বাঁশবনের ছায়া’, ‘জ্যোৎস্না-ঝরা নারিকেলেশাখার মৃদু কম্পন দেখিতে দেখিতে সুখে বুড়ির ঘুমের আমেজ’ প্রভৃতির মধ্য দিয়ে যে জীবনলীর উপস্থিতির কথা ভেবেছেন বিভূতি, তাতে তার আস্তিকতাকেই আড়াল থেকে প্রকাশ পেতে দেখি।
বালক অপুর বিস্ময় আর অজানাকে জানার যে প্রবল আগ্রহ, তাকে কাহিনির ফিতেয় ধরতে ভুল করেননি বিভূতি। কোনো এক সরস্বরতী পূজার বৈকালে গ্রামের বাইরে, নিশ্চিন্দিপুরের কতক লোকের সাথে, হরিহর তার ছেলে অপুকে নিয়ে যাচ্ছিল নীলকণ্ঠ পাখি দেখতে। পথে অপুর কত কি যে জিজ্ঞাসা, তার অন্ত নাই। নবীন পালিত যখন অপুকে ঘাসের ঝোপের মধ্যে খরগোশ দেখাইল, তখন তার মনে পড়েছে বর্ণপরিচয়ে খ-এ খরগোশের কথা। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা সম্ভবÑ এটা তার কল্পনায়ও ছিল না। অপুর বিস্ময়ের কথা লেখক জানাচ্ছেন: ‘খরগোশ!- জীবন্ত!- একেবারে তোমার সামনে লাফাইয়া পালায়;- ছবি না, কাচের পুতুল না- একেবারে কানখাড়া সত্যিকারের খরগোশ! এইরকম ভাঁটগাছ বৈঁচিগাছের ছোপে!- জল-মাটির তৈরি নশ্বর পৃথিবীতে এঘটনা কি করিয়া সম্ভব হইল, বালক তাহা কোনোমতেই ভাবিয়া ঠাহর করিতে পারিতেছিল না।’
পথের পাঁচালীতে প্রকৃতিশাসিত অকৃত্রিম ও চিরায়ত সভ্যতার সৌন্দর্যের ভেতরে গল্পনির্মাতা একফোঁটা রোদের মতো মানবনির্মিত সভ্যতার অন্ধকারের আলো প্রপেণ করেছেন। ইংরেজদের দুঃশাসন এবং তাদের পরাজয় ও একপ্রকার পলায়নের যে ইতিহাস ভারতবর্ষের পুরনো খাতায় লেখা আছে, তারই সামান্য একটু স্পর্শ যেন বিভূতিভূষণ আমাদেরকে জানাতে চেয়েছেন। বলছেন : ‘নদীর ধারের অনেকটা জুড়িয়া সেকালের কুঠিটা যেখানে প্রাগৈতিহাসিক যুগের অতিকায় হিংস্র জন্তুর কঙ্কালের মতো পড়িয়া ছিল, গতিশীল কালের প্রতীক নির্জন শীতের অপরাহœ তাহার উপর অল্পে অল্পে তাহার ধূসর উত্তরচ্ছদবিশিষ্ট আস্তরণ বিস্তার করিল।’
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে পৃথিবী থেকে রূপকথার কাহিনি যেন প্রায় ফুরিয়ে যেতে বসেছে; আর যোগাযোগের প্রভূত উন্নয়নের হাত ধরে অনেক অজানার রাজ্য আমাদের জানার তালিকায় প্রবেশ করেছে। কাজেই রূপকথা কিংবা অজানার দেশের গল্প এখন আর আমাদেরকে তেমন টানে না। কিন্তু অপু-দুর্গাদের সময়ও ওসব ছিল পরম আগ্রহের ও আনন্দেরই বিষয়। এই পাঁচালীতে মা-পিসিমার কাছে দুর্গা-অপুর গল্প শোনার আবহ তৈরির মাধ্যমে লেখক ওই রকম আভাসই তৈরি করেছেন। আবার কল্পকাহিনির মোহময়তার বিবরণও দিচ্ছেন এভাবে: ‘ঐ মাঠের পর ওদিকে বুঝি মায়ের মুখের সেই রূপকথার রাজ্য। শ্যাম-লঙ্কার দেশে বেঙ্গমা-বেঙ্গমীর গাছের নিচে, নির্বাসিত রাজপুত্র যেখানে তলোয়ার পাশে রাখিয়া একা শুইয়া রাত কাটায়? ও-ধারে আর মানুষের বাস নাই, জগতের শেষ সীমাটাই এই।
ইহার পর হইতেই অজানার দেশ শুরু হইয়াছে।’
গল্পনির্মাতা বিভূতিভূষণ পথের পাঁচালীতে যেন গ্রামের পথে পথে চলতে থাকা গল্পের আড়ালে সাজিয়ে চলেছেন মানুষের জীবনেরই অতিচেনা অথচ না-বলা কতক সাধারণ ছবি আর ঘটনা। খুব সাধারণ ব্যাপারাদি লেখকের হাতে এমন মাধুর্য নিয়ে হাজির হয়েছে যে, সবগুলোকে মনে হয়েছে অনন্যসাধারণ। শিল্পীর নিজস্বতা বোধকরি ওইটুকুতে। নিজের চেনাজগতকে অন্যের চেনা ভুবনের সাথে এক করে প্রকাশের মধ্যে যে মতা, তা বিভূতি অতি স্বচ্ছন্দে পরিবেশন করেছেন। তাই বলা চলে উপন্যাসটিতে পথের নয়, জীবনের পাঁচালীই প্রকাশ পেয়েছে।
লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক
রেডিও সংবাদপাঠক
কলামিস্ট ও সাহিত্যিক